মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
সোমবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২, ২ আশ্বিন ১৪১৯
ছিনতাইয়ে পুলিশী নিষ্ক্রিয়তা ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে শ্রমিক বিস্ফোরণ
সংঘর্ষ আগুন ॥ আহত অর্ধশত
রুমন রেজা, খলিলুর রহমান, নারায়ণগঞ্জ থেকে ॥ অব্যাহত ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে রবিবার সিদ্ধিরগঞ্জ, আদমজী ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। হাজার হাজার শ্রমিক কারখানা ছেড়ে নেমে আসেন রাস্তায়। পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন তাঁরা। তিন ঘণ্টা ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং নারায়ণগঞ্জ ডেমরা সড়ক অবরুদ্ধ করে রাখেন তাঁরা। পুলিশ বক্সে হামলা চালায় এবং ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের একটি পিক-আপ ভ্যান ও পাঁচটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভাংচুর করে অর্ধশতাধিক যানবাহন। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষে ৮ পুলিশ সদস্যসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। পুলিশ শতাধিক রাউন্ড টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করেছে।
শ্রমিকরা জানায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ ১নং ওয়ার্ডে দেড় লাখ লোকের বসবাস। এই ওয়ার্ডের মিজমিজি, পূর্বপাড়া, পাগলাবাড়ি, মজিববাগ, পাইনাদি পূর্বপাড়া, সিআইখোলা ও বাতেনপাড়া এলাকায় থাকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক। এসব শ্রমিক আদমজী ইপিজেড ও সিদ্ধিরগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় কাজ করে। গত কয়েক মাস যাবত এসব এলাকায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী দুর্বৃত্তরা। প্রতিদিনই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ছিনিয়ে নেয়া হয় সর্বস্ব। গত দু’মাসে দুর্বৃত্তদের হামলায় গৃহবধূ সুলতানা, কাঁচামাল ব্যবসায়ী মাসুদ শেখসহ ৫ জন নিহত হয়েছে। ছুরিকাহত হয়েছে ১২ জন। কিন্তু কোন ঘটনাতেই পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে দুর্বৃত্তরা। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাও লালন করে দুর্বৃত্তদের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের টার্গেট নিরীহ শ্রমিক ও গৃহবধূ। ফলে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তারা।
এলাকাবাসী জানিয়েছে, শনিবার রাতে সিদ্ধিরগঞ্জ পূর্বপাড়ায় দুর্বৃত্তদের হামলায় শাহীন (২২) নামে আদমজী ইপিজেডের এক শ্রমিক এবং রেকমত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র জাহিদ হাসান ছুরিকাহত হয়। শাহিন মারা গেছেÑ এমন গুজব রবিবার সকালে আদমজী ইপিজেডের শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আদমজী ইপিজেডে ২২টি শিল্পকারখানায় প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করে। সকাল ১০টায় কাজ বন্ধ করে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসে রাস্তায়। সিদ্ধিরগঞ্জ পুল, সোনামিয়া মার্কেট, সুমিলপাড়া, শিমরাইল এলাকায় বিভিন্ন রফতানিমুখী গার্মেন্টস শ্রমিকদের বের করে নিয়ে আসে। সকাল সাড়ে ১১টায় শ্রমিকরা প্রথমে নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা সড়ক, পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে। শিমরাইল পায়েন্টে ২০-২৫ হাজার শ্রমিক অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে শ্রমিকদের একটি অংশ সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়। কাঁচপুর সিনহা টেক্সটাইল মিলসহ আশপাশের কারখানা থেকে শ্রমিকদের বের করে আনে। অবরোধ করে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা টায়ার জ্বালিয়ে ও স্থানীয় বিভিন্ন নেতার ব্যানার ফেস্টুন ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি কামরুল আলম মোল্লাসহ পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। শ্রমিক-বিক্ষোভ সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ পুল, শিমরাইল মোড়, কাঁচপুরসহ কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। বিক্ষোভে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের অংশগ্রহণের কারণে অসহায় হয়ে পড়ে পুলিশ। মহাসড়ক থাকে শ্রমিকদের দখলে। দুপুর পৌনে দুটোয় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা শিমরাইল মোড়ে পুলিশ বক্সে হামলা চালায়। অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয় পুলিশ বক্স। পুলিশের একটি পিকাপ ভ্যান ও পাঁচটি মোটরসাইকেলেও আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় পুলিশ জনরোষের ভয়ে পালিয়ে নিরাপদে আশ্রয় নেয়। দুপুর ২টার পর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইন, শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরাতে গেলে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশের ওপর শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ এবং পরে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ভাংচুর করে অর্ধশতাধিক যানবাহন। সংঘর্ষে আট পুলিশসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুজ্জামান, কনস্টেবল নূরে আলম, ইসলাম, আরিফ, ট্রাফিক কনস্টেবল শামসুল আলমকে হাসপাতাল ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। দফায় দফায় চলা সংঘর্ষে সিদ্ধিরগঞ্জ আদমজী, কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মার্কেট দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। আটকা পড়ে অনেক মানুষ। সাংবাদিকদের ওপরও তীব্র ক্ষোভ ছিল শ্রমিকদের। বেসরকারী টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান রবিউল, জয়সহ কয়েকজনকে মারধর করা হয়। বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিকও অংশ নেয় বিক্ষোভে। আধাঘণ্টা সংঘর্ষের পর দুপুর আড়াইটায় শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হলে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পুনরায় যান চলাচল শুরু হয়।
জেলা পুলিশ সুপার শেখ নাজমুল আলম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হয়েছে। ছিনতাইকারী ও দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুজব রটিয়ে কেউ এ ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।