মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ৭ ফাল্গুন ১৪১৯
নির্বাহী আদেশে জামায়াত নিষিদ্ধ করুন, বিজয় নিয়ে ঘরে ফিরুক
-----------
স্বদেশ রায়
-----------
রবিবার বৃষ্টিতে যেমন পানি জমেছিল শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে তেমনি হাজারো মানুষের পায়ে পায়ে জমে উঠেছিল কাদা। ওই কাদা ও পানিতে রাত দশটার পরেও প্রজন্ম চত্বরে কমেনি মানুষের স্রোত। ক্ষীণ হয়নি স্লোগানের গর্জন। সে গর্জনের অর্ধেকটা সময়জুড়ে ছিল অবিলম্বে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।
প্রজন্ম চত্বরে যে মানুষ জড়ো হচ্ছে তাদের কারও হাতে কোন অস্ত্র নেই, এমনকি একটি লাঠিও নেই। তাদের কেবল কণ্ঠে আছে স্লোগান আর গান ও কবিতা। কেউ যদি ভেবে বসেন, কী এমন শক্তি আছে এই স্লোগান, গান আর কবিতার। ভুল করবেন তারা। ভেবে দেখুন, প্রজন্ম চত্বরে কোন প্রধানমন্ত্রী নেই, কোন রাষ্ট্রপতি নেই, কোন বিরোধী দলের নেতা নেই। শুধু এক ঝাঁক তরুণ মিলেছে সেখানে মায়ের ডাকে। তারা সেখান থেকে বলছে, সারা বাংলাদেশে একই সময়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা ওঠাতে হবে ও জাতীয় সঙ্গীত গাইতে হবে। বাংলাদেশ এক সঙ্গে জাতীয় পতাকা তুলেছে, গেয়েছে জাতীয় সঙ্গীত। বাংলাদেশের হাজার কোটি টাকার মালিকরা প্রতিটি হরতালকে সামনে রেখে হরতাল পালন না করার জন্য বলেন। যারা যখন সরকারে থাকেন তখন তারা হরতাল পালন না করার জন্য বলেন। কোন দিন কিন্তু ওইভাবে কাজ হয়নি। অথচ প্রজন্ম চত্বর থেকে যখনই বলা হয়েছে আপনারা হরতাল প্রত্যাখ্যান করুন। মানুষ সেই হরতাল প্রত্যাখ্যান করেছে। হয়ত অনেকে জামায়াত-শিবিরের চোরাগোপ্তা হামলার ভয়ে তার কারটি বের করতে সাহসী হননি। অনেকে জীবনবাজি রেখে বের করেছেন। প্রকাশ্যে বলছেন, এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ছোট শিশুরা জামায়াতে হামলাকে উপেক্ষা করে স্কুলে গেছে। পরীক্ষা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হয়েছে। পরীক্ষা হয়েছে। খোলা রেখেছে অধিকাংশ মানুষ তাদের দোকানপাট। এর আগে এই প্রজন্ম চত্বরের ডাকে উদ্বুদ্ধ হয়ে মতিঝিলের ব্যাংকের এক লিফট চালক জাফর মুন্সী যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবির পোস্টার রক্ষা করতে গিয়ে জামায়াতের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ জামায়াত কর্মী পেলেই গণধোলাই দিচ্ছে এই প্রজন্ম চত্বরের আহ্বানে। এই নতুন প্রজন্মের শুরু করা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ বা শুদ্ধি বিপ্লবের প্রজন্ম সেনা রাজীব হায়দারের মৃত্যুতে সারাদেশে কালো পতাকা উঠেছে। মানুষ কালোব্যাজ পরেছে। না, কোন সরকারের নির্দেশে নয়। প্রজন্ম চত্বরের আহ্বানে।
