বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০০৯, ৫ অগ্রহায়ন ১৪১৬
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেবে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষাথর্ী
শুরু হচ্ছে শনিবার, সফলতা নিয়ে উদ্বেগ
বিভাষ বাড়ৈ শনিবারথেকে শুরু হচ্ছে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিতব্য আলোচিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। দেশের সর্ববৃহৎ এই পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেবে সারাদেশের পঞ্চম শ্রেণীর ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৮০ পরীক্ষার্থী। ২২, ২৩ এবং ২৪ নবেম্বর ছয়টি বিভাগের ৫০২টি উপজেলার ৫ হাজার ৩৪৮টি কেন্দ্রে প্রতিদিন দু'টি করে মোট ছয়টি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের দেয়া হবে সনদ, যা নিয়ে তারা ভর্তি হবে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত হবে ফল। আর ২৫ জানুয়ারি প্রকাশ করা হবে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা। এদিকে সকল আয়োজন সফল করতে এ মুহূর্তে প্রস্তুত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা অধিদফতর। কেন্দ্রীয়ভাবে তৈরি প্রশ্নপত্র ইতোমধ্যেই চলে গেছে উপজেলাগুলোতে। সকল কাজ সর্বক্ষণিক মনিটরিং করছে প্রাথমিক শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটি। আগামীকাল থেকেই খোলা হচ্ছে দু'টি কন্ট্রোল রুম।
এর আগে পঞ্চম শ্রেণীতে শিক্ষাথর্ীরা নিজের বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা এবং উপজেলা পর্যায়ে বৃত্তি পরীক্ষা দিত। এ পদ্ধতি পরিবর্তন করে সারাদেশে একদিনে, একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেয় বর্তমান মহাজোট সরকার। কারণ হিসেবে সকল শিশুর জন্য সমান মানের শিক্ষা প্রদানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, চলমান নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি স্কুলে সীমিত সংখক পরীক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ায় স্কুলে কেবল তারাই গুরুত্ব পায়। এর বাইরে যারা কিছু কম মেধাবী সেই লাখ লাখ শিক্ষাথর্ী স্কুলে অনেকটাই অবহেলার শিকার হয়। শিক্ষকরাও বৃত্তি পরীক্ষায় ফল ভাল করতে বৃত্তির জন্য বাছাইকৃত স্বল্পসংখক শিক্ষার্থীকে নিয়ে ব্যাস্ত থাকে পুরো সময়। ফলে প্রাথমিক স্তরেই তৈরি হয় বৈষম্য। এ বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েই সরকার মূলত সকল বিষয়ের জন্য একটি পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এসএসসি পরীক্ষার আদলে এ পরীক্ষা হবে। ১৩ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার নীতিমালা জারি করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী বাংলা, গণিত, ইংরেজী, পরিবেশ পরিচিতি সমাজ, পরিবেশ পরিচিত বিজ্ঞান ও ধর্ম_ এ ছয়টি বিষয়ে পরীক্ষা হবে। ২২, ২৩ ও ২৪ নবেম্বর অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সময় হবে দুই ঘণ্টা করে। বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষায় ঢাকা বিভাগের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের ১৩৪টি উপজেলার ১ হাজার ৫৩৪টি কেন্দ্রে ৬ লাখ ১০ হাজার ৬১৩ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১০৫টি উপজেলার ১ হাজার ৯৮টি কেন্দ্রে ৪ লাখ ৫ হাজার ৬২৫ পরীক্ষার্থী অংশ নেবে। এছাড়া রাজশাহী বিভাগের ১২৫টি উপজেলার ১ হাজার ২৮৫টি কেন্দ্রে ৫ লাখ ৫ হাজার ৩৮, খুলনা বিভাগের ৬০টি উপজেলার ৬৪৪টি কেন্দ্রেু ২ লাখ ১৯ হাজার ৩৮০, বরিশাল বিভাগের ৪০টি উপজেলার ৩৯২টি কেন্দ্রে ১ লাখ ১১ হাজার ১৫০ এবং সিলেট বিভাগের ৩৮টি উপজেলার ৪০৬টি কেন্দ্রে অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে ১ লাখ ২৮ হাজার ৭২০ পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার ১৯৬ ছাত্রী এবং ৯ লাখ ৯ হাজার ৯৮৪ ছাত্র। মোট কেন্দ্রের মধ্যে আছে বিদেশে অবস্থিত ৫টি কেন্দ্র।
পরীক্ষা চলাকালীন কেন্দ্র পরিচলনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সর্বক্ষণিক দায়িত্বে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলিশের মাধ্যমে পরীক্ষার দিন সকালে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্ন পেঁৗছে দেবেন। প্রতি কেন্দ্রে প্রথম শ্রেণীর অফিসার ছাড়াও দু'জন হল সুপার এবং পরীক্ষা হলের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ, আনসার ও গ্রাম পুলিশ থাকবে। মন্ত্রণালয়, অধিদফতর এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতি এখন মোটামুটি শেষ। একটি ইউনিয়নে কমপক্ষে একটি পরীক্ষা কেন্দ্র থাকবে। তবে শিক্ষার্থী বেশি হলে কেন্দ্র হবে একাধিক। অন্তত ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ কেন্ত্র হবে উচ্চ বিদ্যালয়ে। যে বিদ্যালয়ে পরীক্ষা হবে ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হবেন কেন্দ্র সচিব। প্রতিটি শিশুই নিজ ইউনিয়নের কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাবে। তবে এক ইউনিয়নের শিক্ষকরা অন্য ইউনিয়নের কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে শিক্ষকরা নিজ নিজ ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের খাতা মূল্যায়ন করবেন। উপজেলার সকল প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন। শিক্ষা অফিসের সকল কর্মকর্তা সর্বক্ষণিক কাজের সঙ্গে থাকবেন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করে বণ্টনের দায়িত্ব পালন করছে ময়মনসিংহে অবস্থিত জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী। পরীক্ষা অনুষ্ঠানের বিষয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর ইতোমধ্যে একটি নির্দেশনা দিয়েছে। যেখানে পরীক্ষার সার্বিক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। নম্বরের ভিত্তিতে ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ এই দুই শাখায় বৃত্তি দেয়া হবে। সব ধরনের বৃত্তি ৫০ ভাগ ছেলে ও ৫০ ভাগ মেয়েদের দেয়া হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও এ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। পরীক্ষায় ব্যয় হবে ২০ কোটি ৪৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ফি বাবদ নেয়া হয়েছে ৩০ টাকা করে। পরীক্ষার ফি বাবদ ছয় কোটি টাকা ছাড়াও দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প (পিইডিপি-২) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অর্থ থেকে অবশিষ্ট প্রতি পরীক্ষার্থীর জন্য মাথাপিছু ৭৪ টাকা ভতর্ুকি দেবে সরকার। নম্বরের ক্ষেত্রে কোন অভিভাবকের আপত্তি থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষার যৌক্তিকতা প্রদর্শন করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর আবেদন করতে হবে। পুনর্নিরীক্ষার ফি বাবদ ২০০ টাকা ব্যাংক ড্রাফট করতে হবে।
পরীক্ষার জন্য আগামীকাল শুক্রবার থেকে ২৪ নবেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর পৃথকভাবে দু'টি কন্ট্রোলরুম স্থাপন করছে। কন্ট্রোল রুমে সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন এবং পরীক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য আদানপ্রদান করবেন। মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুমের টলিফোন নম্বর-৭১৬০২৯২, ফ্যাঙ্-৭১৬৮৮৭১ এবং অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন নম্বর-৮০১৮১২৩, ৯০১২৯২০ ও ফ্যাঙ্ নম্বর ৮০১৮১২২।
এদিকে পরীক্ষার জন্য সরকারের প্রস্তুতি ব্যাপক হলেও বিশাল এ পরীক্ষার সফলতা নিয়ে কিছুটা হলেও উদ্বিগ্ন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। মাত্র ২ থেকে ৩ মাসের প্রস্তুতিতে ২০ লাখ শিশুকে দিয়ে প্রতিদিন ২টি করে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই মনে করছেন একটি চ্যালেঞ্জ। বিষয়টি অনেক কঠিন মনে করছেন শিক্ষকরাও। অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বুধবার রাতে জনকণ্ঠকে বলেন, এত বড় আয়োজনে একটু বেশি সময় পেলে ভাল হতো। স্বল্প প্রস্তুতিতে পরীক্ষা নেয়ার ফলে প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা জটিলতার আশঙ্কা থেকে য়ায়। তিনি আর বলেন, এর আগে সর্ববৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা ছিল এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। অথচ সেখানে পরীক্ষার্থীও থাকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ। তবে পরীক্ষার আয়োজনকে স্বাগত জানাচ্ছেন কর্মকর্তা, শিক্ষক, অভিভাবক সকলেই। তাদের অভিমত, অল্প সময়ে কোন অভিজ্ঞতা ছাড়া এত বড় পরীক্ষা সফলভাবে নেয়াটা অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারলে শিশুদের শিক্ষার মানে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা। পরীক্ষা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজনে দেশের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রাথমিক শিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন এবং প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। বুধবার মন্ত্রণালয়ে স্টিয়ারিং কমিটির সভা শেষে তাঁরা পরীক্ষার আয়োজনে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
|