শুক্রবার, ২৯ জুন ২০১২, ১৫ আষাঢ় ১৪১৯ 
পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হচ্ছে না যে কারণে-
মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে নিহতের ঘটনায় পুলিশী আইন ও পরিবেশ আইনের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকায় পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। তবে সিএমপির খুলশী ও বায়েজিদ থানাসহ বান্দরবানের লামা ও কক্সবাজারের মহেশখালী থানায় প্রায় অর্ধশত অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়েছে। কিন্তু পাহাড় কর্তনের মাধ্যমে যারা পাহাড়ের পাদদেশে ভাড়া বাণিজ্য ও ভূমি বাণিজ্য চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। এদিকে, পরিবেশ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে কোন ধরনের মামলা দায়ের না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। অপরদিকে, খুলশী থানাধীন আকবর শাহ মাজার এলাকায় ধসে যাওয়া পাহাড়ের পাদদেশ থেকে এসব পরিবারকে সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযানে বাধা দেয়ায় একজনকে বৃহস্পতিবার গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সকালেই উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দেয়া হয়।
জানা গেছে, আকবর শাহস্থ রেলের মালিকানাধীনে থাকা পাহাড়ের মাটি কেটে ভূমি বাণিজ্য ও ভাড়া বাণিজ্য চালিয়েছে ৫ ভূমিদস্যু। এদের মধ্যে রয়েছে ইয়াসিন, ড্রাইভার হারুন, ফেরদৌসী। পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণ ও ভাড়া দেয়ার কারণেই অতি বৃষ্টিতে ধসে পড়ে পাহাড়ের কয়েকটি অংশ। বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার অভিযান শেষে সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা লোকজনকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা মধ্যে স্বউদ্যোগে সরে না গেলে তাদের উচ্ছেদ করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। এ সময় ইয়াসিনের লোকজন একপর্যায়ে মারধর ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে খুলশী থানা পুলিশ ইয়াসিনের বাবা ইদ্রিস আলীকে গ্রেফতার করে। এ ঘটনায় সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে বিকেল ৩টায় মাহবুব আলী নামের এক কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। সরকারী কাজে বাধা প্রদান ও মারধরের অভিযোগ এনে এ মামলায় আসামি করা হয় অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে।
অভিযোগ উঠেছে, পাহাড় ধসের পেছনে মূল কারণ হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে মাটি কেটে ভূমি দখলের অপচেষ্টা। ভূমিদস্যুরা রাজনৈতিক ও পেশী শক্তি ব্যবহার করে সরকারী পাহাড় দখলে নিয়ে যুগ যুগ ধরে ভাড়া বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। এসব পাহাড় কাটার পেছনে যে সিন্ডিকেট রয়েছে এরমধ্যে পুলিশেরও সম্পৃক্ততা থাকায় ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা বিচার দাবি করতে পারছে না থানা পুলিশের কাছে। পুলিশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখিয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ধসের ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে।
পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ জানা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও এ দুর্যোগ পরিকল্পিত। পুলিশ ব্যাপক হারে নিহতের ঘটনায় ভূমিদস্যুদের সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে মামলা দায়েরের যুক্তি রয়েছে। তবুও পুলিশের কারণেই রেহাই পাচ্ছে এসব অসাধুরা। পাহাড় কর্তন ও পাহাড়ের পাদদেশ ছাঁটাই করার পেছনে রয়েছে ভূমিদস্যুতা। তদন্ত সাপেক্ষে এসব পাহাড় কর্তনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল ও সহযোগী হিসেবে ব্যবহার হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইন ২০১০-এর বিধান অনুযায়ী মামলা দায়ের হবে। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জাফর আলম জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও ভূমিদস্যুদের পরিকল্পিত। এ ঘটনায় পুলিশ আইনে হত্যা মামলা হওয়া উচিত। অপমৃত্যু মামলা হওয়ার কোন সুযোগ নেই। যেহেতু পুলিশ জানে কারা এ ঘটনার মূল হোতা সেহেতু তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অপরদিকে, খুলশী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই অপমৃত্যু মামলা দায়ের হচ্ছে। আকবর শাহর ঘটনায় ৪টি ও বিশ্ব কলোনির ঘটনায় দুটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। এদিকে, বায়েজিদ থানায়ও দুটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। এছাড়া লামা, উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও মহেশখালীসহ বিভিন্ন থানায় পাহাড় ধসের ঘটনায় আরও প্রায় ৪০টি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। এ ব্যাপারে ডিসি সদর বনজ কুমার মজুমদার জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতর পাহাড় কর্তনকারী ও ভূমি ভাড়া দেয়াদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারে। হত্যা মামলা হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
সিএমপির উর্ধতন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যদিও পাহাড় ধস প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু এ ধরনের ধস পরিকল্পিত কর্মকা-েরই ফল। ৩০৪ (খ) ধারায় অবহেলাজনিত কারণেই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশনা রয়েছে পুলিশী বিধানে। কারণ ভূমিদস্যুরাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পাহাড় কেটে ও ভাড়া দিয়ে এ সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
|