তাই এই প্রজন্ম চত্বরের স্লোগানের গর্জনের অর্থ বুঝতে কেউ যদি ভুল করেন তিনি শুধু ভুলের স্বর্গে নয় কোন্ অতলে চলে যাবেন তা কেবল ইতিহাস জানে। সরকার যদি প্রজন্ম চত্বরের গর্জন শুনতে ভুল করে তাহলে সরকারও বিপাকে পড়বে। সরকারের মনে রাখা উচিত প্রজন্ম চত্বরের এই জনস্রোত কিন্তু প্রথমে সরকারকেও ভালভাবে নেয়নি। এখন সরকার তাদের দাবির মূল্য দিচ্ছে বলেই না তারা সরকারকে খুব খারাপ চোখে দেখছে না। তার মানে সরকার যেন মনে না করে প্রজন্ম চত্বরে যে তরুণরা এসেছে তারা তাদের দাবি থেকে সরে আসবে। প্রজন্ম সৈনিক রাজীব হায়দারে মৃত্যুর পরে প্রজন্ম চত্বরের এই গর্জন এখন সারাদেশে, অবিলম্বে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সরকার অবশ্য তাদের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইতোমধ্যে নতুন আইন পাস করেছে। যে আইন অনুযায়ী এখন যুদ্ধাপরাধী ব্যক্তির যেমন বিচার করা যাবে তেমনি যে সংগঠন যুদ্ধাপরাধ করেছিল তারও বিচার করা যাবে। অর্থাৎ এই আইনে এখন জামায়াতে ইসলামীর তাদের ১৯৭১ সালের কর্মকা-ের বিচার করা যাবে। অবশ্য ইতোমধ্যে দুই যুদ্ধাপরাধীর ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায়ে জামায়াতে ইসলামী সংগঠন হিসেবে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাই এখন দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার শুরু করলে ১৯৭১ সালে ওই দলে যারা ছিল তাদের প্রায় সকলে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং তাদের সকলকে কোন না কোন মেয়াদে সাজা ভোগ করতে হবে। এবং ওই বিচারের পরে হয়ত বিচার বিভাগের রায়ে নাৎসী পার্টির মতো জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিও নিষিদ্ধ হবে। কিন্তু প্রজন্ম চত্বরের গর্জন, যে গর্জনের ভেতর দিয়ে জামায়াত নিষিদ্ধের আহ্বান আসছে- তারা কিন্তু ততদিন অপেক্ষা করতে রাজী নয়। আর অপেক্ষা করার কোন যুক্তিও নেই। কারণ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বর্তমানে যা করছে তাদের সেসব কর্মকা-ের জন্য এক মুহূর্ত আর তারা বাংলাদেশে কোন রাজনীতি করতে পারে না। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তারা রাজনীতির অধিকার পাবার পর থেকেই তাদের রাজনীতি রগ কাটা ও গলা কাটার রাজনীতি। তারপরে গত চার মাসের বেশি সময় ধরে তারা এ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তারা পুলিশের ওপর অর্থাৎ রাষ্ট্রের ইউনিফর্মের ওপর হামলা করছে। তারা পুলিশ হত্যা করেছে। তারা নৃশংসভাবে তরুণ মেধাবী স্থপতি রাজীব হায়দারকে হত্যা করেছে। তারা রাস্তায় মালবাহী গাড়িতে আগুন দিচ্ছে। তারা চলন্ত যানবাহন উল্টে দিয়ে মানুষ হত্যা করছে। তাদের নেতার বাড়ি থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও পুলিশের ওপর হামলার নীল নকশা উদ্ধার হচ্ছে। তাদের নেতারা প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধের ডাক দিচ্ছে। তাছাড়া এই সংগঠনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মৌলবাদী প্রায় সকল জঙ্গী সংগঠনের রয়েছে যোগাযোগ। লাদেনের আল কায়েদা থেকে শুরু করে প্রায় সব আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনের রয়েছে তাদের যোগাযোগ।
