কাওসার রহমান, জেনেভা থেকে বাংলাদেশ আবারও বলিষ্ঠ কণ্ঠে উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়ে অধিকতর বাজার সুবিধা চেয়েছে। তালিকা চেয়েছে শুল্কমুক্ত ৯৭ শতাংশ পণ্যের। বলেছে, জরুরী ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিষ্কার ভাষায় জানাতে হবে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দেয়া ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধায় কোন কোন পণ্য রয়েছে। অবশিষ্ট তিন শতাংশ পণ্যের বিষয়টিও চলমান আলোচনার সমাপ্তির আগেই নি্#৬৩৭৪৩;ত্তি করতে হবে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান মঙ্গলবার সকালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সপ্তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে উন্নত দেশগুলোর কাছে এ দাবি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি উন্নয়ন সহযোগীদের আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতা চেয়েছেন। বলেছেন, তাদেরকে অবশ্যই জি-২০ সামিটসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করতে হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের চলমান আলোচনা সমাপ্তিতে বিলম্বের জন্য বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী হতাশা ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, দোহা উন্নয়ন আলোচনা শেষ করতে বিলম্বের কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেতে বিলম্ব হচ্ছে। তিনিও অন্যান্য দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে একই সুরে সুর মিলিয়ে ২০১০ সালের মধ্যে দোহা রাউন্ড শেষ করার জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী জেনেভায় চলমান বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সপ্তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বক্তৃতা করার জন্য অন্যান্য দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের মতো তিন মিনিট সময় পান। ওই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের বাণিজ্যের অবস্থা, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর চেয়ে অধিকতর অগ্রাধিকার সুবিধা প্রদানের বিষয়টি চমৎকার ভাষায় তুলে ধরেন। বলেন, 'আমি এবার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মিত বৈঠকে যোগ দিতে এসেছি। কিন্তু আমি উচ্চ আশা নিয়ে ফিরে যেতে চাই। আমি আমার জনগণ এবং সংসদের জন্য ইতিবাচক কিছু নিয়ে যেতে চাই। আশা করি জেনেভায় আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস সেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।'
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক মন্দা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ এ সমস্যার একটিও আমাদের সৃষ্ট নয়। বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে আমাদের রফতানি আয় গত প্রান্তিকে ১২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক রফতানি হ্রাস পেয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিদেশ গমন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। তার ওপর বিশ্ব বাণিজ্যে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ। বিশ্ব বাণিজ্যের এই অসম ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যদের কাছে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান আশা করছি।
বৈঠকের দ্বিতীয় দিনের কর্ম অধিবেশনে বাংলাদেশের ইসু্যটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে আয়োজনকরা মনে করছেন। বিকালে কর্ম অধিবেশনে দোহা উন্নয়ন আলোচনার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। ওই বৈঠকেই স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে তাঞ্জানিয়া এ ইসু্যটি আবারও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে তুলে ধরবে। যাতে কোন উন্নয়নশীল দেশ (নন-এলডিসি) স্বল্পোন্নত দেশের চেয়ে বেশি বাণিজ্য সুবিধা না পায়।
সোমবার জেনেভায় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় দিনের বৈঠক চলছে সকাল থেকেই। এসব বৈঠকে বিশ্ব বাণিজ্যের নীতি নির্ধারকরা নতুন বছরেই ইতি টানতে চাইছেন চলমান দোহা উন্নয়ন আলোচনার। 'দোহা ডেভেলপমেন্ট রাউন্ড' নামে বিশ্ব বাণিজ্য উন্নয়নের এই আলোচনার শুরু হয়েছে আট বছর আগে কাতারের রাজধানী দোহা থেকে। উন্নত উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে নানা বিভেদ নানা মেরুকরণের কারণে সেই আলোচনা এখনও শেষ করা যায়নি। মাঝখানে বিশ্ব বাণিজ্যের আলোচনায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। সেই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে দোহা উন্নয়ন আলোচনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য নীতি ঘোষণার ইঙ্গিত সেই দোহা উন্নয়ন আলোচনায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নেতৃবৃন্দ আগামী বছরের মধ্যে সেই আলোচনা সমাপ্তির নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তাঁরা ২০১০ সালকে গত আট বছর ধরে চলমান বিশ্ব বাণিজ্যের চলমান আলোচনা সমাপ্তির নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এজন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নেতৃবৃন্দ এ সংস্থার সদস্য দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলছেন, সদস্য দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে ২০১০ সালের মধ্যেই চলমান উন্নয়ন আলোচনা সমাপ্তি টানা সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে সংস্থার মহাপরিচালক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী প্যাসকেল লামি একটি চীনা প্রবাদ তুলে ধরে বলেন, 'জং জি চেং চেং।' অর্থাৎ একতাই শক্তি। আমরা আশা করছি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা আগামী বছরের মধ্যে দোহা উন্নয়ন আলোচনা শেষ করার ব্যাপারে আরও অধিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারব।
তিনি বলেন, আপনাদেরকে এই বিশ্বাস নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যে, টেকসই উন্নয়নে বাণিজ্য বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। আর উন্নয়নই নিয়ে আসতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এটা সৃষ্টি করতে পারে বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাণিজ্যই হতে পারে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শক্তিশালী অস্ত্র।
আড়াই হাজারেরও বেশি প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও এনজিও কর্মীর পদচারণায় জেনেভা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার মুখরিত হয়ে উঠেছে। আগের দিন দিনভর বৃষ্টির পর জেনেভার আকাশে সোনালী রোদ ঝিলিক দিয়েছে। সেই রোদে শীতের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তবে দ্বিতীয় দিনে বিশ্বায়ন বিরোধীরা আর কোন বিক্ষোভ প্রদর্শন করেনি। কনভেনশন সেন্টারের সামনের মাঠে তারা তাঁবু টাঙ্গিয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এনজিও নেতৃবৃন্দ সেখানে গিয়ে তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আসছে।