মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ৩০ মাঘ ১৪১৯
আপীলের বিধান রেখে কেবিনেটে আইনের খসড়া অনুমোদন
সংশোধন হচ্ছে
আন্তর্জাতিক অপরাধ
ট্রাইব্যুনাল আইন
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার বা সংক্ষুব্ধ যে কোন ব্যক্তির আপীলের সুযোগ রেখে আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এছাড়া মন্ত্রিসভা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইনর খসড়াসহ সাতটি আইনের খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে। সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই অনুমোদনে দেয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে এটি পাস করা হতে পারে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা এ কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, একটি রায় জাতিকে পুনর্জাগরিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই ‘জয় বাংলা’ সেøাগান আবার ফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের এই সেøাগানটি শুধু আওয়ামী লীগের নেতারা ব্যবহার করেন। এখন থেকে এটি বাংলাদেশের একটি জাতীয় সেøাগানে পরিণত হবে বলে মন্ত্রিসভার সদস্যরা আশাপ্রকাশ করেছেন।
সূত্র জানায়, শাহবাগের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় ব্যাপক আলোচনা হয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে দেশের যুবসমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছে। দেশব্যাপী এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে। জেলা শহর, উপজেলা শহর থেকে এখন এটি গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছে। এ সময় মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য বলেন, মাত্র কিছু দিন আগেও দেশের যুবসমাজকে
নয়ে জনমনে একটি নেতিবাচক ধারাণা হয়েছিল। কিন্ত্র এই নবজাগরণে জনমনের সে ধারণা পাল্টে দিল। ট্রাইব্যুনাল গত মঙ্গলবার আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজার আদেশ দেয়ার পর দ-ের মাত্রা বাড়াতে আপীলের সুযোগ না থাকার বিষয়টি উঠে আসে। ওইদিন বিকেলেই রাজধানীর শাহবাগে শুরু হয় ছাত্র-জনতার আন্দোলন। একাত্তরে ‘মিরপুরের কসাই’ হিসেবে পরিচিত কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে দেশজুড়ে শুরু হয় গণজাগরণ। এই প্রেক্ষাপটে শনিবার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। সচিবালয়ে রবিবার এ সংক্রান্ত এক জরুরী বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী বলেন, আইন সংশোধনের পর প্রসিকিউশন ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি উভয়েই আপীল করতে পারবে। ৩০ দিনের মধ্যে আপীল করার পর আপীল বিভাগকে তা ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। কোন বিশেষ কারণে যদি অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হয় তবে আরও ১৫ দিন সময় নিতে পারবে। অর্থাৎ আপীল করার পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। তিনি বলেন, এ সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই, আসামিপক্ষ এবং প্রসিকিউশনের সমান অধিকার সৃষ্টির জন্যই আইন সংশোধন হচ্ছে।
সূত্র জানায়, আইনটি পাস হলে কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধের দায়ে দ-প্রাপ্ত যে কোন ব্যক্তির সাজা বৃদ্ধির জন্য সরকার আপীল দায়ের করতে পারবে। এছাড়া প্রস্তাবিত এই সংশোধনীতে সরকারের পাশাপাশি সংক্ষুব্ধ যে কোন ব্যক্তি আপীল দায়ের করতে পারবে। অর্থাৎ শহীদ পরিবার, ‘ভিকটিম’ এমনকি শাহবাগে আন্দোলনরত তরুণ প্রজন্মরাও আপীল দায়ের করতে পারবে। নতুন এই সংশোধনীতে আপীলের সময় আপীলকারী মেমোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একত্রে দাখিল করবেন, যাতে পেপারবুক প্রস্তুতির ঝামেলা এড়িয়ে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করা যায়।
মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০০৯ সালে ট্রাইব্যুনালের রাযের বিরুদ্ধে আপীল করার বিধান সংযোজন করে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়। এই সংশোধনীতে শুধু কোন ব্যক্তিকে খালাশ দেয়ার রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপীল দায়েরের বিধান রাখা হয়। ট্রাইব্যুনালের প্রদত্ত দ- বৃদ্ধির জন্য সরকারের আপীল করার বিধান ২০০৯ সালের সংশোধনীতে রাখা হয়নি বিধায় যুদ্ধাপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনটি পুনরায় সংশোধন করতে হচ্ছে। ২০০৯ সালের সংশোধনীতে সরকার কর্তৃক দ-বৃদ্ধির আপীলের বিধান রাখা হলে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক হতো না বলে অনেকে মনে করেন। তবে বিলম্বে হলেও প্রস্তাবিত সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হলে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের অবসান ঘটবে এবং এই সরকারের মেয়াদকালে শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধের বিচারের সমাপ্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসাইন ভূঁইঞা পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই আইনের এই সংশোধনী বিল আকারে পাস হবে। ফলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সংশোধিত আইনেই আপীল করা যাবে বলে আশা করা যায়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে (কাদের মোল্লার) মামলা পরিচালনা হয়েছে বা আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছেÑ এ সংশোধনীর ফলে তাতে কোন প্রভাব পড়বে না। এ সংশোধনী একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন। ১৯৭৩ সালের আইনে সরকারের আপীলের কোন সুযোগ ছিল না। পরে ২০০৯ সালে আইন সংশোধন করে এতে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের সুযোগ যোগ হয়। এখন আইন সংশোধনের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আসামির মতো সরকার বা প্রসিকিউশনেরও আপীলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন ॥ সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন-২০১৩-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইঞা সাংবাদিকদের জানান, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসকে সংজ্ঞায়ন ও আইনকে আরও যুগপোযোগী করতে এ সংশোধন করা হচ্ছে। সন্ত্রাস বৈশ্বিক সমস্যা এবং ক্রস বর্ডার টেরোরিজম বাড়ছে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া কার্যকরভাবে সন্ত্রাস দূর করা যায় না।
মোশাররফ বলেন, সন্ত্রাসের ডেফিনেশনগুলোকে ডিফাইন না করতে পারলে সন্ত্রাস দমন করা যাবে না। ক্রসবর্ডার সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসকে সংজ্ঞায়িত করতে আইনে কিছু বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে ২০১২ সালে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন পাস হয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসে অর্থায়নের জন্য সর্বোচ্চ ২০ বছর কারাদ- ও জরিমানার বিধান রাখা হয়।
এছাড়া বৈঠকে ‘দি পার্টনারশিপ (সংশোধন) আইন-২০১৩-এর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এর মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সেবার ফি বাড়ানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বিভিন্ন সার্ভিসের ফি চার টাকা, ১০ টাকা এমনকি দেড় টাকাও ছিল, যা সেকেলে। এসব সার্ভিস ফি সামঞ্জস্য করা হয়েছে। এর ফলে সরকারের রাজস্বও বাড়বে। এই আইন সংশোধনের ফলে চার টাকার একটি আবেদনপত্রের দাম চার শ’ টাকা করা হয়েছে। অন্যান্য ফিগুলোও বাড়বে।
বৈঠকে বাংলাদেশ পানি সুরক্ষা আইন-২০১৩-এর খসড়াও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। গত বছরের ২১ মে এই আইনটির নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, পানি সম্পদের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাই আইনের মূল লক্ষ্য। পানি নিয়ে একটি নীতি আছে কিন্তু একটি আইনী কাঠামো থাকলে নীতি বাস্তবায়ন সহজ ও কার্যকর হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, পানি ব্যবস্থাপনা, পানির সদ্ব্যবহারে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে বিধিনিষেধ, পানির লেভেলসীমা নির্ধারণ, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের সুরক্ষা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, পানি দূষণরোধ সংক্রান্ত বিষয় এই আইনে রয়েছে।