মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ১৫ বৈশাখ ১৪২০
সাভারে রানা প্লাজায় ধস মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ ॥ ত্রাণমন্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার ॥ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, সাভারের ভবন ধস একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। ধসে পড়া ভবন থেকে সকল জীবিত লোককে উদ্ধারের পরই ভারি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হবে। ধ্বংসস্তূপে একজনও জীবিত লোক থাকা অবস্থায় কোনক্রমেই ভারি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হবে না। অন্যদিকে উদ্ধার কাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের ভিড় কমানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার সচিবালয়ের পিআইডি সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান।
এ সময় অতিরিক্ত সচিব আব্দুল ওয়াজেদ, অসীম কুমার মুকুট মনি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ মাসুদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী জানান, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস সকল সরঞ্জামাদি নিয়ে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। উদ্ধার অব্যাহত রয়েছে। তবে সকল জীবিত লোক উদ্ধারের পরে ভারি সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হবে। ভারি সরঞ্জামাদি ব্যবহারের আগে আমরা অবশ্যই নিশ্চিত হব যে, ভেতরে আর কোন লোক জীবিত নেই।
মন্ত্রী জানান, ভবন ধসের পরে উদ্ধার কাজটি অত্যন্ত জটিল। তবে আমাদের সকল প্রকার উদ্ধার সরঞ্জামাদি রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের সরঞ্জামাদি দিয়ে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তাই সরঞ্জামাদি নিয়ে কোন সমস্যা নেই।
সাধারণ লোকের ভিড় বেশি হওয়ায় উদ্ধার কাজে সমস্যা হচ্ছে বলে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনায় সহায়তার জন্য সাধারণ লোক এগিয়ে আসছে। তাদের আমরা ধন্যবাদ জানাই। তবে অনেক সময় ভিড় বেশি হওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাই রানা প্লাজায় আশপাশ থেকে লোকজনকে সরে গিয়ে সহযোগিতা করার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, সাভারের দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬৯ জনের মরদেহ তাদের আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ৩৯ জনের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দুই হাজার ৪১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে গুরুতর আহত ৯৩৪। আহতদের মধ্যে ৪৩০ জন এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, ১৩৬ জন সাভার সিএমএইচে, ১৪ জন সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অন্যান্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ৪০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, সেনাবাহিনীর ১৫, নৌ-বাহিনীর ২, বিমানবাহিনীর ১, বিজিবির ১ ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১০ মেডিক্যাল টিম ও স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, রানা প্লাজা ভবনটি নির্মাণে ত্রুটি ছিল। এই ভবন নির্মাণে যারা ছাড়পত্র দিয়েছে, তারা সবাই দায়ী।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, উদ্ধারকাজ পরিচালনা কার্যক্রমে আমরা সন্তুষ্ট। ভবনটি ধসে পড়ার আধ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়েছে। আর তারপর থেকে বিরতিহীনভাবে চলছে।
উদ্ধার সরঞ্জামের কোন ঘাটতি রয়েছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ২০১০ সালে ৭০ কোটি টাকার উদ্ধার সরঞ্জাম ক্রয় করেছে। সরকারের কাছে অত্যাধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম রয়েছে।
সিডিএমপির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১২শ’ স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সিডিএমপির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঢাকা, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে প্রতিব্যাচে ৬শ’ করে ১২শ’ স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেছেন।
মন্ত্রী বলেন, সাভারের দুর্যোগ মোকাবেলার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনকে সহায়তা দেয়ার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর বরাবর চার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই কোটি টাকা জেলা প্রশাসক অফিসে বরাদ্দ দেয়াও হয়েছে। প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ২০ হাজার ও আহত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য পাঁচ হাজার টাকা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসককে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৬৯ মৃত পরিবারকে ২০ হাজার করে মোট ৫৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। আহত ৯৩৪ জনকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬শ’ লোককে ৫ হাজার করে মোট ৩০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া উদ্ধারকাজ পরিচালনার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সরঞ্জাম বা দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ মাসুদ বলেন, ধসেপড়া ভবন থেকে উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন স্থানে ১৫টি সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে। এসব সুড়ঙ্গপথে ১০টি টিম কাজ করছে। উদ্ধার কাজটি খুব কঠিন। প্রতি সুড়ঙ্গপথে একজন করে লোক নামতে পারে। তাই এখানে প্রশিক্ষিত লোক পাঠানো প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত লোক ছাড়া সুড়ঙ্গপথে থেকে উদ্ধারকাজ সম্ভব নয়। কোন জীবিত লোকের যেন ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, উদ্ধার কাজে ব্যবহারের জন্য ভারি যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রয়েছে। দুই শ’ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ক্রেনও সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তেই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আমরা পরে এসব ব্যবহার করব।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আবেগের কথা বলা ঠিক হবে না। বাস্তবতার নিরিখে কথা বলতে হবে। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে এখনই বড় ধরনের অপারেশনে গেলে জীবিতদের উদ্ধার করা যাবে না। যে কোন তথ্য প্রচারের আগে তা যাচাই করে নেয়ার জন্য তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ জানান।