মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৮ ভাদ্র ১৪২০
জিয়া হায়দার স্মরণে
দাউদ হায়দার
মৃত্যুর পাঁচ বছর হয়ে গেল? দিনগুলো এতটাই দ্রুত ধাবমান যে, কালের যাত্রার ধ্বনিও শুনতে পাইনে। কেউই পায় না। দিন যায়। জিয়া হায়দার বেঁচে থাকলে বয়স হতো সাতাত্তর। নিশ্চয় বিস্তর নাটক আর নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন। তিনি মারা গেছেন ২ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে। সত্যিই কি জিয়া হায়দার মারা গেছেন? না। মানুষ মারা গেলেও মানব থেকে যায়, বলছেন জীবনানন্দ দাশ। সব মানুষই কী মানব থেকে যায়? নয় অবশ্যই। সেই সব মানুষই মূলত মানব, যারা দেশের, দশের আর সমাজ-সংস্কৃতির। এবং যারা ভাবীকালের ঐতিহ্যবাহী। জিয়া হায়দার আমাদের সমাজ, ভাষা, শিল্পসংস্কৃতির। কথাগুলো খুব ভেবেচিন্তেই বলছি। কেউ বলেছেন, জিয়া হায়দার মজ্জাগত কবি। তাঁর কবিতায় হয়েছে দুই ধারার সমন্বয়। তিনি ছিলেন ঐতিহ্যের রূপকার, শিকড়ের সন্ধানী। পুরাণ, রূপকথা যেমন ছেঁকে এনেছেন তেমনি গীতিকবিতার সারল্যে, লিরিক কবিতার গাঁথুনিও জমাট। মনে রাখি, এক সময় বিস্তর গানও লিখেছেন রেডিও-টিভির জন্যে। রেকর্ডও বেরিয়েছে। তাঁর লেখা গান গেয়েছেন বহু বিখ্যাত গায়ক-গায়িকা। একটা সময় গীত ছেড়ে পদাবলি তথা পদ্য বা কবিতাকেই বেছে নিয়েছেন নিজের গরজে। কারণ ছিল বৈ কী। গানে আর কতটা সমাজ-রাজনীতির কথা সরাসরি বলা যায়। চাই এমন একটি মাধ্যম, যাতে লিরিকের আড়ালে দেশের হালচাল বুদ্ধির কৌশলে প্রকাশ সহজ। তাই তো তিনি লিখেছেন কবিতা। তাঁর কবিতায় সমাজ-দেশ-রাষ্ট্রের যে চিত্র- বয়ান, তাতে অনায়াসে আজকের দিনের চেহারা, গা-গতর স্পষ্ট।
... অবশ্য আমি ভুলছি না তাঁর স্মৃতিকাড়ানিয়া প্রেমের কবিতা এবং পারিবারিক কবিতা (যেমনÑ কৌটোর ইচ্ছেগুলো, যখন ঘরে ফিরবো, জন্মদিনের কবিতা, ইত্যাদি) , ব্যক্তিগত কবিতা।
কেউ বলেছেন জিয়া হায়দার মনেপ্রাণে নাট্যকার। এই বিশেষণে আমার সায় বেশি।
বালক বয়সে (কৈশোরের শুরু ও শেষে) ৯০ ভাগ বঙ্গভাষী কবিতার মকসো করেন। চেষ্টা করেন লিখতে। খাতায়। না লিখলেও, মনে-মনে তো বটেই। আসলে, বাংলার জলমাটির এমনই গুণ বা স্বভাব যে, পদ্য বা গান লিখিয়েই ছাড়বে। বাংলায় কত রকম গীতের ছড়াছড়ি। মধ্যপ্রাচ্যে নেই। ইউরোপ, উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকাতেও নেই। ঠিক এটা, আমাদের দেশে নাটক এসেছে বিলেত থেকে। যাত্রাও এসেছে বিলেত বা বিদেশ থেকে। এলেও, পালা, যাত্রা আপন মহিমায়, আনন্দে শিকড় গেড়েছে। এই শিকড় রসে কৈশোর থেকে জিয়া হায়দার সিক্ত। বাড়ি থেকে পালিয়ে নাটকে শামিল। মঞ্চের প্রতি আকৃষ্ট। অভিনয়কলার প্রতি দুর্মর আকর্ষণ। নাটক গেঁথে যায় রক্তে। পরিণাম দেখি ষাটের দশক থেকে। গড়ে তোলেন নাট্য বলয়। বাংলাদেশের নাট্যইতিহাসে এটা তো এখন সর্বজন স্বীকৃত, কিংবদন্তিও বটে, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় জিয়া হায়দারের হাতেই গড়া। জিয়া হায়দারই প্রতিষ্ঠাতা।
