আহসান হাবিব হাসান, মংলা ॥ সুন্দরবন নিয়ন্ত্রণ করছে মংলাসহ আশপাশ এলাকার বন ও জলদস্যুরা। শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বনদস্যুরা অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করে সুন্দরবনে দস্যুতা চালাচ্ছে। আবার কেউ কেউ অর্থের লোভে বনদস্যুদের সঙ্গে আঁতাত করছে বলেও জানা যায়। এ ছাড়া বন্দুকযুদ্ধে বনদস্যুরা নিহত হলেও রহস্যজনক কারণে কমছে না দস্যুতা। এক অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ার সুন্দরবনে চলছে দস্যুদের তা-ব। তারা একটি বাহিনীকে সেল্টার দিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পূর্ব সুন্দরবন অঞ্চলে আলোচিত বনদস্যু জুলফিকার আলী গামা, রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু, নাছির বাহিনীর প্রধান নাছির, সোহাগ বাহিনীর প্রধান সোহাগসহ অধিকাংশ জল ও বনদস্যুর বাড়ি বাগেরহাট জেলার মংলা, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এ সব দস্যুরা বাগেরহাট-খুলনা, বরিশাল ও বরগুনা জেলা শহরসহ রাজধানী ঢাকাতেও এদের নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুন্দরবনে অভিযান চালাতে গেলে দস্যুরা তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কিংবা রহস্যজনকভাবে আগাম খবর পেয়ে যায়।
২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শরণখোলায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত চার বনদস্যুর বাড়ি বাগেরহাটের বিভিন্ন উপজেলায়। একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের কাছে বরগুনা পাথরঘাটা এলাকায় র্যাব-৮-এর সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হয় সুন্দরবনের তালিকাভুক্ত আসামি জলদস্যু কৃষ্ণসাগর বাহিনীর প্রধান। সাগরের (৩৯) বাড়ি বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা গ্রামে। ২৩ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরের টগরা ফেরিঘাটের পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় নিহত হয় কুখ্যাত বনদস্যু মোতালেব বাহিনীর প্রধান। মোতালেবের (৩৮) বাড়ি মংলা উপজেলার চাঁদপাই এলাকায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি সুপতি ফরেস্ট স্টেশনে নিহত হয় মুক্তার শেখের ছেলে আসাদ (৩৮) ও আঃ মজিদ সিকদারের ছেলে আবু সাইদ সিকদার (৩৫)। তাদের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলায়।
২০১১ সালে সুন্দরবন অঞ্চলে পৃথক ঘটনায় র্যাবের গুলিতে ও সংঘবদ্ধ জেলেদের গনপিটুনিতে নিহত হয়েছে কয়েক দস্যু। গ্রেফতার করা হয়েছে ৬ জলদস্যুকে। এদের সবার বাড়ি বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। এ ছাড়া চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত সোহরাব বাহিনীর প্রধান সোহরাবের (৩৫) বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার পিসি বারুইখালি গ্রামে।
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের দীঘির খাল এলাকায় ১১ ফেব্রুয়ারি বনদস্যু এনামুলের গুলিতে মুকুল নিহত হয়। এ ঘটনার ৩ দিন পর পুলিশ বাদী হয়ে খুলনার দাকোপ থানায় হত্যা ও অস্ত্র আইনে মামলায় ৫৮ জনকে আসামি করে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করে।
এদিকে সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ বনদস্যু মুকুল বাহিনীর প্রধান মুকুল হত্যার ঘটনায় আদালতে বনদস্যু এনামুলসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত মুকুলের বোন শাহারা বেগম ২৩ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বনদস্যু এনামুলসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ দায়ের করেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি এর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। পূর্বের মামলার পর নতুন মামলায় প্রকৃত দোষীদের আড়াল করা হচ্ছে ।
দুবলার ফিসারম্যান গ্রুপের সভাপতি মেজর জিয়া বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসায়ী, ও বনবিভাগে চাকরিরতদের ছত্রছায়ায় থেকে এ সব বনদস্যুরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি দস্যুদের এই কর্মকাণ্ডকে এ সব প্রভাবশালীদের ‘পার্টনারশীপ’ ব্যবসা বলে উল্লেখ করেন। সুন্দরবন যে দস্যুরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এমন প্রশ্নে মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, অর্থ উপার্জনের সহজ উপায় হওয়ায় অধিকাংশ লোক এ পেশা বেছে নিচ্ছে।
বাগেরহাট পুলিশ সুপার খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বাগেরহাট জেলার মংলা, শরণখোলা ও মোড়েলগঞ্জ উপজেলার একটা বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। এ সব এলাকার মানুষ বৈধ-অবৈধভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবন তাদের কাছে ডাল-ভাতের মতো। যারা একটু সাহসী বা লোভী তারা প্রচুর টাকা আয়ের লোভে দস্যুতা করে। এ এলাকার মানুষের যেমন সুন্দরবনের সবকিছু নখদর্পণে, দেশের অন্য জেলার মানুষেরা তেমন সুন্দরবন চেনে না। ফলে অন্য জেলার মানুষ এসে এখানে দস্যুতা চালাতে পারে না। আবার বাগেরহাটের দস্যুরা অপরাধ করে দ্রুত নিরাপদে চলে যেতে পারে।