মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২০ জানুয়ারী ২০১৩, ৭ মাঘ ১৪১৯
যুদ্ধাপরাধী বিচার ॥ আব্দুল কাদের মোল্লা ও বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় শীঘ্রই
স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও জামায়াতের সাবেক রোকন বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলার রায় শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে। সাঈদীর মামলায় নতুন করে যুক্তিতর্ক চলছে। বিএনপি-জামায়াতের ৭ নেতার বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত আরও ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এর মধ্যে ৬ জন গ্রেফতার হয়েছেন। তিনজন শর্তসাপেক্ষে জামিনে রয়েছেন। তদন্ত সংস্থায় সর্বমোট ৬৪০টি অভিযোগ রয়েছে । এর মধ্য থেকে মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করে তদন্ত করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সূত্রে এ খবর জানা গেছে। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, আব্দুল আলীম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের, মামলাগুলো এখন শেষ পর্যায়ে। এর মধ্যে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষে ১৭ জনের সাক্ষী শেষ হয়েছে। এখন তার পক্ষে প্রথম সাফাই সাক্ষী চলছে। মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় সাক্ষীর জবানবন্দী শেষ হয়েছে, মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৫তম সাক্ষীর জবানবন্দী শেষ হয়েছে। জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ১২তম সাক্ষী জবানবন্দী প্রদান করেছেন। একইভাবে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৭ সাক্ষী তাঁদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। আরেক বিএনপি নেতা আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে নবম সাক্ষী তাঁর জবানবন্দী প্রদান করেছেন।
অন্যদিকে যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তারা হলেন জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী, বাগেরহাটের একেএম ইউসুফ, হবিগঞ্জের সাবেক এমপি সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, রাউজানের গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যশোরের মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন, জামায়াত নেতা আব্দুস সোবহান মিয়া, এটিএম আজহারুল ইসলাম, এমএ জাহিদ হোসেন খোকন, মোবারক হোসেন, আমজাদ মিনা ও লাহার আলী শাহ। এদের মধ্যে শর্তসাপেক্ষে জামিনে আছেন বিএনপি নেতা আব্দুল আলীম, মোবারক হোসেন ও রুস্তম আলী সিকদার। গ্রেফতার রয়েছেন মীর কাশেম আলী, মাওলানা একেএম ইউসুফ, আব্দুস সোবহান মিয়া, এটিএম আজহারুল ইসলাম, আমজাদ মিনা ও লাহার আলী শাহ।
২০১২ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধীদের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মামলার সংখ্যা বাড়ার কারণে ২০১২ সালের ২৫ মার্চ আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালে বিএনপি ও জামায়াতের মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলছে। তদন্ত সংস্থার প্রধান এমএ হান্নান খান জনকণ্ঠকে বলেছেন, ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা আরও তিনটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করব। এগুলো হলো জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার হাজী মোবারক ও ফরিদপুরের খোকন রাজাকার। ইতোমধ্যে এটিএম আজাহারুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হাজী মোবারক জামিনে রয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৬৪০টি অভিযোগ এসেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা বাগেরহাটের শরণখোলা দিয়ে মাওলানা একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছি। তার বিরুদ্ধে আরও তদন্ত করতে হবে। প্রাথমিক তদন্তেই তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মাওলানা একেএম ইউসুফ খুলনা অঞ্চলের শান্তিকমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনিই প্রথম রাজাকার সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত রাজাকাররা খুলনাতেই বেশি নৃশংসতা চালিয়েছে। খুলনা এলাকাতেই পাকহানাদার বাহিনীর সতায়তা ছাড়া রাজাকাররা হত্যা লুণ্ঠনসহ বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ চালিয়েছে। তিনি বলেন, তদন্ত শেষে আমরা তার বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রদান করব।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও বাচ্চু রাজাকার হিসেবে পরিচিত আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। এখন রায় ঘোষণার জন্য দুটি মামলাই সিএভিতে রাখা হয়েছে। জাময়াতের মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে ৬ ডিসেম্বর রায় ঘোষণার জন্য সিএভিতে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করায় শুধু সাঈদীর মামলাটি নতুন করে যুক্তিতর্ক করা হচ্ছে। তার মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষ যুক্ততর্ক শেষ করেছে। আজ থেকে আসামিপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক শুরু করবেন। যুক্তিতর্ক শেষ হলেই রায ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করে দেয়া হবে।
মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যার দুই মূল ঘাতক চৌধুরী মাঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে প্রসিকিউশনের কাছে জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। তদন্ত সংস্থায় সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে জানা গেছে। তদন্ত সংস্থার প্রধান এমএ হান্নান জনকণ্ঠকে বলেছেন, আমরা গত বছরের অক্টোবরে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রতিবেদন প্রসিকিউশন শাখায় জমা দিয়েছি। এদিকে প্রসিকিউশন থেকে জানা গেছে তারা প্রতিবেদন চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করতে আবারও তদন্ত সংস্থায় পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়টি অস্বীকার করে হান্নান খান বলেছেন, আমারা অনেক আগেই বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দিয়েছি। যদি প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে বলে তা হলো আরও তদন্ত করা যাবে।
তদন্তকারী সংস্থার সমন্বয়ক এমএ হান্নান খান বলেছেন, বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম চৌধুরী মইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান দু’জনেই বিদেশে অবস্থান করছেন। চৌধুরী মইনুদ্দিন থাকেন ইংল্যান্ডে আর আশরাফুজ্জামান আমেরিকাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এই দু’জনেরই বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, ড. মুনিরুজ্জামান, অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, ড. মুর্তজা, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. রশিদুল হাসান, ড. ফজলুল মহিউদ্দিন, ড. আবুল খায়ের, সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন, বিবিসির সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন, সাংবাদিক আনম গোলাম মোস্তফা, অধ্যাপক সিরাজুল হকসহ অন্য বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। আলবদর বাহিনীকে সহায়তা করেছে চৌধুরী মইনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান।
এই দু’জন ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ স্বাধীনতার উষালগ্নে ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ করে নির্মম নির্যাতন শেষে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আলবদর বাহিনীর চীফ এক্সিকিউটর বা ‘প্রধান জল্লাদ’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান আর অপারেশন ইনচার্জ ছিলেন চৌধুরী মাঈনুদ্দীন।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ আলবদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয় এবং এর সদস্যরা ওই বাহিনীর সদস্য হিসেবে নৃশংসতম ঘাতকের ভূমিকা পালন করে। অবশ্য ইতোমধ্যেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখি জামায়াতের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অন্যান্য অভিযোগের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬ দফা অভিযোগের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগও রয়েছে। ৭ দফা অভিযোগের মধ্যে শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন অপহরণ ও হত্যাসহ বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদকে হত্যার প্ররোচনার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধেও রয়েছে শহীদ দুই বুদ্ধিজীবী কবি মেহেরুন্নেছা ও সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে হত্যার অভিযোগ।