মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
মঙ্গলবার, ২ অক্টোবর ২০১২, ১৭ আশ্বিন ১৪১৯
১৬৬ দুষ্কৃতী গ্রেফতার
০ আরও ২ বৌদ্ধ বিহারে হামলা
০ সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিশের গুলিবর্ষণ
০ জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৫ ওয়েস্টার্ন মেরিন শ্রমিক গ্রেফতার, মামলার আসামি ৪ হাজার
০ তদন্ত শুরু
এইচএম এরশাদ কক্সবাজার, দীপন বিশ্বাস উখিয়া, বিকাশ চৌধুরী পটিয়া, মোঃ ছলাহ্উদ্দিন টেকনাফ থেকে ॥ কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের পটিয়ায় বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে সহিংস ঘটনার পর রবিবার উখিয়া এবং নতুন করে বৌদ্ধ বিহারে হামলা হয়েছে। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে পটিয়ায়। উখিয়ায় শনিবার রাত থেকে দেয়া কার্ফ্যু বলবৎ রয়েছে। উখিয়াতে নতুন করে বলবৎ করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। এসব স্থানে সংঘর্ষের ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে, ১৬৬ জনকে গ্রেফতার হয়েছে। উখিয়ায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে শান্তি সমাবেশ হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নাকচ করেছেন কক্সবাজার-উখিয়া থেকে নির্বাচিত বিএনপি সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। মামলা হয়েছে পটিয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফ থানায়। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। রামুতে ঘটনা চলাকালে অবহেলার অভিযোগে থানার ওসি নজিবুল ইসলামকে সোমবার সন্ধ্যায় ক্লোজড করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিক্ষুব্ধ লোকজন রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারে ওসির ওপর হামলে পড়ে। এ সময় জনরোষ থেকে ওসিকে উদ্ধার করে র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরা। সহিংস ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি আজ মঙ্গলবার থেকে তদন্ত কাজ শুরু করছে। পরিস্থিতি যাতে আরও অবনতি না ঘটে তজ্জন্য সোমবার ভোররাত থেকে কক্সবাজার সদর এলাকার বড়ুয়াপাড়া, রামু উখিয়া এবং টেকনাফে সংঘর্ষকবলিত এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে।
কক্সবাজার থেকে জনকণ্ঠের নিজস্ব সংবাদদাতা এইচএম এরশাদ জানান, জেলার রামুতে শনিবার রাতে ঘটে যাওয়া এত বড় ন্যক্কারজনক ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে তথ্য বেরিয়ে আসছে। দেশে ইতোপূর্বে সংঘটিত সিরিজ বোমা হামলার স্টাইলে রামুতে পৃথক পৃথক এলাকায় ও পরদিন রাতে জেলার টেকনাফ ও উখিয়ায় বড়ুয়াপাড়ায়-মন্দিরে ও দোকানপাটে হামলে পড়েছে উত্তেজিতরা। ভাংচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ফিল্মিস্টাইলে।
ফেসবুকে পবিত্র কোরান অবমাননা করে ছবি ট্যাগ করার ঘটনার পর রামু ও উখিয়ার সহিংসতা জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বৌদ্ধ বিহার ও বসতবাড়িতে হামলা, ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগে এ পর্যন্ত ১০১ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এসব ব্যাপারে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও সদর থানায় ১৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
রামুতে পবিত্র কোরানের প্রতি অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি প্রদর্শনের ঘটনার জের ধরে উগ্রবাদীরা সোমবার ভোর পর্যন্ত দফায় দফায় হামলা চালিয়ে উখিয়ায় ২টি বৌদ্ধ বিহার পুড়িয়ে দেয়। ভাংচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালানো হয় ৫টি বসতবাড়িতে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন সোমবার সকাল থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে একসঙ্গে ৪ জনের অধিক চলাফেরার ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। টেকনাফে জুয়ারিয়াখোলা মন্দির ও সংলগ্ন ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দগ্ধ এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে।
রামু, উখিয়া টেকনাফ, মহেশখালীসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। সন্ধ্যায় পুলিশ দুষ্কৃতকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেও তারা ফের সংঘবদ্ধ হয়ে রবিবার রাত ১২টায় হলদিয়া পালং ইউনিয়নের পশ্চিম মরিচ্যা দীপাংকুর বৌদ্ধ বিহার ও সোমবার ভোর ৪টায় রাজাপালং খয়রাতিপাড়া প্রজ্ঞামিত্র বৌদ্ধ বিহারে আগুন লাগিয়ে দেয়।
মরিচ্যা দীপাংকুর বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবু লাল বড়ুয়া জানান, অগ্নিকা-ের ফলে মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি ২০টি বৌদ্ধ মূর্তি পুড়ে প্রায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সুজন বড়ুয়া, সোনাধন বড়ুয়া ও অরুণ বড়ুয়ার বাড়িসহ ৫টি বসতবাড়িতে লুটপাট ও ভাংচুর করেছে বলে তিনি জানান। ঐ মন্দিরের ভিক্ষু বিমল জ্যোতি বলেন, দুর্বৃত্তরা বৌদ্ধ মন্দিরে রক্ষিত ১১০টি বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুর করে পেট্রোল দিয়ে মন্দিরটি জ্বালিয়ে দিয়েছে। সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতকারীরা রেজুর কুল স্বধর্ম বৌদ্ধ বিহার, হলদিয়া পালং উত্তর বড়বিল, পাগলির বিল বৌদ্ধ মন্দির ও মরিচ্যা বেনুবন বৌদ্ধ বিহারসহ ৪টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালায়। রবিবার রাত ৮টায় টেকনাফ হোয়াইক্যং লম্বাবিল এলাকার একদল মানুষ সেøাগান দিয়ে জুয়ারিয়াখোলা মন্দির ও ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ ৭০ বছরের বৃদ্ধ বুচি শর্মা বড়ুয়া মারা যান। অন্য আহত মহিলা ও পুরুষরা সুস্থ রয়েছেন বলে জানা গেছে। ইমাম সমিতির সভাপতি ক্বারী কামাল উদ্দিন আহাম্মদ জনকণ্ঠকে জানান, কোরান নিয়ে অবমাননার ঘটনায় প্রকৃত জড়িতদের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অমুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এবং বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া ও ভাংচুর করা ইসলাম সমর্থন করে না।
জেলার রামুতে শনিবার রাতে ঘটে যাওয়া এত বড় ন্যক্কারজনক ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পিত বলে তথ্য বেরিয়ে আসছে। দেশে ইতোপূর্বে সংঘটিত সিরিজ বোমা হামলার স্টাইলে শনিবার রাতে রামুর বিভিন্ন স্থানে ও পরদিন রবিবার রাতে টেকনাফ ও উখিয়ায় বড়ুয়াপাড়ায়-মন্দিরে ও দোকানপাটে হামলে পড়ে উত্তেজিতরা। ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয় ব্যাপকভাবে। এমনকি বাধা প্রদানে আইনপ্রয়োগকারী সদস্যদের ওপরও হামলা চালানো হয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও ঘটনা ঘটাতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদেরও ভাড়া করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোহিঙ্গা জঙ্গী নেতারা গান পাউডার আর পেট্রোল দিয়ে মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণেরও ধারণা জন্মে যে, কেউ যদি অন্যায় করে থাকে, তাহলে ঐ অপরাধীর বিচার হবে, শাস্তি পাবে তা ঠিক। কিন্তু এ জন্য একটি সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় উপসানালয়ের ওপর এত বড় অত্যাচার কেন? কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রতিকে বিনষ্ট করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে দেশে অশান্তি সৃষ্টি করতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা সংঘটিত করেছে। জেলার ঐতিহ্য প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। এসব আর কখনও ফিরিয়ে পাওয়ার নয়।
অভিজ্ঞমহলের মতে, রামুর উত্তম কুমার বড়ুয়া নামে ওই যুবকের ফেসবুকে পবিত্র কোরান শরীফ অবমাননাকর ছবিটি প্রদর্শিত হলে এ জন্য ঐ যুবক দায়ী। নতুবা কেউ ছবিটা ট্যাগ করে দিলে ওই যুবক কখনও দায়ী হতে পারে না। যেহেতু তার ফেসবুকে ইনসাল্ট আল্লাহ নামের এক ফেসবুক আইডি থেকেই ছবিটি শেয়ার-ট্যাগ করে নেয়া হয়েছে। একজন আইনজীবী সহকারী (মুন্সি) ভাল করে কম্পিউটারও চালাতে জানেন না। উত্তম কুমারের দাবি, কেউ একজন তার ফেসবুকে অবমাননাকর ঐ ছবিটি ট্যাগ করে দিয়েছে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে মুসলিম-বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক আকারে নেয়ার প্রচেষ্টা চালায় একাধিক মৌলবাদী গ্রুপ। তারা উস্কানি দিয়ে ধর্মপ্রিয় মুসলমানদের