মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই ২০১১, ১৩ শ্রাবণ ১৪১৮
একজন সুলতানা জামান
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সুলতানা জামানের রয়েছে অকৃত্রিম অবদান। চলচ্চিত্রকে ভালবেসে তিনি জীবনের একটি সময় কাজ করেছেন চলচ্চিত্রের জন্য। সবকিছুর উর্ধে থেকে তিনি চেয়েছেন সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করতে। আর তাই তো তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে অসামান্য অবদানের জন্য দেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০০৯-এ ভূষিত হয়েছেন।
নাটোরের সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুলতানা জামান। তিনি যখন চলচ্চিত্রে পা রাখেন, তখন অবিভক্ত পাকিস্তানে সহজেই কেউ কল্পনা করতে পারতেন না চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথা। তিনি সাহসী পদৰেপে এগিয়ে আসেন চলচ্চিত্রের জন্য। তৈরি করেন মুসলমান মেয়েদের জন্য অনন্য এক দৃষ্টানত্ম। সে সময় জীবনানন্দের বনলতা সেনকে খুঁজে পেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই। চলচ্চিত্রের প্রতি বরাবরই সুলতানা জামানের ছিল টান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানও রয়েছে অনেক।
সে সময় রূপালী পর্দার বিখ্যাত এ তারকা সব সময়ই ছিলেন সংস্কৃতি চর্চায় নিয়োজিত। তাঁর পিতা সৈয়দ আবদুর রাজ্জাক ও মা মোছাম্মৎ রহিমা খাতুনও তাঁকে বেশ সাপোর্ট ও সহযোগিতা করেছিলেন অভিনয়ের ৰেত্রে। সুলতানা জামানের পরিবারে ছিল সংস্কৃতি চর্চা। অভিনয় শিল্পের সঙ্গে নিবিষ্টতার কারণে আজও মানুষের মুখে উচ্চারিত হয় সুলতানা জামানের নাম। তিনি যে কেবল একজন দৰ অভিনয়শিল্পী ছিলেন তা নয়, তিনি আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্মেষকালে এই শিল্পকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিলেন, যার স্বাৰর রয়েছে তাঁর অভিনীত প্রতিটি চলচ্চিত্রে।
সুলতানা জামান মাত্র সতেরো বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরম্ন করেন। তাঁর প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্রের নাম 'মাটির পাহাড়'। সুলতানা জামানের স্বামী এম জামান ছিলেন এ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রাহক। চলচ্চিত্রের নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ পারভেজ এবং পরিচালক ছিলেন মহিউদ্দিন।
১৯৫৭ সালে মূলত সুলতানা জামানের অভিনয়ে হাতেখড়ি ছিল। সেই সময়ের পর থেকে তাঁকে আর থেমে থাকতে হয়নি। সে সময়ের বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রের নায়িকা হয়ে অভিনয় করেন সুলতানা জামান। ১৯৫৯ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত 'মাটির পাহাড়' ছবিতে প্রথম নায়িকা ছিলেন তিনি।
এরপর 'জোয়ার এলো', 'চান্দা', 'অনেক দিনের চেনা', 'সোনার কাজল', 'সাতরং', 'জানাজানি', 'মালা', 'নতুন দিগনত্ম', 'আবার বনবাসে রূপবান', 'মিশর কুমারী', 'দাসী', 'বেয়াকুফ', 'মনের মতো বউ', 'ভানুমতি', 'উজালা' ছবিতে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে চিত্রাকাশসহ বেশ কিছু পুরস্কার পান। স্বাধীনতাউত্তর 'নয়ন মণি', 'নিশান', 'যাদুর বাঁশি', 'অগি্নশিখা', 'তৃষ্ণা'সহ বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেন সুলতানা জামান।
সত্তর দশকে বাংলা চলচ্চিত্রকে কলকাতার চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হতো। তখন সুলতানা জামানের চলচ্চিত্রগুলো কলকাতার চলচ্চিত্রের সঙ্গে পালস্না দিয়ে বঙ্ অফিস হিট করত। শুধু বাংলা চলচ্চিত্রই নয়, তিনি উদর্ু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন সমান তালে। তাঁর অভিনীত উদর্ু চলচ্চিত্র 'চান্দা' সেই সময় দারম্নণ সাড়া ফেলেছিল। তাঁর অভিনয় জীবন সংৰিপ্ত হলেও এদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি অভিনেত্রী হিসেবে সারাজীবন বেঁচে থাকবেন। ১৯৭৮ সালের পর থেকে তাঁকে আর চলচ্চিত্র জগতে দেখা যায়নি। বেশ কয়েক বছর থেকে শারীরিক নানা অসুস্থতায় ভুগছেন তিনি। কিডনি সমস্যার কারণে সপ্তাহে তিনবার ডায়ালিসিস করতে হয়। সময় কাটে বিছানায় একান্ত নীরবে-নিভৃতে।
সুলতানা জামান 'ছদ্মবেশী' ও 'ভানুমতি' নামে দু'টি চলচ্চিত্রের প্রযোজনা করেছেন। চলচ্চিত্র দু'টি সে সময় খুব আলোচিত হয়। এছাড়া তিনি লেখালেখিও করতেন। সে সময়ে প্রকাশিত সিনেমা ম্যাগাজিন চিত্রালিতে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে। 'সাগরের নীল চোখে' নামে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে এবং 'কলঙ্কিনী লায়লা' নামে একটি উপন্যাস, 'সম্রাজ্ঞী নূরজাহান' ও 'নায়িকা সংবাদ' নামে দু'টি ছোটগল্প পত্রিকায় ছাপা হয়।
একদিন সুলতানা জামান তাঁর আব্বুর সঙ্গে চাচাত ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে ঢাকায় আসেন। সেখানে পরিচয় হয় কিউএম জামান এবং চিত্রালীর প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক এসএম পারভেজের সঙ্গে। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় কিউএম জামানের সঙ্গে ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৭ সালে এসএম পারভেজ ও পরিচালক মহিউদ্দিন 'মাটির পাহাড়' ছবিতে অভিনয় করার প্রসত্মাব দেন। এবং সেই থেকে তিনি চলচ্চিত্রের জন্য অভিনয় করতে শুরম্ন করেন। চলচ্চিত্র ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমেও ছিল তার বিচরণ। তিনি রেডিওতে অনেক নাটক কেরেছেন। এছাড়া ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ও গানের অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও করেছেন।