প্রতিষ্ঠার জন্যে ঘাম, রক্ত ঝরিয়েছেন প্রতিদিনই। প্রায়-একক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠা। শুরুতে অবশ্য সহযোগী ছিলেন কয়েকজন। আতাউর রহমান, গোলাম রব্বানী, ইনামুল হক, আবুল হায়াত, ফজলে লোহানী (তাঁর বাড়িতেও মিটিং হয়েছে বার দুয়েক) প্রমুখ। নাট্যদলের কি নাম হবে, এই নিয়েই নানা শলাপরামর্শ, নানা নাম প্রস্তাবিত। আমাদের ১৪/২ মালিবাগের বাসাতেই (বসার ঘরে। তখন ড্রয়িংরুম বলতুম না।) অধিকাংশ মিটিং। সন্ধ্যায়, এমন কি রাতেও। ইউরোপে যেমন সন্তান হওয়ার আগেই নাম ঠিক করতে হয়, সেইরকম অনেকটাই, আগে নামকরণ। দিনের পর দিন যায়, নাম ঠিক হয় না। আমিই নাম প্রস্তাব করি, নাগরিক। কেন নাগরিক নাম জরুরী, যুক্তি দিই। কেউ কেউ বলেন, মন্দ নয়, ভেবে দেখা যাবে। সপ্তাহ দেড়েক পরে জানা গেল, ভেবে ঠিক করেছেন, নাগরিক নামই গৃহীত। তবে নাট্য সম্প্রদায় সংযুক্ত। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়।
নাগরিকের প্রথম নাটক সফোক্লিসের ইডিপাস, সৈয়দ আলী আহসানের অনুবাদ। প্রচারিত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান টিভিতে, ১৯৬৮ সালে। রিহার্সেল হয়েছিল বুয়েটের নির্মাণাধীন একটি বিল্ডিংয়ে, দোতলায়। ইডিপাসের পরিচালক জিয়া হায়দার, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ব্যানারে। তখন, আজকের বহু ভূঁইফোড় নাট্যপরিচালক, অভিনেতা ধারেকাছেও ঘুরঘুর করেননি। জিয়া হায়দারই তাঁদের ধরে এনে ঠাঁই দিয়েছেন।
কবি বটে জিয়া হায়দার, কিন্তু নাটকের প্রতিই তাঁর পয়লা প্রেম, লক্ষ্য করেছি আমাদের বালক বয়স থেকেই। আমেরিকায় (ইস্টওয়েস্ট সেন্টার; হাওয়াই) যাওয়ার আগে (গেছেন ১৯৬৬ সালে) কোন নাট্যদল তৈরি করেননি ঠিকই, দুই বছর পরে ফিরে আদাজল খেয়ে লেগেছেন। কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। সাফল্য যখন তুঙ্গে, তাঁকেই কারসাজি করে বিতাড়ন। আমার মনে হয়, এক অর্থে শাপেবর। লিখেছেন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটক। লিখেছেন নাট্যকলা বিষয়ক বিস্তর নিবন্ধ। পাঁচ খ-ে থিয়েটারের কথা। নাট্য ও নাটক বিষয়ে একাধিক বই। অনুবাদ করেছেন বহু বিদেশি নাটক, নাট্যবিষয়ে প্রবন্ধের বই। নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছেন বিটা (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার আর্টস, চট্টগ্রাম)। পরিচালক, ইউনিভারসিটি থিয়েটার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। নাগরিক নিয়ে মেতে থাকলে এতকিছু হতো না। বঞ্চিত নাট্যবোদ্ধা ও পাঠকরা।
জিয়া হায়দারের নাট্যকলা বিষয়ক রচনা এখন পশ্চিমবঙ্গের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। চলতি বছরের আগস্টেই জিয়া হায়দারের থিয়েটারের কথা (পাঁচ খ-)সহ নাট্যকলা নিয়ে তাঁর যাবতীয় প্রবন্ধাদি প্রকাশের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি (ভ্রাতৃকুলের পক্ষ থেকে) কলকাতার বহুমান্য বনেদি প্রকাশন ডি এম লাইব্রেরির সঙ্গে। মানুষের মৃত্যু হলেও মানব থেকে যায়। জিয়া হায়দার চিরকালীন মানব।