মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ৩০ মাঘ ১৪১৯
জয় বাংলা, জাগো জাগো, বাঙালী জাগো
স্বদেশ রায়
----------
রাত দুটো বেজে ১০ মিনিট। ইংরেজরা হলে বলত টেন পাস্ট টু ইন দি মর্নিং। কিন্তু গত রাতে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে দাঁড়িয়ে আসলে দ্বিধায় পড়ে গেলাম, একি ভোর দুটো না রাত দুটো। না কি রাত আর দিন সমান হয়ে গেছে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেন এক ভদ্রমহিলা, সামনে তাঁর জীবনের বন্ধু আর সঙ্গে সন্তান। এর ভেতরই মোটরসাইকেলে এসে নামল আরেকটি পরিবার। দুটো সন্তান তাদের এ চত্বরে নেমেই যেন চঞ্চল পাখি হয়ে উঠল। আর মূল চত্বরে তখন সমুদ্রের গর্জন। অনেক গভীর রাতে অশান্ত বঙ্গোপসাগরের গর্জন শুনেছি। শুনেছি সুন্দরবন কাঁপানো বাঘের ডাক। হাল্কা কুয়াশা মাথায় নিয়ে মূল চত্বরের দিকে এগিয়ে যেতে মনে হলো, আসলে যেন কয়েকটি অশান্ত বঙ্গোপসাগর এখানে উঠে এসেছে। প্রচ- ক্ষোভে ফুঁসছে তার ঢেউগুলো। একটুখানি এগিয়ে যেতেই থমকে দাঁড়াতে হলো। চারপাশে মোমবাতি দিয়ে ঘিরে নিয়ে বসে আছে একদল তরুণ, সঙ্গে কিছু মধ্যবয়সীও। সেখানে রক্তের অক্ষরে লেখা জয় বাংলা’ আর নিচে লেখা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সন্তান। জয় বাংলা পাশে একটি বড় বোর্ড। তাতে যা লেখা আছে সেটাই বঙ্গোপসাগরের গর্জনের মতো তাদের গলা বেয়ে বেরিয়ে আসছে। কফিন আছে, লাশ চাই। আর পেছনে ফেলে এসেছি ফাঁসির মঞ্চ। এই মঞ্চ থেকেই যেন তার লাশ নিতে বসে আছে। আর গর্জন শুনে মনে হচ্ছে এ লাশ কফিনে ভরে তারা বাংলাদেশের মাটিতে কোথাও কবর দিয়ে এ মাটিকে অপবিত্র করবে না। কফিনসহ নিক্ষেপ করবে বঙ্গোপসাগরে।
------------
ডেট লাইন
প্রজন্ম চত্বর
-------------
ওই রাতেও হাজার হাজার ছেলেমেয়ে। তাদের কণ্ঠ ফুঁড়ে বারুদের গোলার মতো বেরিয়ে আসছে জয় বাংলা। এই সেই জয় বাংলা। মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ শব্দাস্ত্র। যে শব্দাস্ত্রের গর্জন শুনলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেত পাকিস্তানী হানাদার সেনারা। শক্রর বাঙ্কারে বাঙ্কারে তাড়িয়ে ফিরেছে তখন এই একটি অস্ত্র। সে অস্ত্রের নাম জয় বাংলা। কী ভয়ানক শক্তিশালী, কী পবিত্র এই অস্ত্র! নিরস্ত্র বাঙালীকে যেদিন মার্কিন ও চীনা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তানীরা আক্রমণ করেছিল সেদিন বাঙালীর কাছে ছিল এই একটি অস্ত্র। এই জয় বাংলা। এই একটি অস্ত্র নিয়ে বাঙালী নেমে পড়েছিল প্রতিরোধ যুদ্ধে।