মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ৮ জানুয়ারী ২০১৩, ২৫ পৌষ ১৪১৯
গার্মেন্টসে জিএসপি সুবিধা পেলেই টিকফা চুক্তি করবে বাংলাদেশ
সুবিধা স্থগিত বা বাতিল করলে রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না ॥ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
কাওসার রহমান ॥ তৈরি পোশাকে জিএসপি সুবিধা পেলেই সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুলআলোচিত টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর করবে। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর অব্যাহতভাবে চাপ সৃষ্টি করছে বলে জানা যায়। সর্বশেষ তাজরিন ফ্যাশন্সে মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডের ঘটনায় পোশাক কারখানার মান উন্নয়ন ও শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রন কার্ক বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদেরের কাছে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত বা বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে প্রাপ্ত জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা বাতিলে উদ্বিগ্ন নয়।
এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জিএসপি তথা শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বাতিল করলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ জিএসপি সুবিধা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির মাত্র দশমিক ছয় শতাংশ পণ্য রফতানি হয়। যার পরিমান ৪০ থেকে ৬০ কোটি ডলার। তবে সরকার চায় না যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল হোক। কারণ এ সুবিধা বাতিল হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বিরূপ ধারণা তৈরি হবে। এ কারণেই দেশের তৈরি পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাজরিন গার্মেন্টসে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণসহ দীর্ঘমেয়াদে তাদের পরিবারের ভরণপোষণেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা বাতিলের আগে তাদের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতরে গণশুনানি হবে। ওই গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ তার গৃহীত পদক্ষেপ ও অবস্থান তুলে ধরবে। এছাড়াও
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির চিঠির জবাব দেয়ার চিন্তা করছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য প্রতিনিধি রন কার্ক যে কথাগুলো চিঠিতে উল্লেখ করেছেন সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। গৃহীত সেই পদক্ষেপগুলো সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হবে।
ইতোপূর্বেও বাংলাদেশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) ট্রেড ইউনিয়ন বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল। আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশনের (এএফএল-সিআইও) অভিযোগের প্রেক্ষিতে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি ওই উদ্যোগ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠনের ইউনিয়ন এএফএল-সিআইও ওই সময় বাংলাদেশের ইপিজেডে শ্রমিক ইউনিয়ন না থাকার ব্যাপারে বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতরে অভিযোগ করেছিল।
সর্বশেষ এএফএল-সিআইও গত ২০০৭ সালে বাংলাদেশকে জিএসপি-সুবিধা বাতিলের আবেদন করে। তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডের পর ওবামা প্রশাসন সম্প্রতি সেই আবেদনটিই গ্রহণ করেছে। এ সকল আবেদনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে- শ্রমিক ইউনিয়ন করতে না দেয়া, শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা ও হত্যার ঘটনায় কোন ব্যবস্থা না নেয়া। কর্মপরিবেশ না থাকার কারণে তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডে শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়া। জিএসপি সুবিধা বাতিল বা স্থগিত সংক্রান্ত জিএম কাদেরকে লেখা ওই চিঠিতে রন কার্ক এসব বিষয়ও উল্লেখ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘জিএসপি নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের রফতানির মাত্র দশমিক ছয় ভাগ জিএসপির আওতাভুক্ত। তারপরও আমরা চাই জিএসপি অব্যাহত থাকুক’।
তিনি বলেন, ‘জিএসপির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। তার একটি চিঠি আমাদেরও দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি তাজরিন ফ্যাশনে ভয়াবহ দুর্ঘটনার উদ্বেগ থেকেই এ চিঠিটা দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, পোশাক শিল্পে আগের চেয়ে অনেক সচেতন অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা নিজেদের স্বার্থেই রফতানির পণ্য উৎপাদনের কর্মপরিবেশ ও মান উন্নয়নের কথা ভাবছি’।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এবারের জিএসপি সুবিধা বাতিলের উদ্যোগটি তাদের প্রস্তাবিত ট্রেড এ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোঅপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের (টিকফা) সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডন মজেনা সম্প্রতি রন ক্লার্কের চিঠি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে যে সাক্ষাত করেছেন তাতেও তা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এ কারণে সরকার টিকফা চুক্তি নিয়ে সামনের দিকে এগুতে চাইছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি আন্তমন্ত্রনালয় সভাও হয়েছে। ওই সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে শর্ত সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ব্যাপারে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক এ্যাসিসটেন্ট ট্রেড রিপ্রেজেনটেটিভ মাইকেল জে ডিলানিকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানাবে। তার সঙ্গে আলোচনার সময় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রফতানির বিষয়টি জিএসপি সুবিধার আওতাভুক্ত করার জন্য দরকষাকষি করবে।
