মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২৬ নভেম্বর ২০১৩, ১২ অগ্রহায়ন ১৪২০
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ॥ ৫ জানুয়ারি ভোট
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণের পূর্ণ বিবরণ পৃষ্ঠা-১৬
০ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা
০ সকল দলকে নির্বাচনে আসার আহ্বান
০ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীও নিয়োজিত থাকবে
০ জেলা প্রশাসক রিটার্নিং অফিসার
০ নির্বাচনে ৯ কোটি ২৯ লাখ ভোটার ভোট দেবে
স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবেশেষে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৫ জানুয়ারি ২০১৪ রবিবার সারাদেশে ৩শ’ আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নিকট মনোনয়পত্র দাখিলের শেষ সময় ধরা হয়েছে ২ ডিসেম্বর ২০১৩ সোমবার। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়পত্র বাছায়ের তারিখ ধার্য করা হয়েছে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতি ও শুক্রবার ২০১৩। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১৩।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ সোমবার জাতির উদ্দেশে দেয়া এক টিভি ভাষণে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।
এর আগে সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয়। এ বৈঠকে সোমবার তফসিল ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সময় সাংবাদিকদের জানানো হয়, জাতির উদ্দেশে দেয়া টিভি ভাষণের মাধ্যমে নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা করা হবে। বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ সাতটায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।
সংবিধান অনুযায়ী আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী সোমবার থেকে শুরু হয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার। তফসিল ঘোষণার দিন থেকে নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের দিন পর্যন্ত নির্বাচনকালীন সরকার বহাল থাকবে। এ সময়ের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার শুধু তার রুটিন কাজ পরিচালনা করবে। দেশের নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে নির্বাচন কমিশনের হাতে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁর ভাষণে বলেন, সময় সংক্ষিপ্ততার জন্য রাজনৈতিক দলের সমঝোতার অপেক্ষায় থেকে তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর সব রাজনৈতিক দল সমঝোতার মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অনুষ্ঠানের জন্য কমিশনকে সাহায্য করবে। তিনি বলেন, কাজের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তার গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেবে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন তফসিল ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সন্ধ্যায় টিভি ভাষণের পরই এক সাক্ষাতকারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তারা এ তফসিল প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার আহ্বান জানান।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নিয়োগ করা হয়েছে। আর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন থানা নির্বাহী কর্মকর্তা। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বা সহকারী কমিশনারকেও (ভূমি) সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়েছে। যেসব উপজেলা ভেঙ্গে একাধিক আসন হয়েছে সেখানে অপেক্ষাকৃত বড় আসনে ইউএনও এবং ছোট আসনে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নিয়োগ করা হয়েছে। বেশি ছোট আসনে থানা বা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকায় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য এবার অন্তত ৭০ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ৬শ’ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ হয়েছে। নির্বাচনে ৯ কোটি ২৯ লাখের কিছু বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এ জন্য মোট ৩৭ হাজার ৭১১টি ভোটকেন্দ্র, ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩টি ভোটকক্ষ স্থাপন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মোট ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৯ জন্য ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ভোটগ্রহণ পরিচালনা করবেন। গতবারের ন্যায় এবার কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলই শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এর বাইরে কেউ ইচ্ছে করলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কমিশনের মোট নিবন্ধিত দলের সংখ্যা এখন ৪০টি। ইতোমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয়েছে। হাইকোর্টের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ করার পেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ বলেন, জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণে সব রাজনৈতিক দল এগিয়ে আসবে এবং একটা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে জনগণ তাদের রায়ের প্রতিফলন দেখতে পাবেন। কমিশন সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য শপথ নিয়েছি। সংবিধান মোতাবেক ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ সালের মধ্যেই নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এত দিন অপেক্ষা করেছিলাম একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য। আমাদের হাতে বিলম্ব করার মতো সময় আর নেই। তাই আমি আজ দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছি। একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথে আসার জন্য আবারও সব মহলকে আহ্বান জানাচ্ছি।
নির্বাচনী ফলাফল ঘিরে বিভ্রান্তি নিরসন ও রাজনৈতিক দলের আস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে নির্বাচনী আইনের বিধান অনুসারে আগামী নির্বাচনে প্রত্যেক কেন্দ্রে ভোট গণনার পর প্রিজাইডিং অফিসার প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোটের ফলাফল অতীতের মতো শুধু অঙ্কে লিখবেন না, কথায়ও লিখবেন। প্রিজাইডিং অফিসার ভোটকেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা করার পর এজেন্টদের স্বাক্ষরকৃত রেজাল্টশীট রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রেরণ করবেন এবং তার একটি কপি ডাকযোগে সরাসরি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন। যত রাতই হোক না কেন ভোটকেন্দ্র থেকে রেজাল্টশীট জমা না হওয়া পর্যন্ত ডাকঘর খোলা রাখা হবে। সংশোধিত আচরণবিধিতে তফসিল ঘোষণার দিন থেকে নির্বাচনপূর্ব সময় শুরু হবে এবং নির্বাচনের ফলাফল গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়া পর্যন্ত তা বলবত থাকবে। এতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, মন্ত্রীবর্গ এবং সরকারী সুবিধাভোগী অন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার দিন থেকে সরকারী সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করতে পারবেন না। সংসদ সদস্যগণ বা তাদের কোন প্রতিনিধিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্বে থাকলে নির্বাচনপূর্ব সময়ে ওই কমিটির কোন সভায় যোগ দিতে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না। নির্বাচন আচরণবিধি প্রয়োগে কোন ছাড় দেয়া হবে না। কে কোন পদে আছেন তা দেখা হবে না। নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধিতে অন্য বিষয়ের মধ্যে বিভিন্ন রঙের পোস্টার ব্যবহার বা দেয়ালে সাঁটানো, দেয়াল লিখন, গেট বা তোরণ নির্মাণ, বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা ইত্যাদির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আছে, নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে নির্বাচনপূর্ব সময়ে মিছিল সহকারে শো-ডাউন, আপ্যায়ন ও ভোট কেনাবেচার বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। মনোনয়নপত্র জমা প্রদানকালে চিরাচরিত শো-ডাউন কোনভাবেই বরদাশত করা হবে না।
একই দিনে সারা দেশে ৩০০ সংসদীয় আসনে আমাদের নির্বাচন করার জন্য প্রতিবারের মতো এবারও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিডিপি, আনসার, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীকেও নির্বাচনের জন্য দেশব্যাপী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে আইন মোতাবেক নিরপেক্ষভাবে যেন অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারেন সে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনের সময় সব সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব হচ্ছে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা। ভয়ভীতির উর্ধে থেকে জাতীয় দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকবেন তারা। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরত সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণ করা হবে। নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ নির্দেশিত বিধানাবলী প্রয়োগ করতে আমরা দ্বিধাবোধ করব না।
তিনি বলেন, আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় আমাদের পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।