মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২৪ জুন ২০১২, ১০ আষাঢ় ১৪১৯
দুর্ঘটনায় পুলিশ মরলে খুনের ধারায় মামলা হয়, সাধারণের জন্য অন্য ধারায়!
আজাদ সুলায়মান ॥ বরেণ্য সাংবাদিক মিশুক মুনীর ও চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। থানায় মামলা হয় দ-বিধির ৩০৪/বি ও ২৭৯ ধারায়। যেটা জামিনযোগ্য। যার সাজা সর্বোচ্চ তিন বছর, সর্বনিম্ন দ্ইু বছর। ঘাতক বাসটির চালক পালাতে পারেনি বলে ধরা পড়ে। কিন্তু তাকে তিন মাসের বেশি জেলে আটকে রাখা যায়নি। দেশের গোটা সাংবাদিক সমাজের তীব্র প্রতিবাদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চালক জামিন নিতে সক্ষম হন। কারণ যে ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয় সেটা জামিনযোগ্য। তাকে আটক রাখার ক্ষমতা কোন হাকিমের নেই। সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের আবেগময় প্রতিবাদ এক্ষেত্রে অর্থহীন।
একই ধরনের সড়ক দুর্ঘটনায় কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মারা যান এক পুলিশ কনস্টেবল। কিন্তু এখানে মামলা হয়েছে বাংলাদেশ দ-বিধির ৩০২ ধারায়। অজামিনযোগ্য। খুনের ধারায় দায়েরকৃত এ মামলার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-, সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন। পুলিশ বাদী হয়ে কটিয়াদী থানায় মামলা করে। চালক এখনও কারাগারে।
এ দুটো সড়ক দুর্ঘটনার বিবরণ, মামলা, গ্রেফতার, জামিন ও অজামিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একই ধরনের অপরাধে আইনের প্রয়োগ ভিন্ন। সাজাও ভিন্ন। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী এক চালক বছরের পর বছর কারাগারে ধুঁকছে, আরেকজন তিন মাসের মাথায় জামিন নিয়ে বাইরে এসে হাসছে। মানে সাংবাদিক মারলে মামলা হয় সাধারণ ধারায়, আর পুলিশ মারলে মামলা হয় খুনের ধারায়। এক দেশে একই অপরাধের ভিন্ন সাজা।
জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এভাবেই দেশব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনায় আইনের প্রয়োগে অবিশ্বাস্য বৈষম্য ঘটানো হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশ প্রাণ হারালে মামলা হয় খুনের ধারায়, আর সাংবাদিকসহ সাধারণ মানুষ জীবন দিলে মামলা হয় সাধারণ ধারায়। গত তিন বছরে সারাদেশে প্রায় ১০ সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ পুলিশ প্রাণ হারিয়েছে। সব মামলাই হয়েছে খুনের ধারায়। চালকও হাজত খাটছে বছরের পর বছর। সড়ক দুর্ঘটনায় সহকর্মী প্রাণ হারালে চালক ও বাসমালিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। এজাহারে লেখা হয় পরিকল্পিত হত্যাকা-। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ মিলেছে জনকণ্ঠের অনুসন্ধানে। ঘটনাস্থল খুলনা থানাধীন নিরালা শিশুপল্লী হারমান স্কুলের সন্নিকট রাস্তার ওপর। মামলা নং ২(৭) ২০১০। ধারা ৩৩৮/ক ও ৩০২ দ-বিধি। বাদী সার্জেন্ট আবুল বাশার। মামলার এজাহারে অভিযোগ লেখা হয়েছে, ১ জুলাই খুলনার ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত সার্জেন্ট মনিরুজ্জামান শহরে ডিউটি করার সময় দেখতে পান নিষিদ্ধ সময়ে শহরে একটি ট্রাক (ঝিনাইদহ-ট-১১-০৭৮৪) বেপরোয়া গতিতে ঢুকে পড়ে। আটক করার জন্য তিনি ধাওয়া করেন। অনেক চেষ্টার পর তিনি তবলিগ মসজিদ মোড়ে ট্রাকটিকে আটক করে কাগজপত্র দেখতে চান। এতে ট্রাকচালক ফের দ্রুত গতিতে চালানোর চেষ্টা করে এবং এ সময় সার্জেন্ট মনিরুজ্জামান ট্রাকটিকে ধরতে ট্রাকটির সামনের অংশে উঠে চালককে থামানোর চেষ্টা করেন। তাতে চালক দরজা খুলে সার্জেন্ট মনিরুজ্জামানকে কিল ঘুষি মারতে মারতে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয় । এতে তিনি রক্তাক্ত জখম হন। পরে সার্জেন্ট আবুল বাশারকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এজাহারের শেষ প্যারায় বাদী লিখেছেন, ঘাতক চালক আইনের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য সার্জেন্ট মনিরুজ্জামানকে চলন্ত ট্রাক থেকে কৌশলে ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ফেলে দিয়ে হত্যা করে এবং তাতে ৩৩৮/ক ও ৩০২ ধারায় দ-যোগ্য অপরাধ করেছে।
অথচ সারাদেশে এমন কোন নজির খুব বেশি নেই যে সড়ক দুর্ঘটনায় কোন সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটলে ৩০২ ধারায় মামলা হয়। এমনকি সাংবাদিক মিশুক মুনীর ও নির্মাতা তারেক মাসুদের মতো সেলিব্রিটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর পর দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও মামলা হয়েছে সাধারণ ধারায়। এত প্রতিবাদের পরও ঘাতক চালককে তিন মাসের বেশি আটক রাখা যায়নি ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে অলিখিত নির্দেশ দেয়া আছে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় কোন পুলিশ মারা গেলে খুনের ধারায় মামলা করার। তার কিছু প্রমাণও মিলেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলি জানান, গত তিন বছরে সারাদেশে এমন ৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ পুলিশ প্রাণ হারিয়েছে। কিশোরগঞ্জ, জয়দেবপুর, উত্তরবঙ্গ, মানিকঞ্জ, খুলনায় এসব মামলা চলছে। সব মামলায় চালকদের গ্রেফতারের পর ৩০২ ধারায় মামলা হয়েছে। চালক হাজতে আছে বছরের পর বছর। আর সড়ক দুর্ঘটনায় কোন পাবলিক মারা গেলে মামলা হচ্ছে সাধারণ ধারায়। এক দেশে দুই আইন চলতে পারে না। চলা উচিত নয়।
এ ব্যাপারে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশ মারা গেলে পুলিশ বাদী হয়ে যদি ৩০২ ধারায় মামলা করে- সেটা হচ্ছে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। কারণ এ ধারায় কিছুতেই আদালতে প্রমাণ করা যাবে না। আসামি যদি আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন আমি কি সার্জেন্টকে চিনতাম? এই এক যুক্তিতেই মামলা শেষ হয়ে যাবে। কাজেই পুলিশ আইন প্রয়োগ নিয়ে যেভাবে স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিচ্ছে তা হতে দেয়া ঠিক নয়। সাধারণ মানুষ প্রাণ হারালে মামলা হবে ২৭৯ ধারায়, পুলিশ মারা গেলে হবে ৩০২ ধারায় এমনটা হয় কি করে? এটাই তো হাস্যকর। এক দেশে দু’ধরনের আইন চলতে পারে না।