মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৩, ৬ মাঘ ১৪১৯
মেজর জিয়া গুলিবিদ্ধ
গুলিবিনিময়ে তিন দস্যু নিহত
বাবুল সরদার, বাগেরহাট ॥ মুক্তিযুদ্ধের নয় নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার ও দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন আহমেদ বনদস্যুদের গুলিতে শুক্রবার দুপুরে আহত হয়েছেন। তাঁকে মাথায় গুলিবিদ্ধ আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ঢাকা সিএমএইচে নেয়া হয়েছে। মেজর জিয়ার দেহরক্ষীদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি গুলি বিনিময়কালে তিন বনদস্যু নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। র‌্যাব, পুলিশ, বনবিভাগ ও জিয়ার নিকটজন সূত্রে এ খবর জানা যায়। সুন্দরবনের দস্যুদমনে সোচ্চার থাকায় তিনি বন ও জলদস্যুদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই টার্গেটে ছিলেন। এ ঘটনার তিন দিন আগে তিনি একটি বেসরকারী টেলিভিশনে দস্যুদের বেপরোয়া উপদ্রবের চিত্র তুলে ধরে তাদের দমনের পন্থা নিয়ে কথা বলেন। বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম সুন্দরবন ক্রমান্বয়ে বন ও জলদস্যুদের বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে? মেজর (অব) জিয়াউদ্দিনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা থেকে আবার প্রমাণিত হলো। এসব জলদস্যু একাধিক গডফাদারের আশ্রয় ও প্রশ্রয় পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার পর গোটা সুন্দরবন এলাকাজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সাধারণ জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নিরাপত্তায় কোস্টগার্ডকে জোরদার করা হয়েছে।
বরিশাল র‌্যাব-৮ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে মেজর জিয়া তাঁর স্টাফদের নিয়ে মংলা থেকে একটি কার্গোযোগে দুবলার চরের আলোর কোলে যাচ্ছিলেন। তারা পথিমধ্যে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের চরাপুটিয়া নামক স্থানে পৌঁছলে বনদস্যু মর্তুজা বাহিনীর ১০-১২ জন সদস্য তাদের কার্গো লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করলে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় জিয়ার দেহরক্ষীরা পাল্টাগুলি ছুড়লে উভয় পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এতে মর্তুজা বাহিনীর কমপক্ষে তিন দস্যু নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মেজর জিয়াউদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মিজানুর রহমান জানান, শুক্রবার দুপুরের দিকে মেজর জিয়াউদ্দিন তাঁর ৭-৮ জন দেহরক্ষীসহ একটি কার্গোযোগে মংলা থেকে আলোর কোলে ফিরছিলেন। তারা চরাপুটিয়া খালের ভেতর থেকে যাবার সময় বনদস্যু মর্তুজা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ট্রলার থেকে কার্গো লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে জিয়াউদ্দিনের বাম চোখের ভ্রুর উপরে গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় জিয়ার দেহরক্ষীরাও পাল্টাগুলি চালালে মর্তুজা বাহিনী ৩-৪ জন দস্যু নিহত হয়।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার খোন্দকার রফিকুল ইসলাম একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, দুবলার ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন মংলা থেকে আলোর কোলে যাবার সময় বনের চরাপুটিয়া এলাকায় বনদস্যুদের গুলিতে আহত হয়েছেন। নিহত বনদস্যুরা মর্তুজা বাহিনীর সদস্য বলে তিনি জানান। আহত মেজর জিয়াউদ্দিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তবে র‌্যাব-৮ ও বনবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, নিহত দস্যুদের লাশের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার পরে র‌্যাব, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও বনবিভাগ দস্যুদমনে সুন্দরবনে সমন্বিত অভিযান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
