মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৯ জুন ২০১২, ১৫ আষাঢ় ১৪১৯
বিপর্যয়ের মুখে পোল্ট্রি শিল্প ॥ দেড় লাখ খামারের অর্ধেক বন্ধ
প্রান্তিক খামারি পর্যায়ে স্বল্প সুদে ঋণ ও পোল্ট্রি বীমা চালু জরুরী
এম শাহজাহান ॥ কঠিন চ্যালেঞ্জ ও বিপর্যয়ের মুখে দেশের পোল্ট্রি শিল্প। গত এক বছরে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম ৪৫-৫০ শতাংশ বাড়লেও এ শিল্পের কোন অগ্রগতি নেই। বরং ডিম ও মুরগির দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে। এ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, পোল্ট্রি শিল্প বাঁচাতে হলে ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে দেশের বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ প্যারেন্টস্টক ফার্ম ও হ্যাচারি, ব্রয়লার ও লেয়ার ফার্ম, এবং ফিডমিল স্থাপন করা উচিত। সেই সঙ্গে পোল্ট্রি নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নসহ প্রান্তিক খামারি পর্যায়ে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান ও পোল্ট্রি বীমা চালু করা জরুরী হয়ে পড়ছে। এছাড়া পোল্ট্রি শিল্পকে থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।
সূত্র মতে, এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ও বার্ড-ফ্লুর আক্রমণে দেশের ৫০ ভাগের অধিক লেয়ার ফার্ম, ৭০ ভাগ ব্রিডার ফার্ম এবং ৪৫ ভাগ ব্রয়লার ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি দাবি করেছে, এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ও বার্ড-ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগব্যাধির আক্রমণ ও সরকারী নীতিগত সহায়তার অভাবে এ শিল্পটি আজ একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ইতোমধ্যে দেশের প্রায় দেড় লাখ পোল্ট্রি খামারের অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। কেউ কেউ এখান থেকে পুঁজি প্রত্যাহার করে অন্য ব্যবসায় চলে যাচ্ছেন। আসছে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। আর এ সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে ডিম ও মুরগির বাজারে। এক সময়ের সহজলভ্য এ প্রোটিনের সস্তা উৎস ক্রমেই সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। গত এক বছরে ডিম ও মুরগির দাম বেড়েছে ৪৫-৫০ শতাংশ। সংগঠনটি আশঙ্কা করে বলছে, এ দাম কমবে বলে মনে হয় না। বরং বর্তমান দুরবস্থা চলতে থাকলে ডিম ও মুরগির দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ডিম ও মুরগির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে পোল্ট্রি খাদ্যের উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়। এর পাশাপাশি একদিন বয়সের লেয়ার ও ব্রয়লার বাচ্চার দাম বাড়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, পোল্ট্রি খামার ও পোল্ট্রি খাদ্য শুরু থেকে আয়কর মুক্ত ছিল। কিন্তু নতুন বাজেটে শুধু পোল্ট্রি খামারকে আয়কর রেয়াতের আওতায় আনা হয়েছে। পোল্ট্রি খাদ্যকে ৫ শতাংশ আয়কর ও দশমিক ৫ শতাংশ টার্নওভার উভয় করের আওতায় আনা হয়েছে। পোল্ট্রি শিল্প রক্ষায় এই উভয় করই প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে ২০ হাজার কোটি টাকার এ শিল্পটি অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি পালনের জন্য ৭০ শতাংশ পোল্ট্রি খাদ্য খাতে খরচ হয়। পোল্ট্রি খাদ্যের জন্য আয়কর ও টার্নওভার কর অব্যাহতি সুবিধা না থাকায় কাঁচামাল আমদানিতে আয়কর ও খাদ্য সরবরাহে টার্নওভার কর প্রদান করতে হয় বিধায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে দেশে ডিম ও মুরগির মাংসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ মুরগি ও ডিম ক্রয়ের সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত এবং প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
এছাড়া পোল্ট্রি শিল্পের দুরবস্থার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস। সম্প্রতি তিনি এক সভায় বলেছেন, ‘আমার মন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার জন্যই পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে এ ধ্বংসের সূচনা হয়েছিল গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। পোল্ট্রি শিল্পের দেখভাল নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অনেক অবহেলা সহ্য করেছি। আর নয়। সরকারের মেয়াদের বাকি সময়ে এই শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই করা হবে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর নানা অব্যবস্থাপনা ও কিছু পোল্ট্রি খামারির জন্য এ শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ শিল্প রক্ষা করার জন্য কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হয়েছে। তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশের পোল্ট্রি শিল্প ভোক্তার চাহিদা মেটাতে পারছে না বলেই পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমরা মুরগির ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছি। তবে রমজানের পর আর ডিম আমদানি করা হবে না বলেও খামার মালিকদের নিশ্চিত করেন তিনি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে টানাপোড়েনের কারণে পোল্ট্র্রি শিল্পে চাহিদা অনুযায়ী আমরা ভর্তুকি দিতে পারছি না।’
