মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩ ভাদ্র ১৪২০
এ্যাঞ্জেলা মেরকেল তৃতীয়বার চ্যান্সেলর, এবারও কোয়ালিশন সরকার
দাউদ হায়দার
বুধবার বিকেলে শ্যোইনেব্যার্গ জেলার (বার্লিনে ১৬টি জেলা) ভিন্টারফেল্ডট প্লাতসে (চত্বর) সবুজ দল তথা গ্রীন পার্টির ‘সুপার-লাইক’ নেত্রী রেনাটে কুনাস্ট বক্তৃতা দিচ্ছেন। ফুরফুরে ঝলমলে রোদমাখা দিন। সূর্যের তাপমাত্রা চব্বিশ। হাসিখুশিভরা তাঁর চেহারা। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। প্রত্যেকদিনই অন্তত তিনটি বক্তৃতা দিচ্ছেন। কেবল বার্লিনে নয়, জার্মানির বিভিন্ন শহরে, নানা জায়গায়। যেমন দিচ্ছেন ছোটবড় সব দলের নেতানেত্রী। এখন তো দম ফেলার সময় নেই।
ঘুরতে হচ্ছে চরকির মতো সর্বত্র। ২২ সেপ্টেম্বর জাতীয় নির্বাচন। অতএব প্রাণপণ লড়াই। গলাবাজিতে নেতানেত্রীর মুখে ফেনা উঠছে। বিরোধীরা সরকারের তুলোধুনা করছেন বটে, কিন্তু ঢালাও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না। জানেন, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাভ নেই। দিলেও ভোটাররা আদৌ বিশ্বাস করবে না; বরং হাসির পাত্র, খেলো হবেন। কার কোন দলের এজেন্ডা তথা প্রোগ্রাম, তুলে ধরাই মুখ্য। গ্রীন পার্টি এখন জার্মান জাতীয় রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি। একটি রাজ্যে তো সরকারই গঠন করেছে। আরও তিনটি রাজ্যে কোয়ালিশন সরকারে যুক্ত। দুই বড় দল (সিডিইউÑ ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন)। সিডিইউ নেত্রী চ্যান্সেলর এ্যাঞ্জেলা মেরকেল। এসপিডি (সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি) খুব তোয়াজ করছে। না করে উপায় নেই। কোয়ালিশন সরকার গঠনে দরকার হতে পারে। জনমত জরিপে (ওপিনিয়ন পোল) গ্রীন পার্টি ১৩ থেকে ১৫ ভাগ ভোট পাবে এবার।
যেহেতু গ্রীন পার্টির নেত্রী, প্রকৃতি-পরিবেশ-ভূম-ল নিয়ে কারবার, তো, বক্তৃতা শুরুর আগে আজকের দিনের চরিত্র, আবহাওয়ার গুণগান। অতঃপর ভদ্রমহিলা-ভদ্রমহোদয় সম্বোধন। বললেন, আপনারা কি চান, তাই জানতে চাই। আপনাদের চাওয়া পূরণ করতে পারব কি না, সেই সাধ্য আছে কি না, আমাদের ওপর ভরসা আছে কি না, যদি মঞ্চে এসে জানান, ধন্য হব। এই আহ্বানে তুমুল করতালি। কেউ অবশ্য মঞ্চে যাননি। শ্রোতার সংখ্যা সাকল্যে ৫০০ জনও নয়। কোনও নির্বাচনী সভায়, বক্তৃতায় ৫০০ থেকে ১০০০ শ্রোতা বিশাল ব্যাপার। বক্তৃতা শোনার সময় কোথায়। বক্তৃতার চেয়ে পার্টির প্রোগ্রাম কি, তাই পড়ে, জানতে উৎসাহী। ভোটের হিসেবনিকেশ।
আসন্ন নির্বাচনে গ্রীন পার্টি বিশেষভাবে জোর দিয়েছে কিটার (দেড় থেকে তিন বছরের শিশুদের স্কুল, খেলাধুলোর জায়গা ইত্যাদি।) উপরে। বাচ্চার জন্যে বেশি টাকাকড়ি। বাচ্চার মা (যদি চাকরি করে)-কে আরও বেশি আর্থিক সাহায্য। এই ইস্যু মায়েদের মনে খুব ধরেছে। মনে রাখছি, জার্মানিতে কিটার জন্যে মাত্র ৪০ ভাগ জায়গা। গ্রীন পার্টি চায় ১০০ ভাগ। এবং শিশুর জননীর আরো আর্থিক সুবিধা। সুবিধা পেলে সন্তানের জন্মহার বাড়বে জার্মানিতে। রেনাটে কুনাস্টের বক্তৃতা শুনছিলেন পাবনার শাহজাহান আলি। বললেন : ‘ছাওয়ালপল বেশি চায় তো আমাগো দ্যাশ ত্যান লোক লিয়ে আসুক। এই দ্যাশের ছেমড়িরা ডেইলি-ডেইলি বিয়াবি (জন্ম দেবে )। মাজননী হবি। কয়ডা বাপ চায়। সাপ্লাই দেব নে।’ গত রবিবারে দুই চ্যান্সেলর-প্রার্থী (সিডিইউ-য়ের এ্যাজ্ঞেলা মেরকেল এবং এসপিডি-র পিয়্যের স্টাইনব্রুইকে )-র ডুয়েল হলো টিভিতে (এআরডি ও জেডএএফ। দুটোই সরকারিচ্যানেল)। পাক্কা ৯০ মিনিট। ৬২ মিলিয়ন দর্শক এই ডুয়েল তথা তর্কবিতর্ক দেখেছেন দুই নেতানেত্রীর।
দেখার ১৫ মিনিটের মধ্যেই অনেকে মতামত দিয়েছেন। টেলিফোনে। ই-মেলে। ফেসবুকে। টুইটারে। আশ্চর্য, এসপিডি-র স্টাইনব্রুইকের পক্ষে বেশি সওয়াল। তবে, সওয়াল যতই বেশি হোক, জাতীয় জরিপে মেরকেলই এগিয়ে। ৪০ ভাগ ভোট নিশ্চিত। তিনিই পরবর্তী চ্যান্সেলর। তৃতীয়বার চ্যান্সেলর। অবশ্য, এবারও কোয়ালিশন সরকার। প্রশ্ন উঠছে এখনই, কোন দলের সঙ্গে কোয়ালিশন করবেন।
গ্রীন পার্টি গলা চড়িয়ে জানিয়ে দিয়েছে, মেরকেলের সঙ্গে কোয়ালিশন করবে না। এসপিডি দোটানায়। কোয়ালিশনে আখের ঝরঝরে। গত কোয়ালিশনে যোগ দিয়ে (সিডিইউ-র সঙ্গে ) ১২ পারসেন্ট ভোট খুইয়েছে। আবার যদি গ্রান্ড-কোয়ালিশন সরকারে অংশ নেয়, ১৪ পার্সেন্ট সমর্থক কমবে। একথা জানেন স্টাইনব্রুইকে। বলেছেন, হেরে গেলেও আমি কোয়ালিশনে যোগ দেব না। পদত্যাগ করব। করতেই হবে। ওঁর বয়স এখন ৬৬ (৪ মাস)। উল্লেখ্য, ২০০৫-২০০৯ পর্যন্ত সিডিইউ-য়ের গ্রান্ড কোয়ালিশন সরকারে অর্থমন্ত্রী ছিলেন। এসপিডিও চায় বালাই যাক।
জার্মান সংবিধানে খুবই জটিল নিয়ম। কোন দল ৫ পারসেন্ট ভোট পেলেই সংসদে আসীন। বলা হয়, ৫ পারসেন্ট ভোটার (ধরা যাক ৫০। এবার ৬৩ পারসেন্ট ভোটার।) যদি ৫ পারসেন্ট ভোট দেয় কোন দলকে, তার মানে, দেশের ৫ পারসেন্ট মানুষের মতামত অবশ্যই মান্য।
লোকগণনায় ৫ পারসেন্ট বিরাট অঙ্ক। অতএব ফেলনা নয়। এবারের নির্বাচনে জোরালো বিষয় ‘ইউরো (মুদ্রা) ক্রাইসিস এবং ইইউয়ের কয়েকটি দেশের আর্থিক ধস। উদ্ধার। জার্মানি কি দাতা হরিশচন্দ্র, না কি, কুবেরের। কুবেরের ব্যাংক খুলেছে?
এই নিয়ে ইউরো পার্টি নামে একটি নতুন পার্টি গজিয়েছে। জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, এই পার্টি ২ থেকে ৩% ভোট কাটবে। যেমন কাটবে পিরাটেন পার্টি। পিরাটেন পার্টির বিস্তর আবদার। যেমন, যার বাড়ি নেই, চাকর নেই তাকে বাড়ি, চাকরি দিতে হবে। না দিলে হাজার ইউরো মাসোহারা দিতে হবে। সব বিদেশীকেই নাগরিকত্ব দিতে হবে। বহু ভোটারই এই দাবির সমর্থক। গতবার এই দাবি তুলে আঞ্চলিক নির্বাচনে পিরাটেন পার্টি কয়েকটি রাজ্যের বিধান সভায় ঠাঁই পেয়ে ভাবছে জাতীয় নির্বাচনে কেল্লা ফতে করবে। এবার বোধহয় সে গুড়েবালি। তবে, বহু ছোট দলকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। পোস্টার-প্লাকার্ডে ইতিমধ্যেই ৩ মিলিয়ন খরচ। সিডিইউ করেছে ২০ মিলিয়ন, এসপিডি ২৩ মিলিয়ন। খরচের পরেও জয় সিডিইউর। ২২ সেপ্টেম্বরের পরে চ্যান্সেলর মেরকেলই।