এনা, নিউইয়র্ক থেকে ॥ কুসুম ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, এক্ষুনি আমাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে চলো-এমন ভীতির মধ্যে ছিলেন জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ (৬৪)। মৃত্যুভীতি জয় করতে যে মানুষটি ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারের পরও সাংঘাতিকভাবে আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন, সেই মানুষটি সপ্তাহের ব্যবধানেই মৃত্যুভয়ে তাড়িত হতেন। এ জন্য শেষ নিশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত সপ্তাহ দুয়েক লেখক হুমায়ূন আহমেদকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয়েছিল। তবুও শেষ রক্ষা হলো না। মৃত্যু নামক অপরাজেয় দানবকে পারলেন না পরাস্ত করতে এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টায় প্রবাস এবং দেশের অগণিত পাঠক, ভক্ত, সুহৃদকে শোক সাগরে ভাসিয়ে হুমায়ূন চলে গেলেন। মুহূর্তে এ সংবাদ আটলান্টিকের উভয় পাড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শোকে আচ্ছন্ন হন আমেরিকার প্রবাসীরা। মিডিয়ার লোকজনের কাছে জানতে চান লেখকের সর্বশেষ অবস্থা। কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সংবাদটি। কারণ, কদিন থেকেই লেখকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছিল। লেখকের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ছোট ভাই ড. জাফর ইকবালসহ কয়েকজন এ সময় হাসপাতালে ছিলেন। লেখকের দুই সন্তান নিনিত ও নিষাদকে কোলে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন শাশুড়ি সংসদ সদস্যা তোহরা আলীসহ ঘনিষ্ঠজনরা।
বৃহদান্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সপরিবারে নিউইয়র্কে এসেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রথমে বিশ্ববিখ্যাত সেøায়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে বেলভ্যু হাসপাতালে তাকে কেমোথেরাপি দেয়া হয়। ১২ থেরাপির পর চিকিৎসকরা তাঁর অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। তা সফলও হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর ১৯ জুন তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। ইনফেকশন হয়েছিল অস্ত্রোপচারের এলাকায়। এটি ঘাবড়িয়ে দেয় চিকিৎসকদের। দ্বিতীয় পর্যায়ের অস্ত্রোপচারের পর লেখকের দৈহিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। কষ্ট হয় শ্বাস নিতে। কৃত্রিম ব্যবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখার চেষ্টা করা হয়। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একেএ মোমেন বার্তা সংস্থা এনাকে বলেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যত রকমের প্রক্রিয়া রয়েছে তার মধ্যে যেটি সর্বোত্তম তাও করা হয়। উল্লেখ্য, চিকিৎসারত অবস্থায়ই হুমায়ূন আহমেদকে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছিল। তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রবাসের লেখক-সাংবাদিক-সাহিত্যিক-পেশাজীবী নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ। বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একেএ মোমেন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের, উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষার সর্বাধিক প্রচারিত ঠিকানা’র প্রেসিডেন্ট ও লেখক সাঈদ-উর রব, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবাসী শিক্ষাবিদ ড. মনসুর খান, বার্তা সংস্থা এনার সম্পাদক লাবলু আনসার, মুক্তিযোদ্ধা লেখক হারুন চৌধুরী, খবর ডটকমের সম্পাদক শিব্বির আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি সাজ্জাদুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ও নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরনবী, সিনিয়র সহসভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী, সেক্রেটারি ইমদাদুল ইসলাম ইমদাদ, ব্রুকলীন আওয়ামী লীগের নেতা নূরল আমিন, তারেক পরিষদ আন্তর্জাতিক কমিটির চেয়ারম্যান আকতার হোসেন বাদল, যুগ্ম মহাসচিব জসীমউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম রফিকুল ইসলাম ডালিম, মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্ববিজৎ সাহা, প্রবাসের লেখক আবুল কাশেম, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ড. খন্দকার মনসুর, ড. মহসিন আলী, আওয়ামী লীগ নেতা তৈয়বুর রহমান টনি, খোরশেদ খন্দকার প্রমুখ। শোক প্রকাশকারীরা উল্লেখ করেছেন, হুমায়ূনের মৃত্যুতে বাঙালী জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হলো।
নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় প্রথম জানাজা ॥ শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় মুসলিম সেন্টারে বাদ জুমা মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে বিডিএনএন২৪ প্রতিনিধি তৈয়বুর রহমান টনিকে জানিয়েছেন মরহুমের ছোটভাই দেশের বিশিষ্ট লেখক শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল।
জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের ছোটভাই দেশের বিশিষ্ট লেখক শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল জানান, শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় মুসলিম সেন্টারে বাদ জুমা মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে এবং জানাজা শেষে সন্ধ্যায় মরহুম হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ নিয়ে দেশের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করবেন।
আব্দুল মোমেনের শোক ॥ জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. একে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা লেখক-চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, এমন বরেণ্য লেখকের অভাব সহজে আর পূরণ হওয়ার নয়। হুমায়ূন আহমেদ তার সাহিত্য কর্মে যুব-পাঠকদের মনযোগ আকর্ষণ করতে পেরে একটি পাঠক শ্রেণী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, যে কথা আজ সকলের মুখে ঘুরে-ফিরে আসছে।
রাষ্ট্রদূতের শোক ॥ হুমায়ূন আহমদের অকাল মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের গভীরভাবে মর্মাহত এবং শোকাহত। রাষ্ট্রদূত তাঁর শোকবার্তায় বলেন, দেশ তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে এক বরেণ্য সন্তানকে হারাল যা দেশের অপূরণীয় ক্ষতি। রাষ্ট্রদূত কাদের তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং পরম করুণাময়ের কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের শোক ॥ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ এক জরুরী শোক বার্তায় নন্দিত কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছে। দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন যাবত নিউইয়র্কের সেøায়ান ক্যাটরিং ও বেলভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাঙালী জাতি তাঁকে হারিয়ে আজ শোকাভিভূত।
ওয়াশিংটনে শোকের ছায়া ॥ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ইন্তেকালে ওয়াশিংটনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওয়াশিংটন প্রবাসের সর্বত্রই আলোচিত হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে। সবাই বলছেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এই চলে যাওয়ায় বাংলা সাহিত্যেও অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল।
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ইন্তেকালে শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের, দূতাবাসের ডেপুটি মিশন চীফ জসীম উদ্দিন, লেখক সাংবাদিক হারুন চৌধুরী, খবর ডট কম সম্পাদক শিব্বির আহমেদ, ভয়েস অব আমেরিকার রোকেয়া হায়দার, সরকার কবির উদ্দীন, আনিস আহমেদ, দিলারা হাশেম, ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ফ্যামেলির আবু রুমি, আক্তার হোসাইন, একতারা’র শেখ মাওলা মিলন, আরিফুর রহমান স্বপন, সুরবিতানের কামরুল ইসলাম কামাল, বুলবুল আক্তার, বিসিসিডিআই সভাপতি মিজানুর রহমান ভুঁইয়া, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা ড. খন্দকার মনসুর, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীম চৌধুরী, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের কনভেনার সাদেক এম খান, মেট্রো ওয়াশিংটন আওয়ামী লীগ সভাপতি ড. শাহজাহান মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক এম নবী বাকী, ভার্জিনিয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি রফিক পারভেজ, সাধারণ সম্পাদক জিআই রাসেল, ট্রেজারার জাকির হোসাইন, মেরিল্যান্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল ইসলাম তাপস প্রমুখ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্ক ত্যাগ ॥ শুক্রবার বাদ জুমা নিউইয়র্কেও জ্যামাইকায় মুসলিম সেন্টারে জানাজা শেষে জনপ্রিয় লেখক কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ দেশের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করবে বলে জানিয়েছেন মরহুমের ছোটভাই দেশের বিশিষ্ট লেখক শিক্ষাবিদ ড. জাফর ইকবাল।
উল্লেখ্য, দুরারোগ্য কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিউইয়র্কের বেলভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বেলা দেড়টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে নিউইয়র্ক ওয়াশিংটনসহ পুরো উত্তর আমেরিকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ড. জাফর ইকবাল তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের রুহের মাগফেরাত কামনায় সবার নিকট দোয়া চেয়েছেন।