ক্ষেপিয়ে তোলে। পূর্বপরিকল্পনা না থাকলে এভাবে বিভিন্ন স্থানে একই সময়ে বিভক্ত হয়ে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ইত্যাদি চলতে পারে না। সাধারণ জনগণ গান পাউডার এবং পেট্রোলের অসংখ্য কন্টেনার হঠাৎ করে পেল কোথায়? এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বস্তরের জনগণের কাছে। ২৫০ বছরের পুরনো মন্দির রামুর কেন্দ্রীয় সিমা বিহারের ভিক্ষু প্রজ্ঞানান্দ মহাথের জনকণ্ঠকে জানান, শনিবার রাত ১২টায় এই বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালানো হয়েছে। অসংখ্য মোটরসাইকেল ও ট্রাকে করে দলে দলে লোকজন এসে হামলায় অংশ নেয়। মন্দিরে রক্ষিত দেশ-বিদেশের মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি সহস্রাধিক মূর্তিসহ গান পাউডার ও পেট্রোল দিয়ে মন্দির জ্বালিয়ে দেয়। কিছু কিছু মূর্তি তারা লুট করে নেয়। বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ওয়েল ফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি বোধি মিত্র বড়ুয়া ও রিসসো কোসেকাই বাংলাদেশের কক্সবাজার পরিচালক বাবুল বড়ুয়া জানান, এ ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত। রামুতে রাত ১২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মন্দির ও বড়ুয়াপাড়ায় দুষ্কৃতকারীদের তা-ব চললেও স্থানীয় প্রশাসন কোন ভূমিকা রাখেনি। পুলিশ চাইলে এ ঘটনা বন্ধ করতে পারত বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘটনার সময় রাতে একাধিকবার রামু থানার ওসিকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। যা কল লিস্ট চেক করলে সত্যতা মিলবে। এছাড়া দমকল বাহিনীও আগুন নেভাতে রামুতে যায়নি।
সোমবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জেলার রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তবে আতঙ্ক কাটেনি এখনও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঐ তিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০১ জনকে আটক করেছে। সোমবার সকাল থেকে জেলার কোথাও অপ্রীতিকর কোন ঘটনা ঘটেনি। রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মন্দির পুড়িয়ে দেয়া ও ঘরবাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কক্সবাজার জেলার সভাপতি কমরেড দিলীপ দাশ ও সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন আহমেদ। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, কক্সবাজারের রামু ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতি চর্চার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একে অপরের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি ছিল। বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনায় রামু সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারেনি। যে সমস্ত ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়ে বৌদ্ধ মন্দির ও বাড়ি ভাংচুর করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির এবং সংঘ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানায় নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া নেতৃবৃন্দ ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং মন্দির নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়ার দাবি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রক্ষা করার আহ্বান জানান।

এমপি কাজল নাকচ করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তাকে অভিযুক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যকে অবিবেচনাপ্রসূত ও ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় এমপি বিএনপি নেতা লুৎফর রহমান কাজল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নাকচ করে এমপি বলেন, এক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী যুবকের ফেসবুকে কোরান অবমাননামূলক ছবি পোস্ট করার প্রতিবাদে রামুতে মুসলমানরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুরোধে আমি রাত ১২টার পর রামুর উদ্দেশে রওয়ানা দেই। রামু সদরে পৌঁছে আমি দেখি, বিক্ষুব্ধ লোকদের সমাবেশে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল বক্তব্য দিচ্ছেন। পরে আমিও বক্তব্য দেই এবং লোকজনকে শান্ত থাকতে বলি। এ ঘটনার জন্য পুলিশ বাহিনীর গাফিলতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, রামুর ঘটনাটি সরকারী দলের কিছুসংখ্যক নেতাকর্মী সংঘটিত করেছে বলে আমার ধারণা।
