মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শনিবার, ১ মে ২০১০, ১৮ বৈশাখ ১৪১৭
প্রতিক্রিয়া
ভাষা উন্মুক্ত হবেই
গত ৮ এপ্রিল, ২০১০ তারিখ 'সাইবার যুদ্ধের যুগে প্রথম পা ॥ একুশ শতক' শিরোনামে মোস্তফা জব্বার দৈনিক জনকণ্ঠে একটি লেখা দিয়েছেন, যার মূল বক্তব্য সাম্প্রতিক সরকারী অনেক ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের ঘটনা। সুকৌশলে তিনি এর সঙ্গে জড়িয়েছেন বিনামূল্যে বাংলা লেখার সফটওয়্যার অভ্র কীবোর্ড, জাতিসংঘের টঘউচ এবং নির্বাচন কমিশনকে। অভ্রকে 'পাইরেটেড সফটওয়্যার' উল্যেখ করে তিনি বলেন, "আমার বিজয় সফটওয়্যারের পাইরেটেড সংস্করণ ইন্টারনেটে প্রদান করার ক্ষেত্রে এই হ্যাকাররা চরম পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছে। এই হ্যাকার ও পাইরেটদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে ইউএনডিপির নামও যুক্ত আছে। অভ্র নামক একটি পাইরেটেড বাংলা সফটওয়্যারকে নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ইউএনডিপির অবদান সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন সেলের ওয়েবসাইট হ্যাক হলে তার দায় থেকেও ইউএনডিপিকে ছাড় দেয়া যায় না।" এ ধরনের মন্তব্য তাঁর এটাই প্রথম না। এর আগেও তিনি জনকণ্ঠে সরাসরি 'চুরি করা সফটওয়্যার' অভিহিত করেন।
একটা বিপ্লব ঘটাতে অন্তত একজনকে নেতৃত্ব দিতে হয়। সে রকম কোন নেতৃত্ব ছাড়া সব মানুষ কীভাবে এক হয়ে গেলেন? মোস্তফা জব্বার শূভ্রকে পাইরেটেড না বলে গান শোনার সফটওয়্যার উইনএ্যাম্পকে চুরি করা সফটওয়্যার বললে কি একই প্রতিক্রিয়া হতো? "ঝামেলা অভ্রর টীম সামলাক, আমাদের কী?" এই কথাটা ভেবে সবাই কেন চুপচাপ থাকলেন না? মুক্ত সফটওয়্যারের ধারণাটি নতুন না, কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য স্বপ্নটি সবাইকে প্রথমবার দেখিয়েছিল এই অভ্র। 'ভাষা হোক উন্মুক্ত' কথাটা শুধু অভ্রের স্লোগান না, এটা একটা অধিকার প্রতিষ্ঠার আশ্বাস। মোস্তফা জব্বার যখন জেনেশুনে সেই অধিকারটা কেড়ে নিতে চান, মানুষ কেন চুপ করে থাকবে? স্বাধীনতার ডাক বড় খারাপ জিনিস, দাবানলের মতো তার ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না।
পাইরেসির অভিযোগের জবাব :
মোস্তফা জব্বার তাঁর লেখায় ঢালাওভাবে পুরো অভ্র কীবোর্ডকেই 'পাইরেটেড' হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। অভিযোগটা গুরুতর, একটা জাতীয় দৈনিকে অভিযোগটা কেউ করলে আমরা অবশ্যই ধরে নেব তিনি যা লিখছেন বুঝেশুনে লিখছেন। মজার ব্যাপার হলো, মানুষজন অভ্র কীভাবে পাইরেটেড প্রশ্নটা করে তাঁকে চেপে ধরার পর তিনি বললেন, অভ্র নিয়ে তার আপত্তি নেই। অভ্রতে ইউনিবিজয় নামে যে কীবোর্ড লেআউট আছে ঐটা তার বিজয় লেআউট থেকে চুরি করা। চমৎকার, আসুন দেখি কী করলে কপিরাইটেড /পেটেন্টেড লেআউট (অথবা সেটার প্রয়োগ)-এ আমরা চুরির অভিযোগ দিতে পারি।
১) অবিকল লেআউট স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে:
অনুমতির প্রসঙ্গ যখন উঠলই তখন বলি, ২০০৩ সালে অভ্র ডেভেলপের পরিকল্পনা করার সময় আমি ফোনে মোস্তফা জব্বারের কাছে বিজয় লেআউট ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলাম। তাঁকে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছিল, সফটওয়্যারটা যে কেউ বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবে। বিজয় তখনও ইউনিকোড সমর্থন করত না। ইউনিকোড সমর্থন দেয়ার কোন পরিকল্পনাও তাঁর ছিল না। এই সফটওয়্যারটা ইউনিকোড সমর্থিত হবে, সুতরাং তিনি বিজয় ফন্টের অপব্যবহারের চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। শুধুমাত্র লেআউট একই, এছাড়া সফটওয়্যার দুটোতে কোন মিল থাকবে না। তিনিও তাঁর জবাব জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁকে টাকা না দিলে তিনি অনুমতি দেবেন না।
কীবোর্ড লেআউট যে সমস্ত কী-এর একটা সেট, যেখানে একটা কী-এর পার্থক্য হলে দুইটা সেট আলাদা হয়ে যায়, এটা বুঝতে পারেন মোস্তফা জব্বার? যাতে বুঝতে পারেন সেজন্য খুব সহজ করে নিচে লিখেছি।
২) ফিজিক্যাল লেআউট অনুমতি ছাড়া বিতরণ করলে:
প্রশ্নই আসে না। অভ্র কীবোর্ড একটা সফটওয়্যার মাত্র, এর সাথে বিজয় লেআউট ছাপানো কোন কীবোর্ড আমরা বিতরণ করি না।
৩) কী বোর্ড ইন্টারফেস প্রোগ্রামের কোড অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে:
আবারও বলি, এই পয়েন্টও খাটে না। বিজয় ক্লোড সোর্স। সেটার সোর্স থেকে অভ্র ডেভেলপ করা সম্ভব না। কীভাবে বিজয় হ্যাক করে অভ্র বানানো হলো তার ব্যাখ্যা আপনার কাছে দাবি করছি। জবাব দেয়ার আগে দয়া করে 'ইংরেজীতে হ্যাকিং লিখে গুগলে অনুসন্ধান' করে যে 'মজার মজার সব তথ্য পাওয়া যায়', সেগুলো নিয়ে একটু পড়াশোনা করবেন।
(৪) ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন করলে :
বিজয় শব্দটি আপনার রেজিস্টার্ড ট্রেডমার্ক। সেটা যাতে লঙ্ঘন করা না হয় এবং ইউনিবিজয় যে পরিষ্কারভাবে আলাদা একটা লেআউট সেটা বোঝাতেই এর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। আমরা কোনদিনই অভ্রর সাথে বিজয় নামে কোন লেআউট ব্যবহার করিনি। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, ইউনিবিজয় বা ইউনিজয় লেআউটগুলো বের হয়েছে ২০০৩ সাল বা তারও আগে। ১৯৮৭ সালে ডিজাইন করা হলেও আপনি বিজয়ের পেটেন্ট পেয়েছেন ২০০৮/২০০৯ সালে। সেক্ষেত্রে পেটেন্টের আগের থেকেই থাকা এই লেআউটগুলো কীভাবে পেটেন্টবিরোধী হয়ে গেল আমাদের বোঝাবেন?
আমি আপনার মতো কখনই ভাবি না, মানুষ সারাজীবন বিজয় বা অভ্রই ব্যবহার করে যাবে। নতুন দিনের সাথে খাপ খাওয়াতে না পারলে অন্য প্রযুক্তির জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, এটা ধ্রব সত্য। বাংলা কীবোর্ড নিয়ে গবেষণা থেমে থাকবে না। আপনি আপনার পেটেন্টের কাগজ সবার কাছে প্রকাশ করুন। দেখিয়ে দিন ঠিক কোন্ রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটা আপনি বন্ধ করে দিতে চান। বার বার একেকজন কাজ করার পর আপনি বলতে পারেন না, এই রাস্তায় তো বেড়া দেয়া ছিল। আমরা বিজয় কীবোর্ডকে প্রমোট করার জন্য মাঠে নামিনি। নেমেছি বাংলা ভাষা নিয়ে ব্যবসার শিকার হওয়া থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে। আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন অভ্রতে আপনার ডিজাইন করা বিজয় কীবোর্ড লেআউট আছে, আমি সে মুহূর্তে সেটা বাদ দেব। আর যদি প্রমাণ ছাড়া আসেন, তাহলে নতুন কিছু বলেন।
নির্বাচন কমিশন ও ইউএনডিপির সাথে অভ্রর অবৈধ সংশিস্নষ্টতার অভিযোগের জবাব :
ইউএনডিপি কে, কেন, কোথায়, কীভাবে এবং তাদের সাথে অভ্রের কী সম্পর্ক এসব বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। আশা করি আপনি যা বলেছেন সেটা ব্যাখ্যা করতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন থেকে সরাসরি ডাক পেয়েই আমি গিয়েছিলাম। অভ্রকে সেখানে ব্যবহার করতে কোন রকম লবিং বা প্রভাব খাটানোর মতো কাজ করতে হয়নি। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল দেশের টাকা বাঁচানো।
নির্বাচন কমিশন ডাটা এন্ট্রি, ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ সংরক্ষণ করা_ এ সবের জন্য প্রথম যে সফটওয়্যারটা ব্যবহার করেছিল সেটায় সরাসরিই বাংলা লেখা যেত; অভ্র বা বিজয়ের মতো কোন কীবোর্ড ইন্টারফেস প্রয়োজন হতো না। সমস্যা হলো প্রতিটা ল্যাপটপের জন্য সেটার একটা আলাদা লাইসেন্স কিনতে হতো। হাজার হাজার ল্যাপটপের জন্য হাজার হাজার লাইসেন্স। বুঝতেই পারছেন, বিশাল খরচের ব্যাপার। সে খরচ কমানোর জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় এ রকম একটা সফটওয়্যার তারা নিজেরাই ডেভেলপ করে নেবে। বুয়েটের একজন শিক্ষককে সে দায়িত্ব দেয়া হয়।
আপনার ভাষ্যমতে, আপনি যদি নির্বাচন কমিশনের কাছে অভ্রর জন্য ৫ কোটি টাকার বিজয়ের লাইসেন্স বিক্রি করতে ব্যর্থ হন, এককথায় বলি, আমাদের সমস্ত পরিশ্রম সার্থক। এ দেশের মানুষের ৫ কোটি টাকা নর্দমায় ভেসে যায়নি, বরং অন্য কোন কাজে লেগেছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে আরেক বার কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য।

অভ্র টীম-এর পক্ষে
মেহদী হাসান খান