বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার কাজে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, সবার কাছে দোয়া চাই যেন মানুষের জন্য কিছু করে যেতে পারি। পিতা-মাতার শিক্ষায় এ দেশের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে পারি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি।
বুধবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮২তম জš§বার্ষিকী উপলক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাতীয় মহিলা সংস্থা আয়োজিত আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ভোট দিয়ে দেশ সেবার সুযোগ দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ভোট দিয়ে দেশের জনগণ আমাকে তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন, তা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।
প্রিয় মাতা শহীদ শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ও কর্মের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা আবেগজড়িত কন্ঠে বলেন, তাঁর (বেগম মুজিব) ভেতরে যে দেশপ্রেম, সততা ও মানুষের জন্য দরদ ছিল তা অতুলনীয়। তিনি সব সময় মানুষের কল্যাণের চিন্তাই করেছেন। তাঁর সাহস ও চারিত্র্যিক দৃঢ়তাও ছিল অবর্ণনীয়। তিনি বলেন, আমি আমার জীবনে যতটুকু ত্যাগ-তিতিক্ষা শিখেছি, তা মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছ থেকেই শিখেছি। দেশপ্রেমের শিক্ষাও মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি।
তিনি বলেন, আমরা যে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশে সক্ষম হয়েছি, এর পেছনেও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছেন। কিন্তু তাঁর পেছনে সাহস, প্রেরণা ও শক্তি যুগিয়েছেন এই মহীয়সী নারী। বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনের পেছনেও তাঁর অবদান রয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আরও বক্তব্য রাখেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি এমপি এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মমতাজ বেগম। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনীভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিই ছিল মানুষের জন্য। মানুষের কথা এবং তাদের মুক্তির কথা চিন্তা করে রাজনীতি করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু জীবনের অধিকাংশ সময় জেল খেটেছেন। আর বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম ও দল পরিচালনা করেছেন। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নের ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন অবিচল।
প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরও বলেন, মানুষের অনেক আকাক্সক্ষা ও চাহিদা থাকে। কিন্তু আমার মাকে কখনই ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা ও চাহিদার কথা বলতে শুনিনি। সব সময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে প্রতিটি সংগ্রামে তাঁর পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। নেপথ্যে থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচীকেও এগিয়ে নিয়েছেন। বাবা বার বার মন্ত্রী হলেও তাঁর মা কখনই নিজেকে বদলাননি। সব সময় সাদাসিধে জীবন যাপন করেছেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ঐতিহাসিক ছয়দফা আন্দোলনে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগের দুর্ভাগ্যই এটা যে এ দলের অনেক উচ্চপর্যায়ের নেতারাও অনেক সময় ভুল করেন। ছয়দফা আন্দোলনের সময়ও অনেক বড় নেতা এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আট দফার পক্ষে কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে ছয়দফা আন্দোলন থেকে সরিয়ে আনতে চেয়েছেন। কিন্তু ওই সময়ও ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বঙ্গবন্ধুর ছয়দফার পক্ষে অবিচল থেকেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু বন্দী থাকা অবস্থায়ও দলের অনেক নেতা তাঁর প্যারোলে মুক্তির কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি (ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) বলে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু যেন কোন অবস্থায়ই প্যারোলে না যান। তিনি বলতেন, বঙ্গবন্ধু মাথা উঁচু করেই ফিরে আসবেন। পরে সেটাই হয়েছিল।
তিনি বলেন, বাবা জেলে থাকা অবস্থায় সংসার চালাতে হিমশিম খেলেও তাঁর মা ঘরের আসবাবপত্র ও গহনা বিক্রি করে দল পরিচালনা এবং কারাবন্দী অন্য নেতাদের পরিবারকে সাহায্য করেছেন। অসুস্থ দলীয় কর্মীদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন। নিজের ঘরে খাবার না থাকলেও সেটা তাঁর চিন্তাও ছিল না। নিজের সন্তানদেরও এ ত্যাগের মানসিকতায় মানুষ করেছেন।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার কথা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। এক রাতে বাবা-মাসহ সব হারানোর বেদনায় কাতর শেখ হাসিনা বলেন, সেদিন কেবল বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতাকেই নয়, তাঁদের গোটা পরিবারকেই হত্যা করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশ আবারও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে উঠতে না পারে। একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই তারা সেদিন এ নৃশংস হত্যাকা- ঘটিয়েছে।