শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১২, ৮ বৈশাখ ১৪১৯ 
এবার ঢাকা ভার্সিটি অচল করার নীলনক্সা
শীঘ্রই আন্দোলন শুরু করবে জামায়াতী শিক্ষকরা
স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাদা দলের শিক্ষকদের সঙ্গে আঁতাত করে বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টির অপকৌশল নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিতর্কিত শিক্ষক নেতারা। অভিযোগের ভিত্তি না থাকলেও স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে দুই বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরোপুরি অচল করে দেয়ার নীলনকশা নেয়া হয়েছে। টার্গেট হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অস্থির করে তোলা। নীলনকশা অনুসারে শীঘ্রই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন ও নানা অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন শুরু করবে বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা। এদিকে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভূতাপেক্ষ নিয়োগ নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে বুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতাদের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। খোদ সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমানকেই ১৯৮০ সালে ভূতাপেক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সিরিয়ালে ১৭তম ব্যক্তি হওয়ার পরেও। নেতাদের আসল চেহারা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এদিকে মামুলি বিষয় নিয়ে কর্মবিরতী পালন করায় ক্লাসে ফিরে যাওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আহ্বানের পরও সাড়া দেননি আন্দোলনকারী বিতর্কিত শিক্ষকরা। পাকিস্তান সফর থেকে ফিরে মন্ত্রী শিক্ষক নেতাদের নিজ বাসায় ডাকলেও সেখানে হাজির হননি জামায়াতপন্থী শিক্ষক সমিতির শীর্ষ নেতারা। শিক্ষকদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের খবর ছড়িয়ে পড়ায় শুক্রবার ছুটির দিনেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, তেমন কোন অভিযোগ না থাকলেও ক্যাম্পাস অচল করে রাখার অসৎ উদ্দেশ্যেই শিক্ষামন্ত্রীর আলোচনার আহ্বানকে এড়িয়ে চলেছেন নেতারা। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন উপাচার্যের বিরুদ্ধে আমাদের তেমন কোন অভিযোগ নেই- সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নেতাদের এমন বক্তব্যের পরেও আন্দোলন কার স্বার্থে? শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুয়েটের জামায়াতপন্থী শিক্ষক নেতাদের আন্দোলন শুরুর পরপরই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাদা দলের শিক্ষকদের সঙ্গে। ইতোমধ্যেই কয়েকদফা বৈঠকও করেছেন তারা।
সূত্র জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত অনুসারে শীঘ্রই উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন ও নানা অভিযোগের খবর ছড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন শুরু করবে বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বুয়েটের মতো এক তরফা আন্দোলন করা সহজ হবে না, তাই আন্দোলনের কৌশল নিয়ে চলছে নিজেদের মধ্যে আলোচনা। তবে জানা গেছে, উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্নভাবে অনিয়মের মনগড়া অভিযোগ তোলা হবে। অভিযোগ আনা হবে দলীয় নিয়োগেরও। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে বলা হবে, এই সময়ের মধ্যে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন ও অনিয়ম দূর করা না হলে লাগাতার কর্মবিরতী শুরু করা হবে। এদিকে পরিকল্পিতভাবে বুয়েট অচলের আন্দোলনে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী শিক্ষক নেতারা। কারণ গণমাধ্যমে আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ায় তাদের বিরুদ্ধে সরব ও প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠছে সাধারণ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরাই। শিক্ষক সমিতির নেতাদের আমলনামা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় সমিতির সাধারণ সদস্যরাও এখন ক্লাস বর্জন কর্মসূচীর পক্ষে নন। বিতর্কিত শিক্ষক নেতাদের শাস্তি এবং তাদের অবিলম্বে ক্লাসে ফেরার দাবিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আজ শনিবার ক্যাম্পাস খোলার পর আরও বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
ইতোমধ্যেই বিতর্কিত শিক্ষক নেতারা যে সব (১৭টি) অভিযোগে ভিসি ও প্রোভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন সে সব অভিযোগকে তথ্য প্রমাণসহ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক হিসেবে প্রমাণিত করেছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। এ পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষকরা অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। গত ৭ এপ্রিল থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করে আসছেন শিক্ষক নেতারা। পরে গত ১২ এপ্রিল বুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলে মন্ত্রী শিক্ষকদের ক্লাসে ফিরতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তাঁরা মন্ত্রীর পরামর্শ উপেক্ষা করে অহেতুক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনরত শিক্ষকদের অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াত ও হিজবুত তাহ্রীর রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শিক্ষকসুলভ কর্মকা- পরিহার করে তারা রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলে মরিয়া। আর তাদের অনৈতিক কর্মকা-ের খেসারত দিচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা। আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রায় সবাই মোটা অঙ্কের টাকা আর্থিক সুবিধা নিয়ে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে খ-কালীন শিক্ষকতা করছেন। তাই বুয়েট অচল করে দিয়ে সেই কাজ তারা করছেন নির্বিঘেœ। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান ভিসি ও প্রোভিসি নিয়োগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সরকারদলীয় লোক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরা ভিসি ও প্রোভিসির পদত্যাগ চাই। উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নজরুল ইসলাম বলেছেন, শিক্ষক নেতারা অভিযোগ এনেছেন কামাল আহম্মদকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে ভূতাপেক্ষ নিয়োগ অবৈধ। আসলে এটা সত্য নয়। সাধারণ শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমানকে ১৯৮০ সালে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ তিনিই এখন অন্যের ভূতাপেক্ষ নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
উপাচার্য ও উপউপাচার্যের নিয়োগের বৈধতা সম্পর্কে শিক্ষক নেতাদের অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক এসএম নজরুল ইসলাম বলেছেন, বরং আমিই বুয়েটের সবচেয়ে সিনিয়র শিক্ষক। এর আগে বিগত জোট সরকারের আমলে আমাকে বঞ্চিত করে আমার জুনিয়র শিক্ষককে উপাচার্য করা হয়েছিল। তখনই তো শিক্ষক নেতাদের নিয়ম লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলা উচিত ছিল। এদিকে ঘটনা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক মোহব্বত খান বলেন, আমরা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তবে যেটা বোঝা যাচ্ছে, এখানে তেমন কোন সমস্যাই নেই, অভিযোগগুলোর যৌক্তিকতা নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শিক্ষকদের কাজে যোগ দেয়া উচিত। সমস্যা হলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ আছে।
|