বেপরোয়া একাধিক সশস্ত্র দস্যুদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই সুন্দরবন ও সংলগ্ন বঙ্গোসাগরের পাঁচ লক্ষাধিক বনজীবী ও জেলে জিম্মি। দস্যুরা জেলে-বনজীবীদের কাছ থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে দুই শ’ কোটি টাকা মুক্তিপণ আদায় করে থাকে। এমনকি জীবিত অবস্থায়ও তাঁদের হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেয়। বনসংলগ্ন গ্রামগুলোর নারী-পুরুষ-শিশুরাও তাদের ভয়ে আতঙ্কিত থাকেন। এক মাস আগে শরণখোলা উপজেলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের মৎস্য বসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সামাদ হাওলাদারকে দস্যুরা ধরে মুক্তিপণের দাবিতে অত্যাচারের পর গুলি করে হত্যা করে বনের মধ্যে মাটিচাপা দিয়ে রাখে। গত দু’বছরে জানা অজানা অন্তত অর্ধশত জেলে ও বনজীবীকে হত্যা করেছে। খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুর, যশোর ও বাগেরহাটের একাধিক গডফাদার এসব দস্যু বাহিনীর আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা। এসব দস্যুবাহিনীকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এরা সরবরাহ করে থাকে বলে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে মেজর জিয়াউদ্দিন এসব দস্যু বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এ কারণে দস্যুরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এরই অংশ হিসেবে শুক্রবার তাঁর ওপর আক্রমণ চালায় বনদস্যু মর্তুজা বাহিনী। এ ঘটনার তিন দিন আগে তিনি একটি বেসরকারী টেলিভিশনে দস্যুদের উপদ্রবের চিত্র তুলে ধরে তাদের দমনের পন্থা নিয়ে কথা বলেন। এর মাত্র তিন দিনের মাথায়ই তিনি দস্যুদের গুলিতে আহত হলেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণ করেন এই কিংবদন্তীর মুক্তিযোদ্ধা। বীরত্বের সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলে যুদ্ধ করে তিনি ও তাঁর বাহিনী পাকিস্তানী সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের পর্যদুস্ত ও পরাজিত করেন। পুরো অঞ্চলকে মুক্ত করেন মেজর জিয়া। খ্যাতিমান মৎস্য ব্যবসায়ী মেজর জিয়া বনদস্যুদের কাছেও আতঙ্কস্বরূপ। এ কারণে তাঁর ওপর বনদস্যু মর্তুজা বাহিনী হামলা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শফিউল হক মিঠু পিরোজপুর থেকে জানান, পিরোজপুর শহরের পারেরহাট সড়কের বাসিন্দা সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ৯নং সেক্টরের (সুন্দরবন অঞ্চলের) সাব-সেক্টর কমান্ডর মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি ১৯৬৯ সালে সেনাবাহিনীতে (কমিশন র‌্যাঙ্ক) যোগদান করেন (সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট)। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলে মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন চাকরি রেখে বাড়িতে চলে আসেন। বাড়িতে ফিরে মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন মুক্তিকামীদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং নবম সেক্টর সুন্দরবন অঞ্চলের সাব-সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণ করেন এই কিংবদন্তির মুক্তিযোদ্ধা। বীরত্বের সঙ্গে সুন্দরবন অঞ্চলে যুদ্ধ করে তিনি ও তাঁর বাহিনী পাকিস্তানী সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের পর্যুদস্ত ও পরাজিত করেন। পুরো অঞ্চলকে মুক্ত করেন মেজর জিয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুন্দরবন অঞ্চলের ইয়ং অফিসার বর্তমান আইনজীবী সামশুল হক খান বলেন, মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধা দুবলারচর, মেহের আলীর চরে ক্যাম্প করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি পটুয়াখালী-খুলনার একাংশ বাগেরহাট-রায়েন্দা-শরণখোলা-মোরেলগঞ্জ, মংলা-পিরোজপুর-মঠবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করেন। যুদ্ধ ছাড়াও তিনি ৩ হাজার টন চাল ভারতের মুক্তিযোদ্ধা ক্যম্পে নিয়ে যান। খ্যাতিমান মৎস্য ব্যবসায়ী মেজর জিয়া বনদস্যুদের কাছেও আতঙ্কস্বরূপ। ঠিক যুদ্ধের মতোই তিনি জেলেদের পক্ষে বনদস্যুদের বিপক্ষে লড়াই করে অবশেষে গুলিবিদ্ধ হলেন।
মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন ১৯৭৫ সালে সিপাহী বিপ্লবে অংশ নেন। কর্নেল তাহেরের খুব কাছের মানুষ ছিলেন মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন। সিপাহী বিপ্লবের মামলায় তার অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন সাজা হয়। এরপর তিনি গোপনে সুন্দরবনে চলে যান। পরে ১৯৭৬-এর প্রথমদিকে পুলিশ সুন্দরবনের মাঝের চর এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে।
মেজর জিয়াউদ্দিন দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ১৯৭৯ সালে কারামুক্ত হয়ে জাসদের রাজনীতিতে জড়ান এবং সুন্দরবনে গিয়ে মৎস্য ব্যবসা শুরু করেন।
মেজর (অব) জিয়াউদ্দিন এরশাদ সরকার আমলে পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর বাবা মরহুম আফতাব উদ্দিন আহমেদও পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন।