নিখিল মানখিন সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং পাহাড়ীদের প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১২তম বার্ষিকী। দীর্ঘ দু'যুগের বেশি সময়ের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালের এ দিনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি বার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে সরকার। রাঙ্গামাটি জেলা সদরে জিমনেসিয়াম মাঠে দিবসটি কেন্দ্রীয়ভাবে উদ্যাপন করছে জনসংহতি সমিতি। গত এক যুগেও চুক্তিটির বাস্তবায়ন এখনও প্রাথমিক অবস্থাতেই রয়ে গেছে। পাহাড়ী ও সেটেলারদের মধ্যে বিশ্বাসের দূরত্ব দূর হয়নি আশানুরূপ। তবে চলতি বছরে ক্ষমতায় এসেই বেশ কিছু বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের এমন আন্তরিক উদ্যোগের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখতে চায় পাহাড়ীরা। সময়সীমা বেঁধে দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি তুলেছে তারা। সরকারের চুক্তি বাস্তবায়ন ইতিবাচক, তবে পাহাড়ে এখনও সেনা কর্তৃত্ব চলছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)।
চুক্তির ১২তম বার্ষিকীতে দেয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বলেন, আমি বিশ্বাস করি, শান্তি চুক্তির মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। দেশের তিন পার্বত্য জেলায় যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠী বসবাস করে আসছে। তাদের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অঞ্চলগুলোকে বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। দেশের উন্নয়ন দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রতি একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের জাতিগত হানাহানি বন্ধ এবং অনগ্রসর ও অনুন্নত ওই অঞ্চলের উন্নয়নের ধারা ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং কমিটিসমূহকে বিরাজমান সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
শান্তি চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলি, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজনের বিধান রাখা হয়। চুক্তিতে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ' গঠনের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলকে একটি অভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিটে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। এই চুক্তি বিরাজমান রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের পাশাপাশি অবসান ঘটিয়েছিল শরণার্থী সমস্যা, সশস্ত্র সংঘাত ও সহিংসতা। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে সময় পেয়েছিল তিন বছর আট মাস। ওই সময় চুক্তির বিভিন্ন দিক আইনী কাঠামো লাভ করে। কিন্তু ভূমি কমিশন আইন, সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়া ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিষয়ে দেখা দেয় মতপার্থক্য। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা লাভের পর চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণের লক্ষ্যে 'চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি' গঠনের পরিবর্তে 'মন্ত্রীপরিষদ কমিটি' নামে ভিন্ন একটি কমিটি করে। ওই কমিটি জনসংহতি সমিতিকে পাশ কাটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখে। মূলত অভ্যন্তরীণভাবে জোটের চুক্তিবিরোধী মনোভাব বজায় রাখার পাশাপাশি চুক্তি টিকিয়ে রাখার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলকে দেখানোই এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে চুক্তি লঙ্ঘন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়াকে নিয়োগ দেয়। অথচ চুক্তি অনুযায়ী একজন যোগ্য উপজাতীয়কে নিয়োগ দেয়ার কথা। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পরিবারের পুনর্বাসন কার্যক্রম জোট সরকারের আমলে সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ নি্#৬৩৭৪৩;ত্তির লক্ষ্যে গঠিত 'পার্বত্য ভূমি কমিশন' মাত্র একবার বৈঠক করা ছাড়া আর কোন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চুক্তি বাস্তবায়নের চাকা পুনরায় ঘুরতে শুরু করে। ক্ষমতা নেয়ার প্রথম বছরেই বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে চুক্তি পরিবীক্ষণ ও বাস্তবায়ন কমিটি করেছে। উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান আদিবাসী থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও নিয়োগ দেয়া হয়েছে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান। চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির ইতোমধ্যে দু'টি সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর গত সেপ্টেম্বরে তিন পার্বত্য জেলা থেকে এক ব্রিগেড সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সরকার। একটি ব্রিগেডের আওতায় সাধারণত তিনটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, সিগন্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি, আর্টিলারিসহ অন্য সহযোগি সাব ইউনিট থাকে। একেক ব্রিগেডে প্রায় ৩ হাজার জনবল থাকে। তিন পার্বত্য জেলায় মোট ৫টি সেনা ব্রিগেড রয়েছে। তার মধ্যে কাপ্তাই ব্রিগেড প্রত্যাহার করা হলো। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় ২শ'টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সরকার। আজ বুধবার শান্তি চুক্তি বার্ষিকীতে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে চুক্তি বাস্তবায়নে একান্ত আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান সরকার।
নিজস্ব সংবাদদাতা রাঙ্গামাটি থেকে জানান, পার্বত্যাঞ্চলে ত্রিপক্ষীয়ভাবে আজ বুধবার শান্তি চুক্তির এক যুগ পূর্তি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও সরকারের পক্ষে পৃথকভাবে নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন পুনরায় নতুন করে শুরু হওয়ায় খুশি এখানকার জনগণ। মঙ্গলবার রাঙ্গামাটির অফিসকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বলেন, সরকারের চুক্তি বাস্তবায়ন ইতিবাচক, তবে পাহাড়ে এখনও চলছে সেনা কর্তৃত্ব। শান্তি চুক্তির ১২ বছর পরও আঞ্চলিক পরিষদের একটি প্রবিধান ছাড়া আর কোন প্রবিধান সরকার অনুমোদন করেনি। সরকার শুধুমাত্র আঞ্চলিক পরিষদের নিয়োগ সংক্রান্ত একটি প্রবিধান অনুমোদন দিয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কোন পদমর্যাদা দেয়নি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বাস্তবায়িত হয়নি চুক্তির এমন ১১টি ধারা তুলে ধরেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমি বিরোধ ও নি্#৬৩৭৪৩;ত্তি, আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের সদস্যদের পদমর্যাদা প্রদান, জেএসএস সদস্য, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত প্রত্যাগতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর কোন বিরোধ নেই বলে তিনি জানান।
নিজস্ব সংবাদদাদা খাগড়াছড়ি থেকে জানান, চুক্তির এ ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তিন পার্বত্য জেলায় আজ বুধবার বর্ণাঢ্য কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে ত্রিমুখী কর্মসূচী পালিত হবে। চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ এবার চুক্তি সম্পর্কে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইউপিডিএফ চুক্তির দুর্বল বিষয় নিয়ে সমালোচনা করে এবং চুক্তিকে কাগুজে চুক্তি বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে বর্তমান সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করলে তারা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি বলেন, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে চুক্তি বাস্তবায়নে হাত দিয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এখানকার মানুষ উপকৃত হবে, কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না। সমধিকার আন্দোলন নেতা দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী বলেন, দু'টি সরকারই যখন চুক্তির সকল শর্ত মেনে নিয়েছে, সেজন্য আমরা এর বিরোধিতা করি না। তবে চুক্তির সঙ্গে সাংবিধানিক সাংঘর্ষিক বিষয়সমূহ বাতিল না করলে বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
এদিকে চুক্তি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি স্বীকার করেছেন পাহাড়ী নেতারাও। তবে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন তাঁরা। জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা বুধবার জনকণ্ঠকে বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাস্তবায়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে যা আমাদের উজ্জীবিত করেছে। তবে উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রাথমিক পর্যায়ে ফেলে রাখলেই হবে না, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান সরকারের নেয়া এ সব উদ্যোগের বিষয়টি ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু কার্যকর অগ্রগতি হয়েছে এমন বলা যাবে না। এর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে, কিন্তু কমিশনের কোন দফতর নেই, লোকবল নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণীত হলেও তা যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। ভূমি কমিশন গঠিত হলেও ভূমি বিরোধ নি্#৬৩৭৪৩;ত্তি হয়নি এবং চুক্তির সঙ্গে বিরোধাত্মকভাবে ভূমি কমিশন আইন প্রণয়ন করা হয়। ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন করা হয়নি। পক্ষান্তরে চুক্তি লঙ্ঘন করে সেটেলারদের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু গণ্য করে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতার ব্যাপারে আমাদের সন্দেহ নেই। কিন্তু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চুক্তি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত।