বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১২, ৪ শ্রাবণ ১৪১৯ 
প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে বলেন
পিলখানা হত্যাযজ্ঞ মামলায় সাবেক বিমানবাহিনী প্রধানের সাক্ষ্য
স্টাফ রিপোর্টার ॥ সাবেক বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার মার্শাল শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেছেন, বিডিআর বিদ্রোহ দমনে ‘প্রধানমন্ত্রী, তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টাসহ আমরা মিটিংয়ে বসি। প্রধানমন্ত্রী আমাদের যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে বলেন। আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি, ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে বিমানবাহিনী কাজ করতে প্রস্তুত আছে। পিলখানা হত্যা মামলায় বুধবার সাক্ষ্য দিতে এসে অস্থায়ী বিশেষ আদালতে তিনি এ কথা বলেন। পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে পিলখানা হত্যা মামলার বিচার চলছে।
এ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের সময় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে ছড়ানো লিফলেটে কী লেখা ছিল তা তিনি জানেন না। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের দায়িত্ব¡ ছিল লিফলেট প্রচারের। তবে লিফলেটে বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের জন্য বলার কথা।
এ্যাডভোকেট শামীম সরদারের এক প্রশ্নের জবাবে জিয়াউর রহমান আরও জানান, তাঁর বাহিনীতে নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা থাকলেও বিদ্রোহের আগাম খবর তিনি জানতে পারেননি। সিলেট থেকে প্যারাকমান্ডো ঢাকায় নিয়ে আসা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান বলেন, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যই প্যারাকমান্ডো আনা হয়।
বুধবার সকাল নয়টা ৪০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরুর হওয়ার পর সাক্ষ্য দেন শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান। শাহ মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) তারিক আহমেদ সিদ্দিক তাঁকে ফোন করে বলেন, বিডিআরে কিছু সমস্যা হয়েছে। তারেক জানতে চান, হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে কি না। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুটি হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করে। পাইলটরা গাছের ফাঁকে অসংখ্য বিডিআর সদস্যকে দেখা যাচ্ছে বলে খবর দেন।
১৩৪৫ সাক্ষীর মধ্যে মামলার বাদী লালবাগ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবজ্যোতি খীসাসহ বিডিআর মামলায় এ পর্যন্ত ৩০০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। গত বছরের ১২ জুলাই হত্যা মামলায় ও ২৭ জুলাই বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ।
হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৮৫৬। আসামিদের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন এবং ২০ জন পলাতক, চারজন জামিনে আছেন। মামলাটি তদন্তের সময়ই মারা যান বিডিআরের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) রহিম ও হাবিলদার শফিকুল ইসলাম এবং অভিযোগ শুনানিকালে গত ১৫ মে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান আসামি হাবিলদার মতিউর রহমান।
এর আগে নৌবাহিনীপ্রধান ভাইস এ্যাডমিরাল জহির আহম্মেদ। তিনি আদালতকে বলেছিলেন, বিডিআর বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী জওয়ানদের সঙ্গে সমঝোতা অথবা পিলখানা বিডিআর সদর দফতরে অভিযান চালানোর জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে রাজধানীর পিলখানা বিডিআর সদর দফতরে ইতিহাসের জঘন্যতম সেই বিডিআর বিদ্রোহের সূচনা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের সভাপতিত্বে পিলখানা বিডিআর দরবার হলে বার্ষিক দরবার শুরু হয়। এরই মধ্যে দরবার হলে উপস্থিত জওয়ানরা জাগো বলে হুঙ্কার দিয়ে দরবার হল ত্যাগ করে। এরপর বিদ্রোহীরা অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর রেজাউল করিমকেও টেনে-হিঁচড়ে বের করে তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে অস্ত্রাগার লুট করে। বিদ্রোহী সিপাহী মাঈন লুণ্ঠিত অস্ত্র নিয়ে দরবার হলে প্রবেশ করে মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের দিকে অস্ত্র তাক করে। এ সময় উপস্থিত অন্য চৌকস সেনা কর্মকর্তারা মাঈনকে নিরস্ত্র করে ফেলেন। এরপরই দৃশ্যপট পাল্টে যায়। শত শত বিদ্রোহী অস্ত্রাগার লুট করে অস্ত্র হাতে দরবার হলে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। গুলিতে পুরো দরবার হল ঝাঁঝরা হয়ে যায়। বিদ্রোহীরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর চালাতে থাকে অমানুষিক নির্যাতন। একে একে বাসা থেকে ধরে এনে হত্যা করতে থাকে সেনা কর্মকর্তাদের। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারিও একইভাবে চলে হত্যাকা-। টানা ২ দিনে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিদ্রোহীরা।
|