প্রজন্ম সেনা রাজীব হত্যার পরে প্রজন্ম চত্বর থেকে জামায়াত নিষিদ্ধের গর্জন উঠেছে, ওই জামায়াত, বর্তমানে জঙ্গী অপরাধে অপরাধী জামায়াত। দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে যে জামায়াত-শিবির ওই জামায়াত। তাই সরকার যদি প্রজন্ম চত্বরের এই গর্জনের অর্থ শুনতে ভুল করে তাহলে সরকার ভুল করবে এবং সরকারের সেই ভুল করার সুযোগ নেই। কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার। এই মহাজোট সরকারের ১৪টি দলের জয়বাংলা স্লোগান দিতে কোন আপত্তি নেই। যে জয়বাংলা স্লোগান একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকার থেকে রক্ত ও বারুদ মাখা শরীর নিয়ে ৪২ বছর পরে আরো অগ্নিগর্ভ হয়ে ফিরে এসেছে প্রজন্ম চত্বরে। ছড়িয়ে গেছে এই দেশের কোটি শিশুর মুখে। তাই বর্তমান সরকারকেও মনে রাখতে হবে, তাদের কণ্ঠেও একই জয়বাংলা স্লোগান। এ জন্য বর্তমান সরকারকে প্রজন্ম চত্বরের এই গর্জনের অর্থ বুঝতেই হবে। সেই অর্থ বুঝে তাদের কাজ করতে হবে। অর্থাৎ অবিলম্বে নির্বাহী আদেশে জঙ্গী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের সকল কর্মকা- নিষিদ্ধ করতে হবে। যারা সরকারকে ভয় দেখাচ্ছে জামায়াত বাঘ তারা সরকারে শত্রু নেই বা বললাম তবে এটা বলতে দ্বিধা নেই তারা ভুল করছে। কারণ জামায়াত যে কাগুজে বাঘ সেটা ইতোমধ্যে প্রজন্ম চত্বর প্রমাণ করে দিয়েছে। তারা খালি হাতেই সারাদেশে জামায়াতকে অচ্ছুৎ প্রমাণিত করেছে। সারাদেশ মূলত এখন বর্জন করেছে জামায়াতকে। তারেক রহমানের কথামতো যে শিবির ও ছাত্রদল একই মায়ের সন্তান সেই শিবির জামায়াতের কোন হরতালে এই প্রথম সাধারণ মানুষের ভয়ে সমর্থন দিতে পারল না বিএনপি। তাই মূলত দেশের মানুষ ইতোমধ্যে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেছে। এখন বাকি শুধু সরকারের নির্বাহী আদেশটি। এখন তাদের নিষিদ্ধ করলে তারা আরও কম জোর হয়ে পড়বে। এবং অচিরেই তারা ধূলিসাত হয়ে যাবে। তাছাড়া তাদের নিষিদ্ধ করলে কী করবে? বর্তমানে যা করছে বড়জোর সেটা করারই চেষ্টা করবে। বর্তমানে তারা যে কাজ করছে সেটা বাস্তবে নিষিদ্ধ কোন সন্ত্রাসী সংগঠনের কাজই করছে। আইনগত রাজনীতির অধিকার আছে বলেই কিন্তু তারা এটা বেশি করতে পারছে। নিষিদ্ধ করলে তারা এটা করতে পারবে না। তখন তাদের দমন করা আরও সহজ হবে। এ কারণে সরকারের আর অপেক্ষা করা ভুল হবে। বরং তারা যত দ্রুত প্রজম্ম চত্তরের গর্জনের সঙ্গে নিজেদেরকে মেলাতে পারবে দেশের মানুষ ও নতুন প্রজম্ম ততই তাদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করবে। তাছাড়া সরকারকে এটাও মনে রাখতে হবে, মানুষ তাদেরকে ভোট দিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে, রাষ্ট্রের কোন কিছুই সন্ত্রাসীদের হাতে ছেড়ে দেবার জন্যে নয়। আর রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায় ও সত্যর জন্য কঠোর হতে না পারা অনেক বড় ব্যর্থতা। তাই ব্যর্থতার পথে নয়, অবিলম্বে নির্বাহী আদেশে জামায়াত নিষিদ্ধ করুন। বিজয় নিয়ে ঘরে ফিরুক প্রজন্ম চত্বরের প্রজন্ম সেনারা।