মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ৭ ফাল্গুন ১৪১৯
গণজাগরণ মঞ্চে স্লোগান দিতে দিতেই চিরতরে চলে গেলেন শান্ত
তরিকুল ইসলাম শান্ত
স্টাফ রিপোর্টার ॥ শাহবাগের স্বাধীনতা প্রজন্ম চত্বরে স্লোগান দিতে দিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন শান্ত। চরম উত্তেজনায় কখন যে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে এই সাইবার যোদ্ধা, কার্টুনিস্ট, নাট্যকার ও পরিচালক তরিকুল ইসলাম শান্তর (৩৯) তা কেউ বুঝতেই পারেনি। স্লোগানে স্লোগানে উদ্বেলিত তরিকুল ইসলাম শান্ত প্রজন্ম চত্বর ছেড়ে চিরতরে চলে গেলেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবির মধ্যেই তরিকুল ইসলামের কণ্ঠ থেমে গেল। শান্তর কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পরই প্রজন্ম চত্বরের স্লোগানও কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রজন্ম সেনারা এই শোককে শক্তি হিসেবে নিয়ে আবার স্লোগানে স্লোগানে শাহাবাগ মুখরিত করে তোলে। তারা প্রথম শহীদ রাজীবের সঙ্গে দ্বিতীয় শহীদ শান্তর নাম জুড়ে ম্লোগান দিতে শুরু করে। সোমবার বিকেল পৌনে চারটায় এ ঘটনা ঘটে।
তরিকুল ইসলাম শান্ত খুব ছোটবেলা থেকেই কার্টুনিস্ট হিসেবে মফস্বল শহর টাঙ্গাইল থেকে উন্মাদ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। পরে তিনি ঢাকায় এসে ভোরের কাগজে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পাশাপাশি উন্মাদ পত্রিকার সঙ্গেও ছিলেন। কল্পদূত কমিকস ছিল তাঁর নিজস্ব উদ্যোগ। নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। তিনি প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক শরিফুল ইসলাম ভুঁইয়ার ছোট ভাই।
কাদের মোল্লাসহ একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে তারুণ্যের প্রতিবাদ সোমবার ১৪তম দিনে তিনি উদ্দীপ্ত হযে স্লোগান দিচ্ছিলেন। প্রতিবাদী স্লোগান-গান আর আবৃত্তিতে আগুন ঝরছে প্রজন্ম চত্বর। তরিকুল ইসলাম শান্তর কণ্ঠেও একই আগুন ঝরছিল। প্রজন্ম চত্বরে সংহতি জানাতে অন্য শিল্পীদের সঙ্গে তরিকুল ইসলাম শান্তও শাহবাগে ছিলেন। মঞ্চে শুরু করেন দৃপ্ত কণ্ঠের স্লোগান। স্লোগান দিতে দিতে এক পর্যাযে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মঞ্চেই ঢলে পড়েন শান্ত। অন্যরা তাঁকে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তরিকুল ইসলাম শান্ত তার কর্মজীবনে ছিল খুবই সাদামাটা। স্বভাব চরিত্রেও ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। কিন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছিলেন উদ্দীপ্ত। শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। কার্টুন আঁকার পাশাপাশি তিনি নাটক পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছেন। ছোটবেলা থেকে ছড়া, কবিতা ও শিশু সাহিত্যচর্চা করতেন। তার পরিচালিত শেষ নাটক ‘একজন ভালোমানুষের গল্প’ প্রচারিত হয় বিটিভিতে গত ঈদ-উল-আযহায়। এছাড়া প্রথম টেলিফিল্মটি নির্মাণ করেন যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ নামে টেলিফিল্মটি বিটিভিতে প্রচারিত হয় ২০১০ সালে ৩১ জুলাই। এ পর্যন্ত সিন্দাবাদের ভূত, এক ডজন গোয়েন্দা গল্প, খুকুর ছড়া, খোকার ছড়া, কবিতায় তুমি নামে কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন শান্ত। তিনি রম্য ম্যাগাজিন উন্মাদ-এ কাজ করতেন।
প্রজন্ম চত্বরে শান্তর মৃত্যুতে ৫টা ৫৯ মিনিট থেকে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তরিকুল ইসলামের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানান। গণজাগরণ আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনে তরিকুল প্রেরণা হিসেবে কাজ করবেন বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে জাগাতে তাঁর অবদান জাতি স্মরণ রাখবে।