অন্য একটি সূত্র দাবি করেছে, বর্তমান বাজার মূল্যে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। যা বাজারে খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকা। আবার কোথাও কোথাও এর চেয়ে বেশিও নিচ্ছে। এক কেজি ব্রয়লার মাংসের গড় উৎপাদন খরচ ১৩৩ টাকা ১১ পয়সা। কিন্তু খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা।
এদিকে বাংলাদেশে বছরে ১ হাজার ৪৬৪ কোটি পিস ডিমের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫৭৪ কোটি পিস। দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ১ কোটি ৫০ লাখ পিস ডিম উৎপাদন হচ্ছে। যা আগে ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ। বার্ড ফ্লু আতংকে অনেক ছোট খামারই লেয়ার মুরগির ডিম উৎপাদন না করে বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। বিশেষ করে সাধারণ রোগে আক্রান্ত লেয়ার মুরগির ডিম তারা উৎপাদনই করছে না। এতে দৈনিক মোট ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। এ শিল্পের বাজার স্থিতিশীল করতে তিন শর্তে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অবাধে ১ দিনের মুরগির বাচ্চা ডিম আমদানির সুযোগ দিয়েছে সরকার। এতে বলা হয়েছে-আমদানি নীতি আদেশ ২০০৯-২০১২ অনুসরণ করে তিন শর্তের ভিত্তিতে ১ দিনের বাচ্চা ও ডিম অবাধে আমদানি করা যাবে। শর্তগুলো হচ্ছেÑ আমদানিতব্য বাচ্চা সংক্রামক ব্যাধিমুক্ত এ মর্মে রফতানিকারক দেশের প্রাণিসম্পদ বিভাগের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সনদপত্র থাকতে হবে। রফতানিকারক দেশ এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা মুক্ত এ মর্মে ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অব এ্যানিমেল হেলথের সার্টিফিকেট দাখিল। এছাড়া আমদানিকারককে অবশ্যই ঋণপত্র খোলার সময় তার হ্যাচারি বা ব্রিডার ফার্ম রয়েছে এ মর্মে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক প্রত্যায়নপত্র ব্যাংকে প্রদর্শন করতে হবে। প্রসঙ্গত পোল্ট্রি শিল্প বার্ড ফ্লু ও এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা মুক্ত রাখতে ইতোপূর্বে সরকার মুরগির বাচ্চা ও ডিম আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এর ফলে দেশে ব্রয়লার মুরগিসহ ডিমের দাম বেড়ে যায়। এছাড়া সরকার নির্ধারিত দামের পরিবর্তে ১ দিনের বাচ্চা মুরগি বর্তমান তিনগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে ৭৫-৮০ টাকার নিচে কোন বাচ্চা মুরগি পাওয়া যাচ্ছে না। দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় নতুন সঙ্কটে পড়ে পোল্ট্রি শিল্প। বাচ্চার অভাবে ইতোমধ্যে অনেক খামার বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে মুরগি ও ডিমের দাম। এ অবস্থায় মুরগির বাজার স্থিতিশীল করতে সরকার ফের ডিম ও মুরগির বাচ্চা আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এদিকে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ২০০৯ সালের জুনে দেশে মুরগির খামারের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৬৩টি। গত ২০১০ সালে কমে দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৩২২টিতে। আর ২০১১ সালের ২০ মার্চ পর্যন্ত টিকে থাকা খামারের সংখ্যা ছিল ৭২ হাজার ১৬৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে খামারের সংখ্যা ৬৫ হাজারে নেমে আসে। তবে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ এ্যাসোসিয়েশন সরকারী এ হিসাবকে সঠিক নয় দাবি করে বলেছে, বন্ধ খামারের সংখ্যা অনেক। বর্তমান ৫৫ হাজারেরও কম খামার নিয়মিত উৎপাদনে আছে। এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির মহাসচিব ড. এমএম খান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। অথচ এ শিল্প খাত ধ্বংস হলে শুধু আমিষের অভাব দেখা দেবে না, অর্থনীতির একটি বড় খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশী মুরগির পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে ৬০ লাখ পিস ব্রয়লার, ১০ লাখ লেয়ার এবং ১০ লাখ পিস কক মুরগির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেখানে ব্রয়লার ৩৫-৪০ লাখ, লেয়ার ও কক মিলে সর্বোচ্চ ৫ লাখ পিস মুরগি উৎপাদন হচ্ছে।
অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে মুরগির ঘাটতি হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ পিস। ফলে স্বাভাবিক কারণেই মুরগির দাম বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পোল্ট্রি শিল্পে বিনিয়োগকৃত ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পোল্ট্রি শিল্প রক্ষায় আগামী বাজেটে বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণাসহ একটি নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন বলে উদ্যোক্তারা মনে করছে।
ডিমের উৎপাদন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বজায় রাখার জন্য কিছু সুপারিশ করেছে মুরগি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। তাদের সুপারিশের মধ্যে রয়েছেÑ পোলট্রি শিল্পে কৃষি সেক্টরের মতো প্রান্তিক খামারিদের সরাসরি ভুর্তকি দেয়া, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা, অতি দ্রুত গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা আমদানির পরিবেশ সৃষ্টি করা।