মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
৪২৬৯৫
বুধবার, ২ ডিসেম্বর ২০০৯, ১৮ অগ্রহায়ন ১৪১৬
ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশ
অর্থনীতির সব সূচকই উর্ধমুখী
রাজু আহমেদ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সব রকম আশঙ্কা কাটিয়ে ক্রমশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জাতীয় অর্থনীতির গতি। গত ৫ বছরে একের পর এক সঙ্কটের প্রভাব কাটিয়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই উর্ধমুখী অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বমন্দার প্রভাব মোকাবেলা করে রফতানি, রেমিটেন্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। তা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নেতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী সরকারের নীতিনির্ধারক এবং অর্থনীতিবিদদের বিস্মিত করেছে। অনেকেই মনে করেন, তাদের পরামর্শ না মেনে জাতীয় চাহিদা বিবেচনায় বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কারণে আইএমএফসহ ঋণদাতা সংস্থাগুলো ক্ষুব্ধ। অর্থনীতির দুর্বলতা প্রমাণ করে বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর করে রাখার জন্যই তারা এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, আইএমএফ প্রতিনিধিরা বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলেছে কোন কোন খাতে ভতর্ুকির পরিমাণ বেশি। কিন্তু আমরা জানিয়ে দিয়েছি যে সব খাতে ভতর্ুকির প্রয়োজন হবে তা অবশ্যই অব্যাহত রাখা হবে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের কম হবে না, বরং বেশি হতে পারে। অর্থনীতির ভিত মজবুত রাখতে প্রয়োজনে ভর্তুকি দেয়া হবে। আইএমএফ মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছে। আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রাখব। এডিপি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা তুলে ধরে কিছুদিনের মধ্যেই বিনিয়োগে স্থবিরতা কেটে যাবে বলে আশা করছি।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রায় তিন বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম মন্দা অবস্থা বিরাজ করলেও বাংলাদেশ সফলভাবে এর প্রভাব মোকাবেলা করেছে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়, রাজস্ব পরিস্থিতি, আর্থিক খাত, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনসহ সামগ্রিক অর্থনীতি সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-এডিবির আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে গত অর্থবছরে মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপি) ৫.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতোমধ্যেই হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। স্থানীয় উৎস থেকে রাজস্ব আয় মাত্র পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৫২ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম দু' মাসে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৯২২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বেশি।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও রফতানি খাতে গত অর্থবছরে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। অবশ্য চলতি বছরের প্রথম দু' মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রফতানি আয় ৪.১৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসে ইতিবাচক প্রবণতা ফিরে আসায় অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বিশ্বমন্দায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ খাত ওভেন ও নিট পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় চলতি অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে রফতানি আয় হ্রাসের আশঙ্কা নেই বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বিশ্বমন্দার কারণে উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি যে হারে আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তা হয়নি। অবশ্য বিশ্ববাজারে জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বিশ্ব অর্থনীতির উন্নতি হলে এ খাতে বাংলাদেশেরও উন্নতি হবে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেক প্রধান খাত প্রবাসী শ্রমিকদের অর্থ প্রেরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) এ খাতে প্রায় ২২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১০ শতাংশের বেশি থাকলেও এ বছর তা ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
বিদু্যত, গ্যাসসহ অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগ ব্যাহত হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত জুলাই মাসের পর থেকে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে স্থানীয়ভাবে ব্যাংকিং খাতের বিনিয়োগের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ২৮.১৪ শতাংশ বেড়েছে_ যার মোট পরিমাণ ৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগের আর্থিক সঙ্গতি এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সঙ্কুলানমুখী মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছে। সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো সম্ভব। বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ আগের তুলনায় উন্নত বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেছেন। শিল্প ও কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনীতির সব সূচক ইতিবাচক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিলেও সম্পূর্ণ বিপরীত মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সংস্থা। সংস্থাটির মতে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ডবল ডিজিটে চলে যেতে পারে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে শ্লথগতি, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতিহীনতার কারণে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে আসবে বলেও মনে করছে ঋণ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
তবে তাদের এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব প্রবৃদ্ধিসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে বেশি অনুকূলে থাকায় সরকার আইএমএফের সঙ্গে নতুন করে ঋণ চুক্তিতে আবদ্ধ হতে আগ্রহী নয়। অবাস্তবায়নযোগ্য ও দেশীয় বাস্তবতাবিমুখ শর্তের বিনিময়ে ঋণ না নিয়ে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে ঋণদাতাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেতে বেশি মনোযোগী হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যেই আইএমএফের দেয়া কয়েকটি ঋণ চুক্তির প্রস্তাবে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে সরকার। তাদের পরামর্শ ও চাপ উপেক্ষা করে সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতির পরিবর্তে সঙ্কুলানমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এসব কারণে বাংলাদেশে ঋণ কার্যক্রম নিয়ে কিছুটা হলেও চিন্তিত আইএমএফ। দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক ভবিষ্যদ্বাণী করার পেছনে এ বিষয়টি কাজ করছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।
এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, কৃষি, শিল্প ও জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে তার অনেক কিছুই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের পরামর্শের সঙ্গে মেলে না। এ কারণে এসব সংস্থার সঙ্গে সরকারের মনোমালিন্য অস্বাভাবিক নয়। দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে আইএমএফ যে মূল্যায়ন করেছে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তা ছাড়া এর আগে দেশের পোশাক শিল্প, বিশ্বমন্দার প্রভাব এবং সর্বশেষ গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফ ও এডিবি যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল_ তা শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এবারও অর্থমন্ত্রী নিজেই তাদের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। অবশ্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে আইএমএফের শঙ্কা কতটা সঠিক_ অর্থবছর শেষ হলেই তা প্রমাণ হয়ে যাবে।