মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ৩০ মাঘ ১৪১৯
ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ার দাবি করে মাহবুব রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ করেছেন
সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী
সমিতি
স্টাফ রিপোর্টার ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেনের বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল এবং আদালতের বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দেয়ায় খন্দকার মাহবুব হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাজধানীর শাহবাগসহ সারাদেশে চলমান গণআন্দোলনের সঙ্গেও একাত্মতা প্রকাশ করেছেন তারা।
সোমবার সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি আয়োজিত এক সভায় প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে আইনজীবীরা এই সংহতি প্রকাশ করেন এবং মন্তব্য করেন। সভা শেষে প্রস্তাব পড়ে শোনান সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক এ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন মেহেদি। এতে বলা হয়, ‘খন্দকার মাহবুব যে দৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। এজন্য তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ‘সেই সঙ্গে আমরা শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। আমরা এই সভা থেকে শুধু কাদের মোল্লা নয়, সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবি করছি।’ সভা থেকে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও জানান বক্তারা।
সভায় সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির জেষ্ঠ্য সহ-সভাপতি কে এম সাইফুদ্দিনের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের একাংশের সভাপতি এ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার, সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সাবেক আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন খসরু, এ্যাডভোকেট এএফএম মেজবাহ উদ্দিন, সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের অপর অংশের সদস্য সচিব এ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, এ্যাডভোকেট মোঃ আজাহারউল্লাহ ভূঁইয়া ও এ্যাডভোকেট সানজিদা খানম।
এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার বক্তব্যে বলেন, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। এই দিনের পর যে ব্যক্তি দেশের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে, কথা বলেছে, অস্ত্র ধারণ করেছে তারা প্রত্যেকেই অপরাধী। দেশে সংগঠিত এই সব অপরাধের বিচার করার সব এখতিয়ার বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে। এরপরও যারা জাতিসংঘের অধীনে বিচারের কথা বলেন, তাদেরও বিচার হতে পারে। তিনি বলেন, ন্যাশনাল ফোরাম ফর প্রটেকশন অফ হিউম্যান রাইটস নামে একটি সংগঠনকে সুপ্রীমকোর্টে সেমিনার করতে দেয়া হয়েছে। কেন এ প্রতিষ্ঠানকে দক্ষিণ হলে অনুষ্ঠান করতে দেয়া হয়েছে?
এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি বলেছেন, শাহবাগে যে আন্দোলন হচ্ছে এটা রাজনৈতিক সভা। সেখান থেকে জয় বাংলা সেøাগান দেয়া হচ্ছে। সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি ’৭১-এ কোথায় ছিলেন? নিশ্চই কোন রাজাকারের ঘরে ছিলেন। এ সেøাগান নিয়ে কোন তাচ্ছিল্য করবেন না। এ সেøাগান আমাদের জাতীয় সেøাগান, এটা আমাদের বাঁচার সেøাগান।
এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পৃথিবীর কোন দেশে এমন নজির নেই, যে দেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা রাজনীতি করতে পারে। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ জামায়াত গত ৪০ বছরে অনেক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। তাদের রাজনীতি করতে দিলে তাদের অপরাধ চলতেই থাকবে। সভায় সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের একাংশের সভাপতি এ্যাডভোকেট আব্দুল বাসেত মজুমদার বলেন, আমার মনে হয়, যারা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বক্তব্য দেয়। তারাও যুদ্ধাপরাধী। ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ার দাবি জানিয়ে দেয়া বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা হওয়া উচিত।
সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জাতিগত দায়িত্ব আমাদের সবার। এই দায়িত্ব আইনজীবীদের আরও বেশি। ৩০ লাখ শহীদ, আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জত হরণকারীদের উপযুক্ত সাজা দিতে হবে। জনতার রায়ে এই উপযুক্ত সাজা হচ্ছে ফাঁসি। তিনি বলেন, সেই রায় না হওয়ায় আমরা হতাশ হয়েছি। সেই হতাশা আমরা জনসমুদ্রও দেখেছি। তবে আমরা আশা করব, আপীল বিভাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেবে। তিনি আরও বলেন, যে কোন আসামি ট্রাইব্যুনালে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারেন। তবে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না। কেউ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে একটি কথা বললে তাকে টেনে-হিঁচড়ে হোক যেভাবেই হোক শাহবাগে নিয়ে যাব। সেখানেই তরুণরা তাদের বিচার করবে। শাহবাগ এখান থেকে বেশি দূরে নয়। মাঝে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দুই মিনিটেই নিয়ে যাওয়া যায়। রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিপক্ষে কথা বলবে, এমন আইনও করতে হবে, যাতে তাদেরও বিচার ওই ট্রাইব্যুনালে হতে পারে। আইনজীবীরা এদেরকে চিনে রাখুন, জনসমুদ্র এদের বিচার করবে।
সভাপতির বক্তব্যে খন্দকার মাহবুব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি কেএম সাইফুদ্দিন বলেন, খন্দকার মাহবুব ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ার কথা বলছেন। দেখেন আপনার নেত্রী খালেদা জিয়া চুপ হয়ে গেছে। আপনাকেও বলব জনতার কাতারে থাকুন। তিনি বলেন, সব বিচারে সব আইনে জনতা কি চায় সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনতা চায় ফাঁসি। আইন যদি ফাঁসি দিতে না পারে, তাহলে জনতার দাবিতে সেই আইন ৭ দিনে পরিবর্তন হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির দক্ষিণ হলে আয়োজিত এক সেমিনারে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেয়ার দাবি জানান। মানবাধিকার সংস্থা ‘ন্যাশনাল ফোরাম ফর প্রটেকশন অফ হিউম্যান রাইটস’ এই সেমিনারের আয়োজন করে। এই সংগঠনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন। আর এর সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের আইনজীবী এ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। এর প্রতিবাদে সোমবার আহ্বান করে সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি।