স্টাফ রিপোর্টার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এর পেছনে রয়েছে লাখ লাখ মানুষের রক্ত ও মহান আত্মত্যাগ। মুক্তিপাগল বাঙারী জাতি এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এই ডিসেম্বরেই ছিনিয়ে আনে হাজারো বছরের লালিত স্বপ্ন প্রিয় স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় লাল-সবুজের রক্তস্নাত স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বছর ঘুরে আবার এসেছে সেই বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। পৃথিবীর মানচিত্রে একটি নতুন জাতি ও ভূখণ্ডের স্বীকৃতি আদায়ের মাস। ২৪ বছরের পাকিস্তানী শাসন-শোষণকে পদানত করে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে বাংলার দামাল সন্তানরা ছিনিয়ে আনা বীরত্বগাথা বিজয় অর্জনের মাস।
৩৮ বছর আগের ২ ডিসেম্বর। একাত্তরে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর যতই এগিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যেন ততই এগিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে চরম নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতায় মেতে ওঠে হিংস্র পাক হানাদার বাহিনী। নবেম্বরের শেষ সপ্তাহের দিকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল নিয়াজী তার রাজাকার, আলবদর ও সেনাবাহিনীকে দেশের চারদিকে ছড়িয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। কিন্তু তখনও হানাদার বাহিনী বুঝতে পারেনি তাদের পতন অত্যাসন্ন।
একাত্তরের রক্তক্ষরা এই দিনে গেরিলা আক্রমণ থেকে সম্মুখযুদ্ধের গতি বাড়ে। অপ্রতিরোধ্য বাঙালীর বিজয়রথে পাকবাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে। পরাজয়ের আভাস পেয়ে তৎকালীন পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন মরিয়া হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিঙ্নকে একটি চিঠি পাঠান। ইয়াহিয়া তার চিঠিতে যুদ্ধকালীন সাহায্যের আশায় ১৯৫৯ সালের পাক-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির এক অনুচ্ছেদের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। সীমান্ত এলাকায় পাক জান্তারা সমরসজ্জা বৃদ্ধি করায় ভারতও তা মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়।
ডিসেম্বরের প্রথম থেকেই ত্রিমুখী যুদ্ধের আশঙ্কা ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। এসব দেখেশুনে ভারত সরকার বুঝেছিল, পাকিস্তান যুদ্ধ করবেই। ভারত তখন যে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা বা আশা একেবারে ছেড়ে দিয়েছে তা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানের সঙ্গে সঙ্গে ভারত সামরিক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিল। পশ্চিমের প্রস্তুতি দেখে এবং নাশকতামূলক কাজের লোক ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত মোটামুটি পরিষ্কার বুঝে ফেলে পাকিস্তান রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে না, বরং লড়াই-ই করবে। তাই তখন থেকে ভারতের প্রস্তুতিও জোরদার হয়েছিল।
অন্যদিকে বীর বাঙালীর গেরিলা আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে পাক সৈন্যরা। যতই সময় গড়াচ্ছিল গেরিলা আক্রমণ ততই প্রবল হতে থাকে। পাক সেনাদের হাতে তখনও আধুনিক অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদ থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে পরাস্ত করতে থাকে। মুক্তিপাগল বাঙালীর অকুতোভয় লড়াইয়ে পাক হানাদারদের রাতে চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়ে। নিয়াজী বুঝতে পারে, এবার বড় ধরনের কিছু করতে না পারলেই নয়। তাই মার্কিন সাহায্য নিশ্চিত, নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি, রাজাকার-আলবদর-আলশামসসহ এ দেশীয় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে নিয়ে ব্যাপক নিধনযজ্ঞ চালানোর জঘন্য পরিকল্পনা অাঁটতে থাকে কসাই নিয়াজী।
বর্ণাঢ্য ও ব্যাপক আয়োজনে মঙ্গলবার থেকে ডিসেম্বর মাসব্যাপী বিজয় উৎসব কর্মসূচী পালন শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবার বর্ণিল ও ব্যতিক্রমী আয়োজনে পালন করছে মাসব্যাপী কর্মসূচী। মঙ্গলবার সকালে যে স্থানটিতে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পরাক্রমশালী পাক হানাদাররা বাঙালীর দামাল ছেলেদের কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিল, সেই সোহরাওয়াদর্ী উদ্যানের শিখা চিরন্তনে পু্#৬৩৭৪৩;ার্ঘ্য অর্পণ, দু'হাত তুলে হাজার হাজার নেতাকমর্ী স্বাধীনতাবিরোধীদের রুখে দাঁড়ানোর দীপ্ত শপথ নিয়েছেন। যুবলীগ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকরে জনসমর্থন আদায়ে শুরু করেছে গণস্বাক্ষর অভিযান।
সিপিবি মুক্তাঙ্গনে সমাবেশ ও মিছিল করে বিজয়ের মাসের কর্মসূচীর সূচনা করেছে। সমাবেশ থেকে নেতারা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে হলে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন এবং চার মূলনীতিসহ বাহাত্তরের সংবিধান পুর্নপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। মাহবুব আলমের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আহসান হাবিব লাবলু, সাজ্জাদ জহির চন্দন, আনোয়ার হোসেন রেজা, আখতার হোসেন, জলি আক্তার, আবদুল বাসেত, মানবেন্দ্র দেব প্রমুখ।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের উদ্যোগেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও শিখা চিরন্তনে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন শেষে মুক্তিযোদ্ধারাও শপথ গ্রহণ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সুলতান উদ্দীন আহম্মদ রাজা, ইকবাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী প্রমুখ। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন ডিসেম্বর মাসজুড়ে নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে একাত্তরের বীর শহীদদের স্মরণ করছে।