মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ৩০ মাঘ ১৪১৯
প্রজন্ম চত্বরে অবস্হানের ৭ দিন।। শিক্ষার্থীর ঢল
* আজ বিকেল ৪টা থেকে ৪টা তিন মিনিট পর্যন্ত যে যেখানে আছেন দাঁড়িয়ে তিন মিনিট নীরবতা পালন- প্রজন্ম চত্বরের কর্মসূচী
* শোলাকিয়ার ইমাম, ভারতের গায়ক কবীর সুমন, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সংহতি
রাজন ভট্টাচার্য ॥ ‘পক্ষ নিলে রক্ষা নাই-রাজাকারের ফাঁসি চাই।’ সোমবার শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে লাখো মানুষের মুখে ধ্বনিত হয়েছে এই সেøাগান। আন্দোলনের সপ্তম দিনে নেমেছিল তারুণ্যের ঢেউ। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিবাদী কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে ’৭১-এ পেরেছি; ২০১৩ তেও পারব। তারা আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে জানিয়ে দিয়েছে, দেশমাতৃকার প্রতি ভালবাসার গভীরতা কতটুকু। নতুন প্রজন্মের দেশপ্রেমের প্রতি লাল সালাম জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।
আন্দোলনকে ঘিরে সকল অপপ্রচার ভেসে গেছে জনতার জোয়ারে। আজ আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে দেশব্যাপী সংহতি কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। বিকেল চারটা থেকে চারটা তিন মিনিট পর্যন্ত স্তব্ধ থাকবে গোটাদেশ। এই সময়ে যে সেখানে থাকবেন সেখানে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শেষ করতে বিশাল ব্যানারে টানানো হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের শেষ চিঠি। সারাদেশে দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধের আহ্বান জানানো হয় ঘোষণা মঞ্চ থেকে। লিফলেট বিলি করার সময় আটক করা হয়েছে একাধিক শিবির কর্মীকে। সংহতি প্রকাশ করেছেন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ইমাম আল্লামা ফরিদউদ্দিন মাসউদ, ভাষা মতিনসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। আন্দোলনে প্রতি সংহতি জানিয়ে আবারও গান লিখেছেন কবির সুমন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি দল শাহবাগ চত্বরে এসে এ সংহতি প্রকাশ করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সাবেক সভাপতি একে আজাদ, বর্তমান সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিনসহ অনেকে। আন্দোলন নিয়ে মিডিয়ায় অপপ্রচার চালালে জাগরণ মঞ্চে অবাঞ্ছিত করার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সন্ধ্যার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মশাল আর মোমবাতি প্রজ্বলন করা হয়। মিছিল আর প্রতিবাদী সেøাগানে ঘৃণা জানানো হয় রাজাকারদের প্রতি। প্রকম্পিত হয় রাজপথ।
আজ তিন মিনিট স্তব্ধ থাকবে দেশ ॥ দেশব্যাপী সংহতি কর্মসূচীর ডাক দিয়েছেন শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকারীরা। অফিস-আদালত, কর্মস্থল ও নিজ নিজ অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে তিন মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আন্দোলনের আহ্বায়ক ড. ইমরান এইচ সরকার এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যে যেখানে আছেন, কলে-কারখানায়, গাড়িতে, রাস্তায়, মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে ৪টা তিন মিনিট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাবেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে পুরো বাংলাদেশকে স্তব্ধ করে দেবেন। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে চলমান আন্দোলনের সমর্থনে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে নতুন এ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে চলমান আন্দোলনের আয়োজকদের একজন খান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এই কর্মসূচীর প্রতি একাত্মতা জানানোর জন্য আমরা দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। ড. ইমরানের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে উপস্থিত হাজারো জনতা হাত উঁচু করে সাড়া দেন। ড. ইমরান অভিযোগ করেন, কিছু মিডিয়া আমাদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য এবং নেতৃত্বের সঙ্কট তৈরির উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। তারা এ অপপ্রচার বন্ধ না করলে আমরা তাদের বয়কট করতে বাধ্য হব। মিডিয়ার কারণে বিভ্রান্ত হবেন না, আমাদের আন্দোলন যেভাবে চলছে সেভাবেই চলবে বলে জানান তিনি।
