মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ৩ আগষ্ট ২০১২, ১৯ শ্রাবণ ১৪১৯
এখন গ্রামেও বড় অঙ্কের অর্থের হাতবদল হচ্ছে, নেপথ্যে প্রবাসী অর্থ
জুলাইয়ে রেমিটেন্স এসেছে ১২০ কোটি ডলার, আমানতের ৩৫ শতাংশই গ্রামে পৌঁছেছে ব্যাংক ব্যবস্থায়
শাহ্ আলম খান ॥ ঈদ সামনে রেখে বড় অঙ্কের টাকার অতিমাত্রায় হাতবদল শুরু হয়েছে মফস্বলেও। বিশেষ করে গ্রামীণ নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পরিবারে প্রবাসীদের সুবাদে ভোগ-বিলাসিতা একটু বেশিই বেড়েছে। দেনা-পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের সবার জন্য পছন্দের কেনাকাটাও চলছে খোশমেজাজে। আবার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে এবং মৃতদের স্মরণে খরচাপাতির প্রবণতাও অধিকহারে বেড়েছে। আর এর সবকিছুর পেছনেই রয়েছে অর্থনৈতিক লেনদেন। যার পুরোটাই যোগান দিচ্ছেন বিদেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট সূত্র মতে, গত জুলাই মাসে সারাদেশে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স এসেছে মোট ১২০ কোটি ডলার। আর এ পরিমাণ রেমিটেন্সের সিংহভাগই সংগ্রহ করছে ঢাকার বাইরের ব্যাংকগুলো। তবে এটি শুধু বৈধ চ্যানেলে আসা রেমিটেন্সের হিসাব। সারাদেশে অবৈধ চ্যানেলে হুন্ডির মাধ্যমে আসা রেমিটেন্সের পরিমাণ হবে আরও বেশি। ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট আশা করছে, চলতি আগস্টে দেশে আরও বেশি রেমিটেন্স আসবে।
উল্লেখ্য, এটি এ পর্যন্ত আসা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স। সর্বোচ্চ ১২২ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছিল গত জানুয়ারিতে। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ১০৭ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। আর গত অর্থবছরজুড়ে রেকর্ড প্রায় তেরো বিলিয়ন (১২.৮৫ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স এসেছে। অন্যদিকে গত তিন বছরে রেমিটেন্স বেড়েছে সাড়ে চারগুণেরও বেশি। এদিকে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান জানান, বেনিফিশিয়ারিদের কাছে রেমিটেন্স প্রেরণ যাতে ঝামেলা ও হয়রানিমুক্তভাবে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স আহরণের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই), পোস্ট অফিস ও মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোকে রেমিটেন্স বিতরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী রেমিটেন্স আহরণে গতিশীলতা বজায় রাখতে ড্রইং ব্যবস্থা স্থাপনের অনুমোদন পদ্ধতিও সহজ করা হয়েছে। বিদেশে স্থানীয় ব্যাংকের এক্সচেঞ্জ হাউস খোলার ব্যাপকভিত্তিক অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে বিদেশস্থ এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে স্থানীয় ব্যাংকগুলোর ৮৯২টি ড্রইং এ্যারেঞ্জমেন্ট কার্যকর রয়েছে। স্থানীয় ২২টি ব্যাংককে বিদেশে ৫০টির বেশি এক্সচেঞ্জ হাউস খোলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ২৪টি এক্সচেঞ্জ হাউস ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কারণে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে দেশে রেমিটেন্স আসার হার আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়েছে। যে কারণে বড় অঙ্কের টাকার অতিমাত্রায় হাতবদল ও আর্থিক সঞ্চয় প্রবৃদ্ধি এখন শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। আর্থিক খাতের দ্রুত প্রসার ও পরিবর্তন এবং বহুমুখী কর্মসংস্থানের কারণে এ প্রবণতা এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতেও স্থায়ী ঠাঁই করে নিয়েছে। এ কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঞ্চয় প্রবণতাও অধিক হারে বেড়েছে, যা দেশের সার্বিক উৎপাদন কর্মকা-, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে বলা হয়েছে, দেশে সার্বিক ব্যাংক ব্যবস্থার সংগৃহীত মোট আমানতের প্রায় ৩৫ শতাংশেরই যোগান আসছে ঢাকার বাইরের ব্যাংক শাখাগুলো থেকে। যার অধিকাংশই হচ্ছে মফস্বল পর্যায়ের। তবে ওই প্রতিবেদনে এলাকাভিত্তিক অধিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সঞ্চয় সম্পর্কে বলা হয়েছে- এ পরিমাণ আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে এর দুই-তৃতীয়াংশই চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের ব্যাংক শাখাগুলো সংগ্রহ করছে। অন্যদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে মোট ঋণেরও এক-তৃতীয়াংশ সংগ্রহ করছে বাইরের শাখাগুলো। যার মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের শাখাগুলোর অবদান প্রায় ৬৬ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল এখন মূলধন যোগানের শহর বলেও বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশনের উর্ধতন এক কর্মকর্তা জানান, শহুরে অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন গ্রামীণ অর্থনীতিও অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রবাসীদের ব্যাপকভিত্তিক রেমিটেন্স প্রেরণ। যার অধিকাংশই এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে। তিনি বলেন, এ কারণে ঢাকার বাইরের ব্যাংক শাখাগুলো এখন আমানত সংগ্রহের আকর্ষণীয় স্থান বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকেরও অনেকটা কৃতিত্ব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচীর আওতায় এনে ব্যাংকিং সেবা প্রদান ও তা সহজলভ্য করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কারণেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, দেশের সব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হলেও ব্যাংক ব্যবস্থাসহ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বড় একটি অংশ রাজধানীর বাইরে গ্রামীণ অর্থনীতির অবদান। তাঁর মতে, দেশের সব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। সরকারী-বেসরকারী সকল পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তও দেয়া হয় ঢাকা থেকে। তবে অনেকেরই অজানা দেশের আর্থিক খাতে গতিশীলতা ধরে রাখার সিংহভাগ কৃতিত্বই হচ্ছে গ্রামপর্যায়ের মানুষের ও তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের।