মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
১১২৮১০
বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০০৯, ৫ অগ্রহায়ন ১৪১৬
বাইরে রূপবতী ভেতরে কঙ্কাল, উজাড় করছে চোরেরা
সুন্দরবনের গভীরে
ফিরোজ মান্না/ আহসান হাবিব হাসান, সুন্দরবনের চরাপুটিয়া থেকে পশুর নদীর দুই তীরজুড়ে বনভূমি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে। গোলপাতার সবুজ দৃশ্য যেন বনভূমিকে অপরূপ রুপে সাজিয়ে রেখেছে। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখে মনে হবে ঘন গাছপালায় সুন্দরবন ভরে আছে। রূপবতী বনভূমি বাইরে সেজে থাকলেও ভেতরে তার কঙ্কালসার। গাছশূন্য বনভূমিতে বিরাজ করছে অন্তর দহন আর তীব্র হাহাকার। তীর ঘেঁষে গেলে-মাঝ নদী থেকে দেখা দৃশ্যপট চোখের পলকে মিলিয়ে যাবে। বনের এমনই চিত্র দেখে হবে ভীষণ মন খারাপ। গোলপাতার সবুজ আর অন্দোলিত করবে না কারও মন। তখন বুকের ভেতর যন্ত্রণাই হবে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের এমন করুণ পরিণতি আজ। বনের ভেতরে চোরের দল নেমেছে গাছ কাটার মহাপ্রতিযোগিতায়। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নির্বিচারে তারা বন উজাড় করছে। গাছ চোর ঠেকাতে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গাছচোররা শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় বন কর্তৃপক্ষ অসহায় হয়ে পড়েছে। তবে অভিযোগ আছে গাছচোরদের প্রতি বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীদের রয়েছে আশীর্বাদ।
বুধবার খুব ভোরে আমরা সাম্পান বোটে যাত্রা শুরু করি সুন্দরবনের চড়াপুটিয়া টহল ফাঁড়ির দিকে। গোটা সুন্দরবনে গাছ কাটা হলেও চরাপুটিয়াতে গাছ কাটার পরিমাণ অনেক বেশি। পশুর নদী ধরে ৫৫ নটিক্যাল মাইল যাওয়ার পর ইন্দুরকানি খাল। এই ইন্দুরকানি খাল পার হয়ে কেউড়া খাল। দুই খালের মোহনায় চরাপটিয়া বন বিভাগের টহল ফাঁড়ি। টহল ফাঁড়ির আশপাশের দৃশ্য দেখে মনে হলো এখানে ঘন বনভূমি। আমরা নেমে পড়লাম। বনের ভেতরে কিছুদূর যেতেই দেখা মেলে নতুন কেটে নেয়া গাছের গুঁড়ি। আর কিছু দূর ভেতরে ঢুকতেই অসংখ্য গাছের গুঁড়ির সন্ধান মেলে। বনের ভেতরে আমাদের চোখে কেটে নেয়া হাজারের গাছের গুঁড়ি চোখে পড়েছে।
বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে খবর মিলেছে-সুন্দরবন থেকে কোটি কোটি টাকার মূল্যের কাঠ পাচার হয়ে যাচ্ছে। কাঠ পাচারের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মী যুক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিনে রাতে কাঠ পাচারের কারণে এরই মধ্যে সুন্দরবন এক রকম ফাঁকা হয়ে গেছে। চোররা বেশি পাচার করে সুন্দরী গাছ। সিডর আক্রান্তের পর সকল প্রজাতির বনজ সম্পদ অহরণের সরকারী নিষেধজ্ঞা দেয়া হয়েছে। সরকারের এই নিষেধজ্ঞা কেবল কাগজে কলমে বলবত রয়েছে। বাস্তব চিত্র ভিন্ন রকম। কে কার নিষেধজ্ঞা মেনে চলে। এখানে গাছচোরই রাজা। তাদের রাজত্বে সরকারের নিষেধাজ্ঞা খুবই দুর্বল ভিত্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়ি নির্মাণ ও গাড়ি কেনার স্বপ্ন পূরণ করতেই গাছচোররাই যেন তাদের মাথার মুকুট। নিজেদের কোন কষ্ট নেই_বসে থেকেই মাসে মাসে হাতের মুঠায় চলে আসছে লাখ লাখ টাকা। চোররা সুন্দরী গাছ কেটে পাচার করে। কেননা এই গাছের মূল্য অন্যান্য গাছের চেয়ে অনেক বেশি। জানা গেছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোররা সুন্দরবনে কাঠ কাটার জন্য বনে ঢোকে।
গাছ কেটে 'ভুর' তৈরি করে গোল গাছের গোড়া দিয়ে কাঠ ভাসিয়ে রশি টেনে নিরাপদ স্থানে চোররা কাঠ নিয়ে যায়। ভুরের মাধ্যমে যারা কাঠ পাচার করে তাদের ভুর পার্টি বলা হয়। চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারি, ঘাঘড়ামারী, বড় জোংড়া, ছোট জোংড়া, নল বুন্না, বস্তার খাল, আন্দারিয়া, পোড়া মহল, মৃগেমারী, নন্দবালা, আদাচাকি, ইন্দুর কৌটা, ইন্দুর কানি, চরপুটিয়া, শেলার ভরানী, ডাকাইতা খাল, হরজাল, গোসিয়া_এসব স্থান থেকে চোররা গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। খুলনা রেঞ্জের সুতোরখালী, নলীয়ান, কাশিরাবাদ, সাতক্ষীরা রেঞ্জের কৈখালী, কদমতলা. কোবাতক, শরণখোলা রেঞ্জের বগি, সুপতি ছাড়াও সুন্দরবনের প্রায় সর্বত্র কাঠ চোরদের তৎপরতা রয়েছে। চাঁদপাই রেঞ্জের চিলাবাজার, কেয়াবন, বরইতলা ভায়না দিয়ে কাঠ পাচার হয়ে বাগেরহাট, স্বরুপকাঠি, আরিচা, জিঞ্জিরা, গোপালগঞ্জ, টেকেরহাট, রামদিয়া, খুলনা চাঁনমারি_এসব বড় মোকামে চলে যায়। সরেজমিন অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে মংলা ও খুলনা এলাকায় কাঠ পাচার চক্রের কয়েকজন গডফাদার রয়েছে। এই প্রভাবশালী গডফাদারই সুন্দরবন উজাড় করে দিচ্ছে। মংলার এক সাবেক জনপ্রতিনিধি আর খুলনার ক্ষমতাসীন দলের এক প্রতিনিধির ছোট ভাই সুন্দরবনের কাঠ চুরির চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। মংলার অর্ধশত স-মিলসহ খুলনার শিপইয়ার্ড থেকে রূপসা পর্যন্ত ২ শতাধিক স-মিলে অবৈধভাবে সুন্দরী কাঠ সাইজ করা হয়। এছাড়া বনসংলগ্ন উপকূলী লোকালয়ে রয়েছে অসংখ্য স-মিল। বন বিভাগের লোক দেখানো তৎপরতাও ব্যাপক সংখ্যক চোরাই গাছ উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন টহল ফাঁড়িতে দেখা গেছে চোরাই সুন্দরী কাঠসহ অন্যান্য কাঠ আটক করেছে। কাঠ পাচার বেড়ে গেলেও বন বিভাগ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করছে তুলনামূলক অনেক কম। রাজনৈতিক নগ্ন হস্তক্ষেপ বন কর্তৃপক্ষের ওপর পড়ছে বলেই মামলা ও আটকের সংখ্যা কম। এ ব্যাপারে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাবাসীর ভাষ্য হচ্ছে, সুন্দরী কাঠ বন থেকে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া পশুর, ধন্দুল আর আমুর গাছ চোখে পড়ে না।