এ প্রসঙ্গে গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রী জিএম কাদেরের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডন মজেনা সাক্ষাত করেন। ওই বৈঠক শেষে তিনি জানান, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র খুুব শীঘ্রই টিকফা চুক্তি স্বাক্ষর করবে। দীর্ঘ সময় ধরে এ বিষয়টি নিয়ে দুই দেশ আলোচনা করছে। আশা করছি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে দুই দেশ এ চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌছাবে’।
বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকপণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চাইছে। এ জন্য তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে লবিস্ট প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাক ছাড়া বাকি সকল পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশ বর্তমানে জিএসপির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে যে সকল পণ্য রফতানি করছে তার মধ্যে রয়েছে তামাক, প্লাস্টিক ব্যাগ, গলফ ইকুইপমেন্ট, বোন চায়না টেবিলওয়্যার প্রভৃতি পণ্য। যার পারিমান মাত্র ৪০ কোটি থেকে ৬০ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানির পরিমান প্রায় ৫৯০ কোটি ডলার। যার প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। বর্তমানে বাংলাদেশী তৈরি পোশাক গড়ে ১৭ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করছে। এজন্য ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক আমদানি থেকে ৬৫ কোটি ডলারেরও বেশি শুল্ক আদায় করেছে।
উল্লেখ্য, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রন কার্ক তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সব শর্ত পূরণ করছে না। বিশেষ করে শ্রমিক অধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকারের বিষয়ে অগ্রগতি তো হয়ইনি, বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ ও কর্মপরিবেশ উন্নতিতে সংগঠিত ও নিবন্ধিত হতে দেয়া হচ্ছে না। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য আছে যে, যেসব শ্রমিক সংগঠিত হতে চেয়েছেন তাঁদের চাকরিচ্যুত অথবা কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমনও দেখা গেছে, যারা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছে তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।
তিনি চিঠিতে আরও বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাব, তারা যেন খুব দ্রুত পরস্থিতির উন্নতির জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে হাজির হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
অবশ্য মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির চিঠির পর পরই ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের গত শুক্রবার মার্কিন কংগ্রেসের হাউস কমিটি অন ওয়েজ এ্যান্ড মিন্স-এর র‌্যাংকিং সদস্য সেনডার মার্টিন লেভিনের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। রাষ্ট্রদূত এ সময় মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে বিতরণের উদ্দেশ্যে ‘বাংলাদেশ ইন ইউএস-জিএসপি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন কংগ্রেসম্যান লেভিনের কাছে হস্তান্তর করেন। আকরামুল কাদের সম্প্রতি আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশনস গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকা-ের ঘটনার উল্লেখ করে এ বিষয়ে সরকার এবং তৈরি পোশাক শিল্পের পক্ষ থেকে গৃহীত নানাবিধ ক্ষতিপূরণমূলক উদ্যোগের বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক গার্মেন্টস কর্মীর পরিবারকে ৬ লাখ টাকা করে প্রদান করেছেন। এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ আগামী ১০ বছর পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্টস কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, লেবার কমপ্লায়েন্সের যুক্তিতে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা তুলে নেয়া হলে তা দেশটির তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং উক্ত শিল্পে নিযুক্ত লাখ লাখ নারীকর্মী তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি বাংলাদেশের জন্য জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে কংগ্রেসম্যান লেভিনের সমর্থন ও সহায়তা কামনা করেন।
কংগ্রেসম্যান লেভিনও আশা প্রকাশ করেন, ইউএসটিআর বাংলাদেশের বিষয়টি যুক্তিসঙ্গতভাবে বিবেচনা করবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক অগ্নিকা-ের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এছাড়া, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।