বিজিবির সাহায্য প্রদান
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ কর্তৃক কক্সবাজারের রামুতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকা-ে-ভাংচুরে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরবাড়ি মেরামত, বাইরের দেয়াল এবং বিভিন্ন প্রকার রান্নাবান্নার সামগ্রী, খাদ্য সামগ্রী, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য প্রদান করেছে কক্সবাজার ১৭ বিজিবি কর্তৃপক্ষ।
রামু এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ঘরবাড়ি মেরামত, দেয়াল মেরামত করে দেয়ার কাজ শুরু করেছে বিজিবি জওয়ানরা। এর মধ্যে বহিস্থ দেয়ালের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঘরবাড়ি তৈরির কাজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হবে। এছাড়াও, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের মধ্যে, চাল, খাদ্যদ্রব্য, রান্নার তৈজসপত্র প্রদানও করা হয়।
রামুর ওসি প্রত্যাহার
রামুতে শনিবার রাতে সংঘর্ষ চলাকালে স্থানীয় লোকজন থানায় ফোন করে কোন সহযোগিতা পায়নি তাৎক্ষণিকভাবে। এমনকি ওসিকে দফায় দফায় ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসন সোমবার সন্ধ্যায় রামু থানার ওসি নজিবুল ইসলামকে ক্লোজড করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যায় বিক্ষুব্ধ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন ওসিকে কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারের সামনে দেখতে পেয়ে ক্ষেপে যায়। তারা ওসির ওপর আক্রমণ চালায়। জনরোষ থেকে বাঁচতে ওসি পালিয়ে গা-ঢাকা দেন। একপর্যায়ে খবর পেয়ে বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
পটিয়া থেকে বিকাশ চৌধুরী জানান, চট্টগ্রামের পটিয়ায় রবিবার বৌদ্ধ বিহার ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ভাংচুরের ঘটনায় সাড়ে ৪ হাজার জনের বিরুদ্ধে পটিয়া থানায় পৃথক তিনটি মামলা হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ সিসি ক্যামরার মাধ্যমে আসামি শনাক্ত করে ২৫ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে এলে রাতে এলাকার উগ্রবাদীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুর রশিদসহ ১০ পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের মধ্যে হাবিলদার আবদুর রহিমকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাধ্য হয়ে ২শ’ রাউন্ড গুলি, টিআর গ্যাস ও রবার বুলেট ছুড়েছে।
বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ভাংচুরের ঘটনায় চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন রাত জেগে বিহার ও মন্দিরগুলো পাহারা দেয়। বর্তমানেও ঘটনার উৎপত্তিস্থল কোলাগাঁও ইউনিয়নের লাখেরা গ্রামসহ পুরো পটিয়ায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে, বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির ভাংচুরের ঘটনায় দেশের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের উগ্রপন্থী কিছু শ্রমিক সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের কিছু শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। কর্ম পরিবেশ বিঘিœত হওয়ায় এবং গ্রেফতারের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় ওয়েস্টার্ন মেরিন কর্তৃপক্ষ কারখানায় একদিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। সোমবার এ প্রতিষ্ঠানে কোন কাজ হয়নি।
এদিকে, সোমবার ভোররাতে উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের ফারুকীপাড়ার মধ্যমপাড়া কালীমন্দিরে একদল দুষ্কৃতীকারী প্রতিমায় কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। বিষয়টি পাহারাদারদের নজরে এলে তারা শোরগোল করলে দুষ্কৃতীকারীরা পালিয়ে যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুকের আপত্তিকর ছবিকে পুঁজি করে রামুতে বৌদ্ধ বিহার জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনা পটিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে গত রবিবার দুপুরে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের তালা ভেঙ্গে শত শত শ্রমিক উপজেলার লাখেরা গ্রামে ঢুকে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে তা-ব চালায়। ওই সময় তারা ব্যাপক লুটপাট ও মারধর করে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। পরে পুলিশ ও র‌্যাব এসে ওয়েস্টার্ন মেরিন থেকে সিসি ক্যামরার সাহায্যে উগ্রপন্থী ২৫ জনকে শনাক্ত করে পটিয়া থানায় নিয়ে আসে। এরপর হঠাৎ রাত আটটায় ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আসামি গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধরা পুলিশের ওপর চড়াও হয় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটলে পুলিশ ২শ’ রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ, টিআর গ্যাস ও রবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে পটিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুর রশিদ, এসআই জাকির হোসাইন, এসআই কামাল উদ্দিন, এএসআই ইমাম হোসেন, কালারপুল পুলিশ ফাঁড়ির আইসি শাহজাহান ও হাবিলদার আবদুর রহিমসহ ১০ পুলিশ ও সাধারণ মানুষ আহত হয়। পরে বিষয়টি পুরো পটিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নিজ নিজ এলাকার বিহার ও মন্দিরগুলো রাত জেগে পাহারা দেয়।
বৌদ্ধ বিহার, মন্দিরে আগুন, ভাংচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পটিয়া থানায় পৃথক তিনটি মামলা করা হয়েছে। তার মধ্যে লাখেরা সার্বজনীন রতœাঙ্কুর বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ দীপানন্দ ভিক্ষু বাদী হয়ে গ্রেফতারকৃত ২৫ জনসহ এজাহার নামীয় ৩৭ জন এবং ৫শ’ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি মামলা করা হয়। তাদের সোমবার সকালে গ্রেফতার করা হয়। অপর দুই মামলার বাদী পটিয়া থানার এসআই জাকির হোসাইন ও পটিয়া থানার এসআই কামাল উদ্দিন। পুলিশ বাদী মামলায় দুটি আসামি চার সহস্রাধিক। স্থানীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ফেসবুকের আপত্তিকর ছবিকে পুঁজি করে রামুতে বৌদ্ধ বসতি ও বিহারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের জের ধরে পটিয়ার কোলাগাঁও ও লাখেরা এলাকায় জামায়াত সমর্থিত শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন নামের প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা তা-ব চালায়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বিনষ্ট করতে জামায়াতপন্থী এ ফেডারেশন বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে হামলা চালিয়েছে। তারা বৌদ্ধ বিহার ও সংলগ্ন মন্দিরে ঢুকে বৌদ্ধমূর্তি ও দুর্গার প্রতিমা ভাংচুর করে।
পটিয়া কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু ও সংঘরাজ পূণাচার ভিক্ষু সংসদের সেক্রেটারি সংঘপ্রিয় থেরো জানিয়েছেন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিহার ভাংচুর করে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অনুভূতিতে আঘাত হানা হয়েছে। রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ার ঘটনার পর পরেই এখানকার বৌদ্ধ বিহারগুলো রাত জেগে পাহারা দেয়া হয়। তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারখানা একদিনের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার কারখানা বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং কর্মপরিবেশ ফিরে এলে মঙ্গলবার থেকে পুনরায় কারখানায় কাজ শুরু হবে।
