মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর ২০১৩, ১৬ কার্তিক ১৪২০
মুক্তিযোদ্ধা কখনও নষ্ট হয় না ॥ হয় না কখনও ভ্রষ্ট
রণজিৎ বিশ্বাস
: মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীর মধ্যে তফাত কী?
: তফাতটা রসায়ন ক্ষার ও ক্ষারকের মতো; অথবা সরকারী কর্মচারী ও সচিবালয় কর্মচারীর মতো।
: একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুন।
: করছি, শুনুন। সকল ক্ষারই ক্ষারক, কিন্তু সকল ক্ষারক ক্ষার নয়; জলে দ্রবণীয় ক্ষারকই শুধু ক্ষার। আবার ধরুন, সকল সচিবালয় কর্মচারীই সরকারী-কর্মচারী, কিন্তু সকল সরকারী কর্মচারী সচিবালয় কর্মচারী নয়; সচিবালয়ে যারা চাকরি করে তারাই শুধু সচিবালয় কর্মচারী। সেই রকম, সকল যুদ্ধাপরাধীই মানবতাবিরোধী, সকল মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী নাও হতে পারে। মনে করুন আপিন এমন একটা অপরাধ করলেন, যা সাম্প্রদায়িক–যা মানবদলন মানবপীড়ন ও মানবলুণ্ঠনের মতো অপরাধ, যেমন অপরাধ মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক, ছদ্ম সাম্প্রদায়িক ও বিধাতার দুশমন ও তাদের দোস্তরা করে তেমন অপরাধÑ এগুলো হলো মানবতাবিরোধী অপরাধ। এর হা এত বড় যে এর মধ্যে যুদ্ধাপরাধ অনায়াসে ঢুকে যায়।
: তাহলে, আপনি আমাকে একটি সিম্পলু কথা বোঝান; যুদ্ধাপরাধীদের যে মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি বলা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছাতিস্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে তাদের যথাপ্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে, তা কি ঠিক আছে।
: হান্ড্রেড পারসেন্ট ঠিক আছে। শপ্রতিশত ঠিক আছে। যুদ্ধাপরাধীরা মানবতাবিরোধী হবে না তো কি হবে মুক্তিযোদ্ধারা?। না,
মানবতাবাদীরা?!?
একটা জিনিস সব সময় মনে রাখবেন মাই ফ্রেন্ড, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীরা ‘হিউম্যান বীঈঙ’ নয়। তারা মানবেতর, পাশাবেতর, তারা দু’হাত দু’পা ওয়ালা এক ধরনের কীট। সম্প্রতি ওদের সঙ্গে আরও একটা ডেঞ্জারাস প্রজাতি যুক্ত হয়েছে। ওরা ওদের ইয়ার দোস্ত-পালক-পোষক-পৃষ্ঠপোষক-প্রশ্রয়দাতা ও বিভিন্ন মানের জোরের ও প্রকৃতির সাঙাতপ্রবর।
: আপনি শুধু এটুকুই শুনেছেন?!
আমরা তা আরও শুনেছি?
: কী শুনেছেন?
: শুনেছি, ওদের পক্ষে দাঁড়াবার জন্য কিছু মুক্তিযোদ্ধা, কিছু ব্যবহারজীবী, কিছু শিল্পী ও কিছু অধ্যাপক পর্যন্ত উঠেপড়ে লেগেছেন। রীতিমতো খেয়ে না খেয়ে!
: আমি আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে কি একটা কথা নিবেদন করতে পারি?
: করুন! বিনয়ের জন্য যারা বিশেষ বিদিত তাদের অমন যুক্তকর অনুমতি প্রার্থনার প্রয়োজন হয় না। আপনি বলুন, বলতে থাকুন। আজ আপনার অনেক কথাই শুনব।
: আপনি যা শুনেছেন, তা বিশ্বাস করবেন না। শোনা কথা বিশ্বাস করার আগে একটু বাজিয়ে দেখবেন। শোনা কথায় বিশ্বাস নেই, শোনামাত্রই এটিয়ে উড়িয়ে দিতে হয়- এমন কথা আমি বলব না। তবে, মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের দলে কিংবা তাদের পালনে পোষণে ও সমর্থনে কোন মুক্তিযোদ্ধা, কোন শিক্ষক, কোন অধ্যাপক, কোন শিল্পী, কোন শিক্ষিত সাধু, সৎ, রুচিবান লোক অথবা কোন রুচিশীল ব্যক্তি থাকতে পারেÑ এ কথা আপনি বিশ্বাস করবেন না। দিস ইজ সিম্পলি ইম্পসিবল! এই ভালো লোকগুলো কোন দিন এমন সব খারাপ লোকের পক্ষ নিতে পারে না। অথবা তাদের পালন- পোষণ করতে পারে না!