জাহানারা ইমামের শেষ চিঠি ॥ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে দেশে গণআন্দোলন শুরু করেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। বিচারের প্রতীকী ফাঁসিও দেয়া হয়েছিল শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের। কিন্তু বাস্তবে তিনি বিচার দেখে যেতে পারেননি। তাই মৃত্যুর আগে নিজের লেখা শেষ চিঠিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে গেছেন তিনি। সোমবার শাহবাগের বিশাল ব্যানারে এই চিঠি টানানো হয়। এতে লেখা আছেÑ ‘আমার সহযোদ্ধা বন্ধুগণ। আপনারা গত তিন বছর একাত্তরের ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছেন। এই লড়াইয়ে আপনারা দেশবাসী অভূতপূর্ব একতা-সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আন্দোলনের শুরুতে আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম। আমাদের অঙ্গীকার ছিল লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ রাজপথ ছেড়ে যাব না।’
চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘মরণব্যাধি ক্যান্সার আমাকে মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেবার ক্ষমতা কারও নেই। তাই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি এবং অঙ্গীকার পালনের কথা আরেকবার আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আপনারা অবশ্যই আপনাদের কথা রাখবেন। আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন। আমি না থাকলেও, আমি জানাবÑ আমার কোটি কোটি বাঙালী সন্তানরা আপনাদের পুত্র-কন্যাদের নিয়ে মুক্ত সোনার বাংলায় বাস করছেন।’
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনকে আরও বেগবান করার আহ্বান জানিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয় ‘এই আন্দোলনে এখনও অনেক দুরন্ত পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, ছাত্র, যুবশক্তি, নারী সমাজসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইয়ে আছে। তবু আমি জানি, জনগণের মতো বিশ্বস্ত আর কেউ নয়। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই গোলাম আযম ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দায়ভার আমি আপনাদের, বাংলাদেশের জনগণের হাতে অর্পণ করলাম। নিশ্চিত জয় আমাদের হবেই।’
‘হে আল্লাহ তুমি জালিমদের সঙ্গে থেক না’ ॥ দেশের বৃহত্তম ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ইমাম আল্লামা ফরিদউদ্দিন মাসউদের নেতৃত্বে শতাধিক মাওলানার একটি দল শাহবাগের আন্দোলন চত্বরে এসে সংহতি জানায়। বেলা দেড়টার দিকে গণজাগরণ চত্বরে আসেন মাওলানা মাসউদ। ঘোষণা দেয়া হয় মাইকে। করতালি দিয়ে হাজারো জনতা তাঁদের স্বাগত জানায়। মাইকে সংহতি প্রকাশ করে তিনি বলেন- হিটলারের নাৎসিবাদের মতোই ভয়ঙ্কর জামায়াত। দেশের ইমাম সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শাহবাগের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করতে এসেছেন বলে জানান। গত ৭ দিন ধরে এখানে যারা আন্দোলন করছে তাদের সঙ্গে দেশবাসীর দোয়া রয়েছে। দেশের ইমাম সমাজকে এই আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় উপস্থিত আন্দোলনকারীদের নিয়ে এক মোনাজাতে পরম করুণাময় আল্লাহুর কাছে তিনি প্রার্থনা করেন, ‘হে আল্লাহ তুমি জালিমদের সঙ্গে থেক না। যারা দেশের সঙ্গে বেইমানি করেছে, দেশের মানুষকে হত্যা করেছে, মা-বোনদের ইজ্জত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে তুমি থেক না খোদা। যারা দেশের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেছে, আল্লাহ তুমি তাদের শায়েস্তা করো। তাদের দ্রুত ফাঁসির ব্যবস্থা করো। যেন খবর পাই ঘাতকদের ফাঁসি হয়েছে।’
এছাড়া শাহবাগে আন্দোলনরত হাজার হাজার তরুণ-জনতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ নায়ক ও মিয়া ভাই ‘ফারুক’। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এ সময় তিনি বলেন, তারুণ্যের এ জাগরণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় রাজাকারের ঠাঁই নাইÑ এ কথা তরুণ প্রজন্ম ঘুণে ধরা রাজনীতীবিদদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। সংহতি প্রকাশ করেছেনÑ রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, আবাহনী ক্রীড়া চক্র মহিলা ফুটবল দল, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, খেলাঘরসহ বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।