উখিয়া থেকে জনকণ্ঠের সংবাদদাতা দীপন বিশ্বাস জানান, কক্সবাজারের রামুতে কোরানের প্রতি অবমাননা করে ফেসবুকের মাধ্যমে ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় উত্তেজিতরা রবিবার মধ্যরাতে দফায় দফায় হামলা চালিয়ে উখিয়া উপজেলার ২টি বৌদ্ধ মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছে। এ সময় আরও ৪টি বৌদ্ধ মন্দির ও তৎসংলগ্ন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ৫টি বসতবাড়ি ভাংচুর করে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে উপজেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা ও ভাংচুর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ৩১ জনকে আটক করে আদালতে প্রেরণ করেছে। উখিয়ার বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা পাতাবাড়ি ও কুতুপালংয়ে এ বৌদ্ধ পল্লীতে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। গত রাতে বৌদ্ধ বিহার ও ঘরবাড়িতে হামলার আশঙ্কায় বৌদ্ধ পল্লীর যুব সমাজ রাত জেগে পাহারা বসিয়েছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল প্রদর্শন করে উত্তেজিতরা বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দির ও বসতবাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় দুর্বৃত্তরা পুলিশের প্রতি ইটপাটকেল ছুড়ে মারলে উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ অপ্পেলা রাজু নাহাসহ ৫ জন সদস্য আহত হয়। পুলিশ পাল্টা ৮০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে দুর্বৃত্তদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেও তারা আবারও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে রবিবার মধ্যরাতে হলদিয়া পালং ইউনিয়নের পশ্চিম মরিচ্যা দীপঙ্কর বৌদ্ধ বিহার ও রাজাপালং ইউনিয়নের খয়রাতিপাড়া প্রজ্ঞামিত্র বৌদ্ধ বিহারে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবুল বড়ুয়া জানান, অগ্নিকা-ের ফলে মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি ২০টি বৌদ্ধমূর্তি পুড়ে গিয়ে প্রায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ সময় দুর্বৃত্তরা বৌদ্ধ মন্দিরসংলগ্ন সুজন বড়ুয়া, সোনাধন বড়ুয়া ও অরুণ বড়ুয়ার বাড়িসহ ৫টি বসতবাড়িতে লুটপাট ও ভাংচুর চালায়। ওই রাতে দুর্বৃত্তরা রাজাপালং ইউনিয়নের রেজুর কুল স্বধর্ম বৌদ্ধ বিহার, হলদিয়া পালং ইউনিয়নের উত্তর বড়বিল, পাগলির বিল বৌদ্ধ মন্দির ও মরিচ্যা বেনুবন বৌদ্ধ বিহারসহ ৪টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুর করে ব্যাপক লুটপাট চালায়। হলদিয়া পালং ইউপি চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মিন্টু জানান, দুর্বৃত্তরা রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে নাশকতা চালানোর সময় গ্রামবাসী নিয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জহিরুল ইসলাম জানান, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রবিবার রাত ১২টা থেকে উপজেলার সর্বত্র অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। র‌্যাব, বিজিবি ও পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে টহল অব্যাহত রাখার কারণে সোমবার পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত হতে দেখা গেছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গত রবিবার রাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ও সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করার সময় ৩১ জনকে আটক করা হয়েছে।
ফটিকছড়ি থেকে আমাদের সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজারের রামু, টেকনাফ, উখিয়া এবং চট্টগ্রামের পটিয়ায় শনিবার এবং রবিবার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট, বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনার জের ধরে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কায় হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
হাটহাজারীতে জামায়াত-শিবির সমর্থিত উগ্রপন্থীদের অপতৎপরতার আশঙ্কায় বিভিন্ন স্পটে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এদিকে, সম্ভাব্য হামলার ভয়ে হাটহাজারীর সংখ্যালঘু এলাকাগুলোর জনগণ রবিবার নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে অতিরিক্ত ৩ প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সোমবার বিকেলে হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিশরাত জাহান পান্না সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কল্পে জরুরী এক সভার আয়োজন করেছেন। এতে সরকারী কর্মকর্তা, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় যে কোন মূল্যে শান্তি বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