: আমি যদি প্রমাণ করতে পারি!
: ওপেন চ্যালেঞ্জ। পারবেন না। বালার্ককে আপনি পশ্চিম আকাশে দেখেছেন বলে বিশ্বাস করব, কিন্তু জেন্যুইন কোন মুক্তিযোদ্ধাকে, শিক্ষিত কোন শিক্ষককে, দেশপ্রেমিক কোন চলচ্চিত্র নির্মাতা কিংবা গীতিকার অথবা কণ্ঠশিল্পী বা অভিনয় শিল্পীকে যুদ্ধাপরাধী কিংবা মানবতাবিরোধীর সঙ্গে ওঠাবসা খাওয়া পরা কিংবা চলায় ঢলায় দেখেছেনÑ এই কথাটি আমি বিশ্বাস করব না। আমাকে আপনি বিশ্বাস করাবার চেষ্টা করবেন না। পাহাড় সড়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করব; কিন্তু জেন্যুইন বা সত্যিকার কোন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধাপরাধীর সাপোর্টে নেমে যাবে –এটি বিশ্বাস করতে আপনি আমার ওপর জোর খাটাবেন না। অতটা জবরদস্তি তিনি সইবেন না। তিনি মানুষকে ভালবাসেন, তাই বলে বিশ্বাসের ওপর জোরাজুরি তিনি অ্যাকসেপ্ট করেন না। তিনি ভাল ভাল মানুষের মাধ্যমে আমাদের শুনিয়েছেন ও শিখিয়েছেন বিশ্বাস যার যার দেশ সবার অথবা ধর্ম যার যার উৎসব সবার। শিখিয়েছেন কিনা? এই বিশ্বাসের ব্যাপারে তো আমার কোন ডিসপ্যুট নেই! আমার ডিসপ্যুট আপনার এ ‘জবরদস্তি‘ শব্দটা নিয়ে!
: যেমন?!
: জবরদস্তি কে কাকে করছে?!
করছেন তো আপনি আমার ওপর!
অনেক দিন ধরে আমি চিৎকার করে বলছি যে- আছে, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের সঙ্গে ও সমর্থনে শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের মানুষ আছে।
কিন্তু, কিছুতেই আপনি মানতে চাইছেন না। বারবার বলছেন- আমি বিশ্বাস করব না, বিশ্বাস করতে আমি পারবব না, এমন কোনদিন হতেই পারে না-ইত্যাদি।
: আমি অতীতে তাই বলেছি, একনও তাই বলছি, ভবিষ্যতে তাই বলব, ‘মরতে দম তক’ আমি তাই বলব।
: প্রমাণ দিতে পারলে কী হবে?!
আমি যদি হাতেনাতে প্রমাণ করতে পারি?!
: তখনও আমার বলার থাকবে-ওরা জেন্যুইন মুক্তিযোদ্ধা নয়, ওরা সত্যিকার ও শুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা নয়, ওরা তালেগোলের মুক্তিযোদ্ধা, ওরা বাইচান্স মুক্তিযোদ্ধা। সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধা ও যারা প্রাণেমনে মুক্তিযোদ্ধা, যারা শুদ্ধ ও খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা তারা কোনদিন নষ্ট ও ভ্রষ্ট হতে পারে না। তারা কোনদিন যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের সঙ্গে একই ছাতার নিচে দাঁড়াতে পারেন না। তারা কোনদিন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা নিয়ে দেশের মানুষের আবেগ ও শ্রদ্ধাবোধকে ব্যঙ্গ করতে পারেন না, অপমান করতে পারেন না; মিথ্যাচার ভ্রষ্টাচার ও বানানো ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে তারা কখনোই বলতে পারেন নাÑ আপনার কথা ে তা নয়ই, আমি কারও কথাই শুনব না, ঐ কাজটি আমি করবই করব। কারও কথা কিংবা সমালোচনা অথবা অনুরোধ কিংবা আবেগের থোড়াই পরোয়া করি আমি। আমি আমার ব্যাপারে ড্যাম কেয়ার। জেন্যুইন কোন মুক্তিযোদ্ধা মানবতাবিরোধী হয়, সাম্প্রদায়িক হয়, ধর্মান্ধ হয়, বিকারগ্রস্ত হয় কিংবা বিকৃত অথবা বিক্রীত হয়Ñ আমি মানতে পারব না। নিশ্চয় তার মধ্যে কোন গলদ আছে। আপনি অনুসন্ধান করে দেখুন, প্রমাণ পেয়ে যাবেন। সত্যিকার শিক্ষিত লোক ও শিক্ষক কখনও অশিক্ষিত কিংবা মূর্খের মতো আচরণ করতে পারে না। যদি কেউ করেন তিনি গলদ মানুষ ও ভুল মানুষ। মানুষের পচে যাওয়ারও একটা সীমা আছে।