নির্মূল কমিটির সংহতি প্রকাশ ॥ সোমবার একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি চলমান আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে বিকেল পাঁচটায়। ব্যানার ছাড়াই সংগঠনের ২১ নেতাকর্মী শাহবাগের রুপসী বাংলা হোটেলের সামনে এসে জড়ো হন। আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লেখক, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি জামায়াত-শিবির চক্রসহ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করতে জাহানারা ইমামের আন্দোলনের জন্ম। ২১ বছর এই আন্দোলন নানা বাধা, হুমকির মধ্য দিয়ে চলছে। আমাদের অনেক নেতাকর্মীকে হত্যা ও জেলে নেয়া হলেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। আমাদের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল আজকের নতুন প্রজন্মের জেগে ওঠা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে সবাই শাহবাগের দিকে ছুটে আসছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এ রকম জাগরণের কোন নজির নেই। নতুন প্রজন্ম জাহানারা ইমামের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে ৩০ লাখ শহীদের প্রত্যাশা পূরণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেনÑ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, শামীম আখতার, শিল্পী হাশেম খান, কাজী মুকুল, ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ, নূরজাহান বোস, সালমা হক ও মমতাজ লতিফ।
জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ‘গণজাগরণ চত্বরে’ চলমান আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসঙ্গীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। সোমবার একটি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে চলমান আন্দোলনে তাঁর ‘অকুণ্ঠ সমর্থন’ জানিয়েছেন।
শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন, গণশত্রু এবং মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ঢাকায় যে আন্দোলন চলছে, তার প্রতি আমার অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। ওই চত্বরে যে গণঅভিপ্রায় দেখা গেছে তার সঙ্গে সমর্থন না জানিয়ে উপায় নেই। কলকাতায় বসে বারবারই আমার মনে হচ্ছে যদি বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে আমিও থাকতে পারতাম। সরাসরি হয়ত দেখতে পারছি না, তবে গণআন্দোলন এবং গণইচ্ছার উত্তাপ অনুভব করতে পারছি।
শাহবাগে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঢল ॥ স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাঁধ ভাঙ্গা ঢল নামে শাহবাগে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পরে সবাই মিলিত হন এখানে। দিনভর সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত করে রাখে পুরো এলাকা। নতুন প্রজন্মের এই দেশপ্রেম দেখে উজ্জীবীত হয়েছেন সবাই। আশাবাদী হয়েছেন আন্দোলন চালিয়ে যাবার। সেই সঙ্গে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবেন না বলেও প্রতিশ্রুতি ছিল হাজারো প্রতিবাদী তরুণ-তরুণীর কণ্ঠে।
দুপুরে শাহবাগের গণজাগরণ চত্বরে সংহতি জানাতে আসেন ঢাকা কমার্স কলেজের প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী। ১০টি বাসে করে ২০ শিক্ষকের নেতৃত্বে কলেজের শিক্ষার্থীরা আসেন এখানে। বাস থেকে নেমে দৌড়ে সবাই শাহবাগ চত্বরের দিকে আসতে থাকেন। প্রমাণ হলো দেশমাতৃকার টান কাউকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না।। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সংহতি প্রকাশ চলমান আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। শুরু হয় বিপ্লবী সেøাগান। ফাঁসি-ফাঁসিÑফাঁসি চাই সেøøাগানে প্রকম্পিত হয় শাহবাগ চত্বর।
কলেজের শিক্ষক শাজাহান বলেন, শনিবার কলেজের নোটিস বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি আকারে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, কলেজ থেকে শাহবাগের গণজাগরণে সংহতি প্রকাশ করতে যাওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করতে আহ্বান জানানো হয়। কলেজের ক্লাস শেষে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী আসবে বলে জানানো হয়। কলেজের পক্ষ থেকে আগেই বাস ভাড়া করা ছিল। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম অনেক সচেতন। তারা ইতিহাস জানে, নিজেরাই জানে কোথায় যেতে হবে, কি করতে হবে। দেশদ্রোহী রাজাকারদের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন শিক্ষার্থীদের আরও উজ্জীবিত করবে বলে মনে করেন তিনি। কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী তন্ময় দাশ বলেন, কলেজের দুটি বর্ষের শিক্ষার্থী ছাড়াও অনার্স ও সম্মান শ্রেণীর শিক্ষার্থীরাও এখানে এসেছেন। বিপ্লব জানালেন-আমরা একাত্তর দেখিনি। ২০১৩ সালের এই আন্দোলন আমাদের কাছে ১৯৭১ সালের মতোই মনে হচ্ছে।
নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী আজিজ নূর জানান, ’৭১-এর চেতনা নিয়ে আমরা শাহবাগে এসেছি। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি নিশ্চিত হলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। তাই চলমান আন্দোলনের কর্মসূচীতে আমরা পাশে আছি। থাকব বলে জানান তিনি। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল এ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ফারিহা তাবাসসুম বলেন, কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে শাহবাগে এসেছেন তিনি। রাজাকারদের ফাঁসি না হলে মনে শান্তি পাবে না, তাই না এসে পারলেন না। শাহবাগের ফুলের দোকানের সামনের রাস্তায় গোল হয়ে বসে সেøাাগান দেন বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থীরা। ক্লাসকে আজ ‘ছুটি’ জানিয়ে সব বন্ধু মিলে আন্দোলনে এসেছেন বলে জানান তাঁরা। ধানম-ি আইডিয়াল কলেজের ছাত্র আদনান সাকিব বলেন, আমরা ’৭১ দেখি নাই। এটিই আমাদের কাছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। এই আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। এছাড়া সকাল থেকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, রাইফেলস পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজ, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল, সেন্ট জোসেফ, হলিক্রস, দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, আহসান উল্ল্যাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নরসিংদী সরকারী কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আবদুর রউফ স্কুল এ্যান্ড কলেজ, বিজ্ঞান কলেজ, ধানম-ি উচ্চ বিদ্যালয়, ভিকারুননিসা স্কুল এ্যান্ড কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার-হাজার শিক্ষার্থী দল বেঁধে শাহবাগে আসেন। রাস্তাজুড়ে একেকটি দল বেঁধে গোল হয়ে বসে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি জানান তাঁরা। কাঁধে কাঁধ রেখে গোল হয়ে সেøাগান দেন অনেক স্কুলের শিক্ষার্থীরা।
১৯৭১ বর্গফুটের ব্যানার ॥ রাস্তায় বিছানো ব্যানারে একটু ময়লা পড়েছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছে দিচ্ছেন এক ছাত্র। এখানেই দেশপ্রেম। শাহবাগ মোড়ে বিশাল আকারের ব্যানার বিছিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মার্কেটিং বিভাগ। ১৯৭১ বর্গফুটের এই ব্যানারটিকে ঘিরে শিক্ষার্থীর এই দরদে সালাম জানান এক মুক্তিযোদ্ধা। বলে ওঠেন, বাবা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ করা সার্থক মনে হচ্ছে। এতদিন মনে হতো কি জন্য যুদ্ধ করলাম আর কিইবা পেলাম। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সঠিক কাজই করেছি।
ব্যানারটিতে লেখা হয়েছে, ১৯৭১-এ পেরেছি, ২০১৩ তে পারব। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- হবেই। কারণ ১৯৭১’র রেসকোর্স ময়দানই ২০১৩ তে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর। বিশাল আকারের এই ব্যানারটি গণস্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে স্বাক্ষরে ভরে যায়। তারপরও অনেকে চাইছে নিজের ক্ষোভ ঝাড়তে। কোথাও এক চিলতে ফাঁকা পেলেই লিখছেন মনের আবেগ ও দাবির কথা। ব্যানারকে ঘিরে সেøাগানে মুখরিত মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। মুহুর্মুহু সে্লগানে প্রকম্পিত করছে গোটা শাহবাগ এলাকা। দীপ্ত নামের এক শিক্ষার্থী জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগ ছাড়ছি না। ব্যানারটির ওপর পড়া গাছের পাতা কুড়াচ্ছিলেন ছাত্রটি। যেন বুক দিয়ে আগলে রাখতে চান প্রাণের দাবির এই ব্যানার। এছাড়াও ৭০ ফুটের একটি জাতীয় পতাকা টানানো হয়েছে একটি সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে।
আমরাও আপনাদের পাশে আছি Ñ ভাষা মতিন ॥ যুদ্ধাপরাধের দাবিতে চলমান আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করলেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনি। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, আমরা জিন্নাহ সাহেবকে বলেছিলাম, পাকিস্তানকে স্বাধীন শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু জিন্নাহ আমাদের কথা শুনলেন না। তিনি কার্জন হলের পেছন দিয়ে পালিয়ে গেলেন। এর এক বছর পর তিনি মারাও গেলেন। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পায়। ব্রিটিশ আমল থেকেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য আমরা তিল তিল করে রক্ত দিচ্ছি। এ গণজাগরণে আমরাও আপনাদের পাশে আছি। আন্দোলন সফলের মন্ত্র হিসেবে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমার নেতা মওলানা ভাসানী বলতেন, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা এক না হলে আন্দোলন সফল হয় না।