হাটহাজারী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম লিয়াকত আলী জনকণ্ঠকে জানান, সব বৌদ্ধ বিহার, মন্দির এবং স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে সর্বক্ষণিকভাবে পুলিশ অবস্থান নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশ পৃথক টিম গঠন করে বিভিন্ন স্থানে টহল দিচ্ছে। অপরদিকে সরকারবিরোধী একটি মহল ফটিকছড়ির বিভিন্ন স্থানে হামলার গুজব ছড়াচ্ছে। উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসন বৃহত্তর ফটিকছড়ির স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নজরদারি রেখেছে।
আওয়ামী লীগের উদ্বেগ ॥ চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক সিটি মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কাজী ইনামুল হক দানু রবিবার রাতে প্রেরিত এক বিবৃতিতে রামু, উখিয়া, পটিয়ার কোলাগাঁও, লাখেরা মহেশখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের বৌদ্ধ মন্দিরসহ কিছু ঘরবাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নেতৃবৃন্দ এই সকল পরিকল্পিত হামলায় দোষী ও জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। রবিবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইনামুল হক দানু নন্দনকাননস্থ বৌদ্ধমন্দির পরিদর্শন করে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাতকালে বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের কঠোরহস্তে দমন করা হবে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত প্রশাসনসহ দলীয় নেতাকর্মীদের সজাগ দৃষ্টি রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান অজিত রঞ্জন বড়ুয়া, মহাসচিব লায়ন আদর্শ কুমার বড়ুয়া, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির যুব সভাপতি সুদীপ বড়ুয়া, সাধারণ সম্পাদক কর আইনজীবী জয়শান্ত বিকাশ বড়ুয়া, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও বৌদ্ধধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান স্বজন কুমার তালুকদার, কোতোয়ালি থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিথুন বড়ুয়া, সম্পাদকম-লীর সদস্য টিংকু বড়ুয়াসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সন্ত্রাসীদের কাউকে রেহাই দেয়া হবে না
নিজস্ব সংবাদদাতা, কক্সবাজার থেকে জানান, সোমবার বিকেল চারটায় রামু চৌমুহনী স্টেশন চত্বরে পবিত্র কোরান শরীফ অবমাননার জের ধরে বৌদ্ধ মন্দির ও বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করার প্রতিবাদের রামু উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত প্রতিবাদসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ফেসবুকে পবিত্র কোরান অবমাননাকারীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় যে কোন দলের কর্মী কিংবা বা সংসদ সদস্য হলেও কাউকে রেহায় দেয়া হবে না। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে এ ধরনের নারকীয় দৃশ্য দেখতে হবে তা কল্পনাও করিনি। দলের পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। এ ধরনের সহিংসতা ইসলাম কখনও সমর্থন করে না। এ ঘটনার মাধ্যমে ইসলামকে কলঙ্কিত করা হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পলী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এদের কোন ছাড় দেয়া হবে না। সেই সঙ্গে ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি দেয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত যুবকেরও বিচার করা হবে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দেশের কোথাও এ ধরনের অশুভ হামলা বরদাশত করা হবে না।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ সোমবার দুপুরে কক্সবাজারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ সব কথা বলেন। রামুর ঘটনার পেছনে যাদের ইন্ধন থাকবে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের ওই এমপি রামুর ঘটনাস্থলে গিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি উল্লেখ্য করেন, রামুসহ কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ও বাড়িঘরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বিহার ও বাড়িঘর সংস্কার করা হবে।