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধা কিছু ‘সামরিক’ অফিসারের সহায়তায় রাজাকাররা প্রতিবিপ্লব ঘটানোর পরে এই অস্ত্রকে তারা নির্বাসনে পাঠায়। সেই দুঃসহ দিনে ছাত্রলীগের কিছু তরুণ সেদিন কত কষ্টে কোন মতে এই ‘ভয়াবহ’ মারণাস্ত্রটি আগলে রাখে। রাজাকাররা সেদিন বোঝাতে সমর্থ হয় এই জয় বাংলা কিছু নয়। ওটা ওই একটি দল আর কিছু লোকের একটি সেøাগান মাত্র। জাতিও ক্রমে ভুলে যেতে থাকে। যার ফলে কিছু সঠিক বুদ্ধিজীবী আর কিছু সত্যপ্রাণ কবির কলমেই ছিল জয় বাংলা। তবে সকলের কলমেও ছিল না। আজ যাঁরা বুদ্ধিজীবী হয়ে অধিকাংশ সময়ে সমাজে নানান স্তরে বড় বড় কথা বলেন, অনেকে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তাঁদের কলমে বা কণ্ঠে কোথাও ছিল না জয় বাংলা। সবখানে সে ছিল অনাদৃত। এমনকি একাত্তরে যে বাম শক্তি মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিল তারাও কুণ্ঠিত হয় এই প্রাণের অস্ত্রটি কাছে তুলে নিতে, বরং তারাও ফেলে দেয় একে।
আজ এই প্রজন্ম চত্বরে নতুন প্রভাতের পূর্ব মুহূর্তে আকাশের শুকতারাটি যখন দপ দপ করছে তখন অবিরাম জয় বাংলা গর্জন শুনতে শুনতে মনে হলোÑ কে বলে, আমার মা দুঃখিনী বাংলা মা। মা কি কখনও দুঃখিনী হয়! মা তো মা। তাই সে এতদিন হয়ত তার নষ্ট ছেলেদের হাত থেকে মুক্তিসংগ্রামের এই সব থেকে বড় সম্পদটি বাঁচানোর জন্য তার ঘাসের আঁচলের নিচে রেখেছিল। যখন সে দেখতে পেয়েছে তার খোকা, খুকুরা মানুষ হয়েছে অমনি তাদের কাছে তুলে দিয়েছে এই মহামূল্যবান সম্পদটি। আর যেন বলেছে, এই নে, তোকে আমার সর্বস্ব দিলাম। এই নিয়ে পথে বেরিয়ে পড় দেখবি সবই পাবি। নতুন প্রজন্ম মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে বলেছে, মাগো তুই এতদিন যে কষ্ট করেছিস, যে অপমানে অপমানিত হয়েছিস তার শোধ নিতে এই তো আমি বেরিয়ে পড়লাম। শোন মা শোন, একবার কান পেতে শোন, তোর দুহিতা পদ্মা মেঘনার গর্জনের থেকেও আমি কত জোরে বলতে পারি- জ-য়Ñ বাং-লা।
’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর ওই রাজাকার শক্তি যেমন জয়বাংলাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিল তেমনি যে বাঙালী হিসেবে আমি যুদ্ধ করলাম। যে বাঙালী হিসেবে বিশ্ববুকে বেঁেচ থাকার জন্য ৩০ লাখ শহীদ হলো। ছয় লাখ মা-বোন আব্রু দিল সেই বাঙালী পরিচয়টিও কেড়ে নিয়েছিল। এখন প্রজন্ম চত্বরে আমাদের সন্তানরা তাদের কণ্ঠের সব শক্তি দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে, তুমি কে, আমি কে? বাঙালী, বাঙালী। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা। তাই ওই শেষ রাত আর নতুন প্রভাতের মিলন সময়ে প্রজন্ম চত্বরে দাঁড়িয়ে কেবলই মনে হলো, ওরে ভয় নাই।
আসলে ভয় নাই। যুদ্ধে জিতে গেছে নতুন প্রজন্ম। সারাদেশ এখন জেগে উঠেছে। এমনি করেই জেগে উঠেছিল ১৯৭১। জয়ী আমরা হয়েছিলাম। কিন্তু সে বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৭৫ আসতেই বিজয় শেষ হয়ে যায়। অপেক্ষা করতে হয় এতটা বছর। এখন কেবল বলা যাচ্ছে আর অপেক্ষার পালা নয়। কিন্তু কেন ’৭১-এ জয়ী হয়ে ’৭৫ না আসতেই পরাজিত হয়েছিলাম। আজকের এ বিজয়ের শুরুতে সে কারণটি মোটা দাগে হলেও খুঁজতে হবে। ১৯৭১ এমনি চূড়ান্ত বিজয়ের সূচনা সময় ৭ মার্চ। এই ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন, মনে রাখবেন এখন আমাদের ভেতর শত্রু ঢুকবে। আমরা যেন