মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৩, ৪ মাঘ ১৪১৯
বহুল আলোচিত পিপার স্প্রে কী?
শংকর কুমার দে ॥ ‘পিপার স্প্রে’। বোতলের সাহায্যে অবৈধ জনতা ছত্রভঙ্গ করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে পিপার স্প্রে। পুলিশ বিভাগে নতুন সংযোজন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে অনেক আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে গত এক মাস ধরে। এটা মরিচের গুঁড়ার মতো ঝাঁঝাল কেমিক্যালের তৈরি। বুধবার দুই বাম জোটের হরতালের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর ব্যবহৃত হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে পিপার স্প্রে। রাজধানী ঢাকায় গত এক মাস ধরে এই স্প্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত এক মাসে প্রায় পাঁচবার ব্যবহার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে এ খবর জানা গেছে।
পিপার স্প্রে কি, এর কার্যকারিতা কি রকম এবং কেন ব্যবহার করা হচ্ছে? এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, পিপার স্প্রে মরিচের গুঁড়ার মতোই ঝাঁঝাল। কিন্তু মরিচের গুঁড়া নয়। এটা এক ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি। পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করা হলে মরিচের গুঁড়ার মতোই ঝাঁঝাল জ্বালাপোড়া অনুভূত হবে। জনতার ওপর নিক্ষিপ্ত হলে জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে খুব দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। অথচ ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার বেনজীর আহমেদের কাছে পিপার স্প্রের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে অনেক আগে থেকেই পিপার স্প্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনেক আগেই উন্নত দেশগুলোতে বন্দুকের সাহায্যে আর টিয়ার গ্যাস শেল ব্যবহার করে অবৈধ জনতা ছত্রভঙ্গ বা এ ধরনের কাজে ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। জাতিসংঘে যেসব পুলিশ যাচ্ছে তাদের জন্য কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে এই স্প্রে আনা হয়েছে। গত এক মাস ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে এটা। এই স্প্রে আধুনিক, উন্নত, কার্যকর ও কম ঝুঁকিপূর্ণ। এটা খুব কাছাকাছি থেকে নিক্ষেপ করা যায়। পুলিশের আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পিপার স্প্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এই স্প্রে ব্যবহার প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেন, বন্দুকের সাহায্যে আগে টিয়ার গ্যাস শেল ব্যবহার করে অবৈধ জনতা ছত্রভঙ্গ করা হচ্ছিল। পৃথিবীর উন্নত দেশ-বিশেষ করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এখন বন্দুকের সাহায্যে টিয়ার গ্যাস শেল ব্যবহার করা হচ্ছে না। এর পরিবর্তে বোতলের সাহায্যে পিপার স্প্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। বন্দুকের সাহায্যে এই ধরনের গ্যাস সেল ব্যবহার করলে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। পিপার স্প্রে ব্যবহার করলে ঝুঁকি কম অথচ কার্যকারিতা বেশি। এটা টিয়ার গ্যাস শেল অপেক্ষা নিরাপদ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে দুই ধরনের গ্যাস। একটি হচ্ছে ‘সিএস গ্যাস’। অপরটি হচ্ছে ‘সিএন গ্যাস’। এই দুই ধরনের গ্যাসই বন্দুকের সাহায্যে ব্যবহার করার পরিবর্তে এখন বোতলের সাহায্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। বন্দুকের সাহায্যে ব্যবহার করা হলে টিয়ার গ্যাস সাধারণত দু’বার বিস্ফোরিত হয়। একবার বন্দুকের নলের মধ্যে বিস্ফোরিত হয়। আরেকবার মাটিতে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। বন্দুকের নলে বিস্ফোরিত না হলে যে পুলিশ বন্দুক চালায় সেই পুলিশও আক্রান্ত হতে পারে। অপরদিকে মাটিতে পড়ে বিস্ফোরিত হলে মাটি থেকে কুড়িয়ে উল্টা পুলিশের দিকে নিক্ষেপ করার সুযোগ থাকে। বন্দুকের সাহায্যে দু‘ভাবে নিক্ষেপ করার গ্যাস শেল আছে। একটি হচ্ছে লং রেঞ্জের ও অপরটি হচ্ছে শর্ট রেঞ্জের গ্যাস শেল। লং রেঞ্জ থেকে নিক্ষেপ করা হলে টার্গেট মিস হয়ে অন্যত্র গিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। শর্ট রেঞ্জ থেকে নিক্ষেপ করলেও নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তে অন্যত্র গিয়ে নিক্ষিপ্ত হতে দেখা যায়। এতে দেখা গেছে যার ওপর এই গ্যাস শেল গিয়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তার হাড় পর্যন্ত ভেঙ্গে গেছে, নয় তো পঙ্গু হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। পক্ষান্তরে খুব কাছে থেকে বোতলের মাধ্যমে পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করে ফল পাওয়া যায়। তাই বিশ্বের উন্নত দেশে এই ধরনের পিপার স্প্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ॥ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, কোন ব্যক্তির আগের রোগ না থাকলে পিপার স্প্রের কারণে মৃত্যুর কোন আশঙ্কা নেই। বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। মরিচের গুঁড়া মিশ্রিত স্প্রে করার কারণে একজন শিক্ষক মারা গেছেন বলে তাঁদের দাবির ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, দেশের প্রচলিত আইনে বলা হয়েছে, বে-আইনী সমাবেশে জনস্বার্থে বল প্রয়োগ করা যাবে। আমরা অস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করেছি। আর এই পিপার স্প্রে আগেও ব্যবহার হয়েছে। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবহার করছি। যে শিক্ষকের কথা বলা হচ্ছে, তার মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করা হলে তা নিশ্চিত হওয়া যেত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে অন্ধত্ব ঘটতে পারে, বন্ধ্যত্ব ঘটতে পারে, বিকলাঙ্গ হয়ে যেতে পারে এমন জিনিস ব্যবহার করা হয় না।
অভিযোগ ॥ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির তৎপরতার বিরুদ্ধে দুই বাম জোটের অর্ধদিবস হরতাল চলাকালে সংবাদ সংগ্রহের সময়ে সংবাদকর্মীদের ওপর পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকরা। পিপার স্প্রে নিক্ষেপ করার ঘটনায় বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী আহত হয়েছেন বলে দাবি করে সংবাদকর্মীরা বলেছেন, যাতে সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারে সেজন্য এই ধরনের স্প্রে ব্যবহার করেছে পুলিশ।