মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৩, ৩ অগ্রহায়ন ১৪২০
হরতালের আগুনে দগ্ধ মণ্টু পাল ও আসাদ গাজী হেরে গেলেন
বার্ন ইউনিটে আরও ২৮ জন লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে
স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিএনপি-জামায়াতের হরতালের আগুনে বোমাদগ্ধ স্বর্ণের কারিগর মন্টু পাল (৩৫) ও পেট্রোল বোমায় দগ্ধ সিএনজি চালক আসাদুল গাজীর মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শুক্রবার হেরে গেলেন। পেট্রোল বোমায় দগ্ধ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হলো আরও দুই হতভাগা। এ নিয়ে গত তিনদফা হরতালে পিকেটারদের পেট্রোল বোমার শিকার দুই স্কুলছাত্রসহ ১২ জনের মৃত্যু হলো। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সূত্র জানায়, সারাদেশে বিএনপি-জামায়াতের বোমায় ২৫জন নিহত হয়েছে। ভয়ঙ্কর বোমায় রাজধানীতে প্রায় অর্ধশতাধিক দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে শিশু-কিশোর ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫জন। এখনও মারাত্মক দগ্ধ ২৮জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে জীবন মৃত্যুর সঙ্গে যুজছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেয়া হচ্ছে। এদের কারও সারা শরীর ঝলসানো, কারও মুখম-লে দগদগে ঘা এবং কারও হাত-পা দগ্ধ। হাসপাতালের বেডে ছটফট করছে ওরা। বোমায় শিশু রহিমা, ফোকাস বাংলার ফটোসাংবাদিক মোশাররফ হোসেন, পঞ্চাশোর্ধ দিনমজুর আবদুর রহমানের চোখের আলো কেড়ে নেয়া হয়েছে। ওরা আগারগাঁও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শঙ্কর পাল জনকণ্ঠকে জানান, গত কয়েকদিনের টানা হরতালে এ পর্যন্ত ৪০ থেতে ৫০ জন বোমায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। মারা গেছেন ১২জন। এখনও প্রায় ২৮জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জানা গেছে, লক্ষ্মীবাজারে লেগুনার আগুনে বোমায় দগ্ধ মন্টু পাল ৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধশেষে শুক্রবার সকালে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মন্টু পালের এমন মরণ প্রত্যাশিত ছিল না তার পরিবারের কাছে। মেনেও নিতে পারছেন না। স্বজনদের সবটুকু ক্ষোভ চলমান সংঘাতময় রাজনীতির ওপর। রাজনীতিকদের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ঘটালেন মন্টু পালের শ্যালক প্রদীপ পাল। অকালে স্বামী হারানো বোন সঞ্চিতা পালের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। একই কথা জানালেন মন্টু পালের শ্বশুর পরেশ পাল। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, পোড়া কপালী মেয়ের এখন তো আর কেউ রইল না। সে কিভাবে বাঁচবে- হিন্দুদের তো দ্বিতীয় বিয়ে হয় না। তার ওপর মেয়ের সন্তান জন্ম নেয়ার কয়েকমাসের মাথায় মারা যায়। মেয়ের এ দুঃখ এতদিন তার স্বামী মন্টু পাল আগলে রেখেছিল। এখন হতভাগী মেয়েটা আমার বড্ড একা হয়ে গেল। বাবার পাশে নিহত মন্টু পালের স্ত্রী সঞ্চিতা বিলাপ করে বলছিলেন, ভগবান আমার দিকে কেন এমন নিষ্ঠুরভাবে তাকাল? কেন আমার স্বামী হরতালের বলি হলো? ও কোন রাজনীতি করে না। ভগবান, যারা আমায় স্বামী ছাড়া করেছে, তাদেরও এরকমই বলি দিও। গত ১০ নবেম্বর হরতালে রাতে স্বর্ণের কারিগর মন্টু পাল লেগুনায় চড়ে নারায়ণগঞ্জ যাচ্ছিলেন। লক্ষ্মীবাজারে পিকেটারদের পেট্রোল বোমায় লেগুনায় আগুন ধরে মন্টু পাল, মোক্তার হোসেন (২৬), কামাল হোসেন (৩৫) মিন্টু দাস (১৮), সাগর দাস (১৯), স্বপ্নাসহ (৩০) ছয় যাত্রী মারাত্মক দগ্ধ হয়। পরে মন্টুসহ ৬জনকে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এরমধ্যে মন্টু পালকে আইসিইউতে ভেন্টিলেটরে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস দেয়া হয়। মন্টু পালের পিতার নাম বিজয় পাল। বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার ফতেপুরে। থাকতেন নারায়ণগঞ্জের পাগলার কামালপুরে। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট ছিল মন্টু। টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মন্টু স্ত্রীকে নিয়ে পাগলায় থাকতেন। চার বছর আগে মন্টু-সঞ্চিতার ঘরে একটি সন্তান এলেও তিনদিনের মাথায় শিশুটি মারা যায়। হরতালের আগুনে মন্টুর পুড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারের স্বপ্নও পুড়ে ছাই হয়ে গেল। নিহত মন্টুর পরিবারের সদস্যরা জানান, মন্টুর আয়ে তাদের ৬জনের ভরণপোষণ চলত। নিম্নবিত্ত এ পরিবারটি এখন কী করবে, ভেবে পাচ্ছেন না কেউ। মন্টুর মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শনিবার ভোররাতে ঢামেক হাসপাতাল বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাভারের নবীনগরের ক্যান্টনমেন্টের সামনে পিকেটারদের পেট্রোল বোমায় দগ্ধ সিএনজি চালক আসাদুল গাজীর মৃত্যু ঘটে। ১৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ওইদিন তারই সিএনজি যাত্রীর অগ্নিদগ্ধ মুকুলের মতো না ফেরার দেশে চলে যেতে হলো। হরতালের আগের দিন রাতে গত ২ নবেম্বর সাভারে আসাদুল গাজীর অটোরিকশায় পেট্রোল বোমা ছোড়া হলে তিনজন মারাত্মক দগ্ধ হন। ঘটনার পরদিন ৩ নবেম্বর মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল নামে এক আরোহী মারাও যায়। দেহের ৪০ শতাংশ ক্ষত নিয়ে সেদিন থেকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি ছিলেন আসাদুল (৩৫)। গত ২ নম্বেবর হরতালের আগের দিন বিশ্বাস গ্রুপের তিন কর্মীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন সিএনজি চালিয়ে আসাদুল। পথে গাবতলী টেকনিক্যালে এক যাত্রী নেমে যাওয়ার পর অন্য দুজনকে নিয়ে ঢাকা থেকে সাভারের নবীনগর যাচ্ছিলেন তিনি। এরপর সাভারে হরতাল সমর্থকদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় অটোরিকশায় আগুন ধরে গেলে অগ্নিদগ্ধ হন বিশ্বাস গ্রুপের প্রকল্প কর্মকর্তা মুকুল, নিরাপত্তাকর্মী মোঃ হাসু (৩৮) ও চালক আসাদুল। পরদিন বার্ন ইউনিটে মারা যান মুকুল। হাসু এখনও চিকিৎসাধীন। গত তিন সপ্তাহে ১০ দিন ছিল বিরোধী দলের হরতাল। এর মধ্যে হরতালে গাড়ি পোড়ানো ও বোমা হামলায় অগ্নিদগ্ধ প্রায় ৫০ জন সেখানে চিকিৎসাধীন। মন্টু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই একে একে মারা যান মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, গাজীপুরে ঘুমন্ত স্কুলছাত্র মনির হোসেন, গাজীপুর সদর উপজেলার ভোগড়া বাইপাস এলাকায় হরতালের সমর্থকদের দেয়া আগুনে বাসচালক নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদপুরে গামের্ন্টসকর্মী নাসিমা বেগম, ফেনীর আবুল কাসেম (৫০) মৃত্যু হয়। যারা সবাই হরতালের আগুনের পোড়া দগ্ধ শরীর নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন।
দগ্ধ ২৮জন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ॥ লক্ষ্মীবাজারের পেট্রোল বোমায় লেগুনা নিহত যাত্রী মন্টু পালের সঙ্গে ছিলেন কামাল হোসেন। তিনি সেদিন লেগুনাতে অগ্নিদগ্ধ হন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর শরীরের ২৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অগ্নিদগ্ধ কামালের স্ত্রী পলি বেগম জানান, বিক্রমপুর-মুন্সীগঞ্জের সন্তান কামাল কোতোয়ালির থানাধীন সদরঘাট এলাকায় দর্জির দোকানে কাজ করেন। তাঁর চাকরির টাকা দিয়ে চলে সংসার। স্ত্রী পলি, ছেলে আসিফ ও মেয়ে লামিয়াকে নিয়ে চারজনের সংসার। কামালের ওই আয় দিয়েই গ্রামে তিন ভাই, এক বোন ও মায়ের ভরণপোষণও চালাতে হয় তাকে। হরতালকারীদের ছোড়া পেট্রোল বোমায় কামালের পুড়ে যাওয়ার পর পরিবারটির মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। আহতের স্ত্রী পলি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, স্বামীর ওষধ পথ্য ও যাতায়াতের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক ধারদেনা হয়ে গেছে। বাড়িওয়ালার ভাড়া দিতে পারছেন না। আর ভাড়া দিতে না পারলে তাদের বের করে দেবে। দুই সন্তানকে নিয়ে তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, কে দেবে ওদের ভরণপোষণ? পলি ক্ষোভ, কষ্ট ও বেদনার সঙ্গে জানায়, আমার স্বামী কোন রাজনীতি করেন না। এমনকি পরিবারের কেউ রাজনীতি করেন না। কেন আমার সুখের সংসারে ওরা আগুন দিয়ে ছারখার করে দিল। কি অন্যায় ছিল আমাদের। এখন স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়ভার ও সংসারের ভরণপোষণ চালাব কিভাবে? লেগুনার যাত্রী মারাত্মক দগ্ধ কিশোর মোক্তার হোসেন। নারায়ণগঞ্জে একটি কারখানায় কাজ করেন। সদরঘাটে বন্ধু সজীবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। ওই বন্ধুকে নিয়ে লেগুনাকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ফিরছিলেন। লক্ষ্মীবাজারের লেগুনার আগুনে মোক্তার পুড়ে গেলেও তার বন্ধু অক্ষত। সজীব জানান, লেগুনার পেছন দিকে থাকায় সে অক্ষত থাকে। বন্ধুর এ করুণ পরিণতির জন্য নিজেকে অপরাধী হিসেবে ভাবছেন সজীব। জানান, রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ কেন দুর্ভোগ পোহাবে? মোক্তারের পরিবারের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার দায় কে নেবে?