হিসাব করে চলি। এখনও কিন্তু সেই একই কথা আরও বেশি করে মনে রাখা দরকার। কারণ, ’৭১-এ দেশের ভেতর শত্রু কম ছিল। এখন দেশের ভেতর অনেক শত্রু। তারপরে আছে ছদ্মবেশী শত্রু। তাই আরও বেশি হিসেব করে চলতে হবে এখন চূড়ান্ত বিজয় পেতে হলে। মনে রাখতে হবে কেবল কয়েক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলেই চূড়ান্ত বিজয় হবে না। আরও অনেক দূর যেতে হবে। তাই এখন অনেক বেশি সাবধান হতে হবে। আজকে যারা শাহবাগ চত্বরে তারা সবাই ইতিহাসের বরপুত্র। তারা স্বাধীনতার চেতনা ফিরিয়ে আনার যুদ্ধের অগ্রগামী সৈনিক। তাদের মনে রাখতে হবে, এই স্বাধীনতা কিন্তু তাদের মতো ইতিহাসের বরপুত্র, ইতিহাসের রাজপুত্র, রাজকন্যারা এনে দিয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের ইতিহাসের এক রাজপুত্র। যেদিন একটি বইয়ে এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস লেখা হবে সেদিন অনেক নাম সেখানে লেখা সম্ভব হবে না। কিন্তু এ মুহূর্তে বাংলাদেশে যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের ভেতর মনে হয় সেদিন স্বাধীনতার ইতিহাসের অধ্যায়ে এক লাইনে স্থান পেলেও পাবেন তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলে গেছেন এদেশের মানুষ তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান করে। তাই গণঅভ্যুত্থানের এই মহানায়ককে বাদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস হবে না। তার নিজস্ব রাজনৈতিক দলের সমীকরণে তিনি যেখানেই থাকুন না কেন, স্বাধীনতার চেতনার জাগরণে তাঁকে সম্মান করতেই হবে। তাঁকে অসম্মান করলে কণা পরিমাণ হলেও স্বাধীনতার চেতনাকে অসম্মান করা হয়। তাই যারা এ কাজ করছে তারা কিন্তু প্রজন্ম চত্বরে স্বাধীনতার চেতনা জাগাতে আসেনি, এ কাজের পরে বঙ্গবন্ধুর কথা স্মরণ করতেই হবে, শত্রু ঢুকবে। তারা বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করবে। সেই চেষ্টারই অংশই কিন্তু ইতিহাসের রাজপুত্র তোফায়েল আহমেদকে অসম্মান করা, সেই চেষ্টারই অংশ এই গণজাগরণের রাজকন্যা লাকিকে অসম্মান করা।
তরুণ প্রজন্ম! অনেক কঠিন এক সংগ্রাম তোমরা কাঁধে তুলে নিয়েছ। তাই অনেক সাবধান হতে হবে। এমনকি তাঁদের সঙ্গে যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা আছেন তাঁদেরও সাবধান হতে হবে। যেমন মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দীন ইউসুফের পাশে যাঁরা জামায়াত-শিবিরবিরোধী সংগ্রামে আছেন তাঁদের রাখতে হবে। তাঁর পাশে যদি গত আড়াই বছর যে ব্যক্তি জামায়াতের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য টেলিভিশনে চিৎকার করেছে তাকে দেখা যায়, তাহলে সেটাও অশনিসঙ্কেত। মনে রাখতে হবে বিশাল এক শত্রুর বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ। এখানে ভুল করার কোন অবকাশ নেই। বরং এখনও অনেক জোরে বলতে হবে, জাগো জাগো, বাঙালী জাগো। কেবল সকলে জেগে উঠলেই তবে সত্যিকার রাত পোহাবে। পালিয়ে যাবে এই অনুপ্রবেশকারীরা।