মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ৮ জানুয়ারী ২০১৩, ২৫ পৌষ ১৪১৯
সীমান্তে চার বাংলাদেশী হত্যায় ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ বাংলাদেশের
সংবাদ সম্মেলনে জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কূটনৈতিক রিপোর্টার ॥ বছরের প্রথম দুই দিনেই সীমান্তে চার বাংলাদেশীকে হত্যার ঘটনায় ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। ঘটনার চারদিন পর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিবেদন আসার পর সোমবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ।
সোমবার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তিনি ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে চার বাংলাদেশী হত্যার ঘটনাকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। ভারতের বার বার আশ্বাসের পরও সীমান্তে হত্যা বন্ধ না হওয়ায় রাতে বাংলাদেশীদের সীমান্ত অতিক্রম না করার আহবান জানান তিনি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের পদক্ষেপ নেয়ার নিদের্শ দেন তিনি।
সরকারের চার বছরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরতে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ওই সময়ে এক প্রশ্নের জবাবে সীমান্তে হত্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে হত্যা বন্ধে দুই দেশেরই করণীয় আছে। সীমান্ত হত্যাকান্ডের স্থান ও সময় পর্যালোচনা করলে কিছুটা পরিষ্কার হবে যে ঘটনাটি শুধু একপেশে কিছু নয়। যেহেতু ভারতের পক্ষ থেকে গুলি করা হচ্ছে সেহেতু তাদের ওপরই বড় দায়-দায়িত্ব পড়ছে। আমাদের কোন নাগরিক যেন রাতে সীমান্ত এলাকা অতিক্রম করার চেষ্টা না করে সে ব্যাপারে করণীয় ঠিক করতে সীমান্ত এলাকাবর্তী জেলা প্রশাসকদের নিদের্শ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হত্যাকান্ড কারও কাম্য নয়। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। অতীতে কোন সরকার সীমান্তে হত্যা বন্ধে এতো জোরালোভাবে প্রতিবাদ করেনি। প্রত্যেকটি ঘটনার পর তাৎক্ষণিক আমরা প্রতিবাদ করেছি। সীমান্তে হত্যা বন্ধে ভারত বার বার আশ্বাস দিয়েছে। এখন হত্যাকান্ডের সংখ্যা অনেক কমেছে। তবে আমরা চাই এ সংখ্যা শুণ্যের কোঠায় নেমে আসুক।
ঘটনার কয়েকদিন পর প্রতিবাদ দেয়া প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্যান্য ক্ষেত্রে যেভাবে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ পাঠানো যায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সঙ্গে সঙ্গে তা পারে না। ঘটনা যাচাইয়ের পর বিজিবি প্রতিবেদন পাঠানোর পরই প্রতিবাদ জানাতে পারে মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ্য, গত ১ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও সীমান্তে দুই জন এবং পরদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরও দুই জনকে হত্যা করা হয়। আরও কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে কয়েকদিনের হত্যাকান্ড, নির্যাতন নিয়ে রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বিজিবি। প্রতিবেদনে প্রতিটি ঘটনার সময় ভোর রাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হত্যা করা হয়েছে গুলি করে। প্রতিবেদনটি পাওয়ার পরদিন সোমবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘হঠাৎ সীমান্ত হত্যা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ খুবই উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে ক্ষুব্ধও।’ চিঠিতে ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারপ্রধানের সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গত চার বছরে পরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সাফল্যের কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, গত চার বছরে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সময় তিনি চার বছরে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীনের মতো পরাক্রমশালী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমা নির্ধারণী মামলায় জয় লাভ করা, রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার বিষয়ে চুক্তি, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বিভিন্ন বিষয়ে চুক্তি সই ও অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদ দমনে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া, জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও কাজের স্বীকৃতি প্রাপ্তি, জাতিসংঘসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দাবি আদায়ে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখা, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিদেশী বন্ধুদের মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা দেয়াসহ বিভিন্ন সাফল্য ও অর্জনের চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এটা ঠিক যে, পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ে ষোল আনা সাফল্য নেই। তবে জোর গলায় বলতে পারি, অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় এই চার বছরে এ মন্ত্রণালয়ের সাফল্য অনেক বেশি। গণমাধ্যমে সব সাফল্য সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারিনি এটা আমাদের অন্যতম ব্যর্থতা। এবারই প্রথম পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ‘ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’ ঘোষণার যথাযথ চর্চা করা হয়েছে।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে কয়েকটি পত্রিকার জরিপে সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্য ৩৩ শতাংশ উল্লেখ করা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা জরিপ করছেন আর যারা জরিপে অংশ নিচ্ছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, জরিপ অনেক রকম হয়। কেমন প্রশ্ন হবে সেটার ওপরও জরিপের ফলাফল নির্ভর করে। সরকারের চার বছরে অনেকগুলো জরিপ হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল আসায় কোনটাই চূড়ান্তভাবে গ্রহন করা যাচ্ছে না। সবগুলো জরিপ শেষ হোক, সেগুলোর ভেতর থেকে জরিপ করে বুঝতে হবে আসল অবস্থা।
দেশের রাজনীতি নিয়ে বিদেশী কূটনীতিকদের মন্তব্য ও পরামর্শ দেয়ার সমালোচনা করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচন কীভাবে হবে সেটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। রাজনৈতিক মহল, বিশিষ্টজনসহ সংশ্লিষ্টরা ঠিক করবেন কীভাবে নির্বাচন হবে। বিদেশীরা সেখানে কোন পরামর্শ দিতে পারে না। বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরামর্শ দেয়ার অধিকার তারা পেতে পারেন তবে সে পরামর্শ দেয়ারও তরিকা আছে। সেভাবে পরামর্শ দিলে আমরা চিন্তা করে দেখব তা গ্রহণ করা যায় কিনা। তবে চারদলীয় জোট সরকার এবং পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তুলনায় এ সরকারের সময় বিদেশী কূটনীতিকদের পরামর্শ দেয়া অনেক কমে গেছে বলে দাবি করেন দীপু মনি। তিনি বলেন, সবাই পরামর্শ দেন না। কেউ কেউ দেন। তবে আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন, আগের তুলনায় গত চার বছরে ওই কূটনীতিকদের মন্তব্য ও পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক তফাত তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা তুলে নিতে চাইছে এমন প্রশেরœ জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর একটি কপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া হয়েছে। যথাসময়ে এ বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে।