মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারী ২০১২, ১৩ মাঘ ১৪১৮
সঙ্গীতের জাদুকর আল্লা রাখা রেহমান
এআর রেহমান সবার কাছে পরিচিত একটি নাম। আর এই একটি নামেরই রয়েছে অনেক পরিচয়। সঙ্গীত পরিচালক, প্রযোজক, গায়ক এবং প্রসিদ্ধ দাতা হিসেবে রয়েছে সুখ্যাতি। তামিল ছবি ‘রোজা’র মাধ্যমে ১৯৯২ সালে সঙ্গীত পরিচালনায় অভিষেক হয় তার। এরপর অসংখ্য হিন্দী ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার কাজ করে নিজের জাত চিনিয়ে দেন বিশ্ববাসিকে। সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসার উপহার হিসেবে অস্কার, গ্রামি, বাফটা, গোল্ডেন গ্লোবসহ বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতে নিয়েছেন তিনি। টাইম ম্যাগাজিন ৪৫ বছর বয়সী এই সঙ্গীতজ্ঞকে ২০০৯ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মানুষের তালিকায় স্থান করে দিয়েছিল।
১৯৬৬ সালের ৬ জানুয়ারি তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে এক হিন্দু পরিবারে রেহমানের জন্ম। বাবা আর কে শেখর ছিলেন সে সময়ের তামিল এবং মালায়ালাম ছবির প্রসিদ্ধ সঙ্গীত পরিচালক। আর কে শেখর তাঁর নবজাতক শিশুর নাম রেখেছিলেন সে সময়ের জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা দিলীপ কুমারের নামে। রেহমানের জন্মনাম তাই এএস দীলিপ কুমার। শিশু দীলিপের সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় বাবার কাছেই। দক্ষিণী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে শৈশব থেকেই পারদর্শী হয়ে উঠতে শুরু করেন তিনি। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁর সঙ্গে সহকারী হিসেবে কিবোর্ড বাজাতেন। বাবা-ছেলের এই যুগলবন্দী হয়ত আরও অনেকদিনই চলত, কিন্তু মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারাতে হয় তাঁকে। তখন থেকে মায়ের কাছেই বেড়ে ওঠেন তিনি।
সেই অল্প বয়স থেকেই বাবার রেখে যাওয়া বাদ্যযন্ত্র ভাড়া দিয়ে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গেয়ে উপার্জন করতে শুরু করেন শিশু দীলিপ। এর মাঝে বিভিন্ন ব্যান্ডের সঙ্গেও বাজানো শুরু করেন তিনি।
এভাবে কিবোর্ড, পিয়ানো, হারমোনিয়াম, গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোতে বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন। চেন্নাইভিত্তিক রক গ্রুপ ‘নেমেসিস এ্যাভিনিউ’ সেই সময় তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে।
১১ বছর বয়স থেকে বাবার বন্ধু মালায়ালাম সঙ্গীত পরিচালক এম কে অর্জুনানের অর্কেস্ট্রায় নিয়মিত বাজানো শুরু করেন। বিখ্যাত তবলা বাদক জাকির হুসেন, কুন্নাকুড়ি বৈদ্যনাথ এবং এল শঙ্করদের মতো গুণী শিল্পীর সঙ্গেও একমঞ্চে বাজানো শুরু করেন সেই কিশোর বয়স থেকেই। এর মাঝে লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে বৃত্তি পেয়ে সেখানে পাশ্চাত্য সঙ্গীত নিয়ে পড়ালেখা করতে যান। সেখানে পড়ালেখা শেষ করে চেন্নাইতে ফিরে এসে পাশ্চাত্য ধ্রæপদ সঙ্গীত বিষয়ে ডিপ্লোমার মাধ্যমে নিজের শিক্ষা জীবন সম্পূর্ণ করেন।
১৯৮৪ সালে তার জীবনে ঘটে যায় এক বৈপ্লবিক ঘটনা। ছোটবোন মারাত্মভাবে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে চেন্নাইয়ের এক মুসলিম পীরের মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইসলামের সঙ্গে তাদের পুরো পরিবারের পরিচয় ঘটে। তার ছোটবোনও প্রায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এ ঘটনার পর ১৯৮৯ সালে তারা সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এএস দিলীপ কুমার থেকে তার নাম হয়ে যায় আল্লা রাখা রেহমান, সংক্ষেপে এ আর রেহমান।
রেহমানের জীবনে এই ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনাটি খুবই তাৎপর্যময়। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমেই তিনি সুফীবাদ নিয়ে গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে তাঁর সঙ্গীতে। পরবর্তীতে তিনিই প্রথম বলিউড সঙ্গীতে সুফীবাদের প্রবেশ ঘটান।
তামিল, মালায়ালাম, হিন্দী এবং ইংরেজী মিলিয়ে এখন পর্যন্ত এক শ’রও বেশি ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন রেহমান। যেসব বলিউড ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তার মধ্যে রয়েছে ‘রোজা, বোম্বে, দিল সে, যুবা, গুরু, রঙ্গিলা, তাল, লাগান, ¯^দেশ’ এবং ‘রঙ দে বাসন্তী’।
২০০৯ সালে ড্যানি বয়েল পরিচালিত ‘স্ল্যামডগ মিলিয়নিয়ার’ ছবির সাউন্ডট্র্যাক এবং ‘জয় হো’ গানটির জন্য দুটি অস্কার পুরস্কার জিতে নেন রেহমান। একই ছবিতে ওই বছর গোন্ডেন গ্লোব, বাফটা এবং গ্রামি পুরস্কারও বাগিয়ে নেন তিনি।