মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ৪ এপ্রিল ২০১০, ২১ চৈত্র ১৪১৬
সাইবার যুদ্ধের যুগে প্রথম পা ॥ একুশ শতক
মোস্তফা জব্বার
অবশেষে বাংলাদেশ সাইবার যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছে। রাইফেল-বন্দুক আর গোলাবারুদের যুদ্ধের সঙ্গে একুশ শতকের ডিজিটাল যুগের লড়াইতে আক্রান্ত হয়েছে বাংলাদেশ_আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে বাংলাদেশ সরকার। প্রাথমিক মূল্যায়ন থেকে একবাক্যে বলা যায়, সরকার সাইবার যুদ্ধের যুগে ব্যর্থতার সঙ্গে প্রথম পা ফেলল। আরও বলা যেতে পারে, আক্রমণের শুরুতেই একেবারে পুরো কুপোকাত হয়েছে সরকার। বোঝা যায় যে, এই যুদ্ধে লড়াই করার কোন প্রস্তুতিই ছিল না সরকারের। কাকতালীয়ভাবে এই হামলাটি হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ সেবা দিচ্ছে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল নামক বিশ্ব সংস্থা। অথচ ওখানকার বিশেষজ্ঞরা কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের ওয়েব পেজ হ্যাক হয়েছে। অপরাধ দমনকারী এলিট ফোর্স র্যাবের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়াটা মোটেই সুখকর কিছু নয়।
২০১০ সালের ২১ মার্চের সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকার একটি খবর ছিল যে, প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত দেশের ৬৪টি জেলার তথ্য বাতায়নগুলোর মাঝে ১৯টি ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়েছে। যারা এসব ওয়েবসাইটের হ্যাকিং অবস্থাটি দেখেছেন তাদের চোখের সামনে ভাসছে_মূল পৃষ্ঠায় ইংরেজীতে লেখা আছে জয় হিন্দ। এর সঙ্গে আরও আছে কিছু আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও হুঁশিয়ারি।
দৈনিক আমাদের সময় ওইদিনের সংখ্যায় খবর প্রকাশ করেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাপোর্ট টু ডিজিটাল বাংলাদেশের (একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রাম) পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে তেজগাঁও থানায় জিডি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করার জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ইএমআইএল ইন্ডিয়ান হ্যাকার নামের একটি সংগঠনের নামে 'জয় হিন্দ'কে প্রাধান্য দিয়ে একটি বার্তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
ওই দিনের খবর অনুসারে, গত ৬ জানুয়ারি ২০১০ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধন করা ৬৪ জেলা বাতায়নের হ্যাক করা ১৯টি সাইটের মাঝে রংপুর ব্যতীত ১৮টি সাইটের পুনরুদ্ধার সম্পন্ন করা হয়। দৈনিক আমাদের সময় জানিয়েছে যে, রংপুরের সাইটটির বার্তা তদন্তের জন্য রাখা হয়েছে। ওইদিন যুগান্তর জানিয়েছিল যে, রাবের কমিউনিকেশন শাখার পরিচালকের মতে ওয়েবসাইটগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে হ্যাক করা হয়েছে। সেই দেশের একটি নাম্বার (সম্ভবত আইপি ঠিকানা) ব্যবহার করে বাংলাদেশের একটি সংগঠন হ্যাকিংয়ের এই কাজটি করেছে। তবে এর পরদিন ২২ মার্চ ২০১০ প্রকাশিত খবর অনুসারে সাইটগুলো হ্যাক করা হয়েছে ভিএসএনএল নামক ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের আইপি ঠিকানা থেকে। ভিএসএনএল একটি আইএসপি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। সুতরাং তাদের সেবাগ্রহণকারী কোন প্রতিষ্ঠানই এই কাজটি করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের পক্ষ থেকে প্রদত্ত এই তথ্য থেকে এটি স্পষ্ট যে কার্যত ভারত ভূখণ্ড থেকেই এই কাজটি হয়েছে। ফলে এটি নিশ্চিত যে সরকারের ওয়েবসাইটগুলোতে ভারত থেকেই হামলা করা হয়েছে। ভারতের পত্রিকাগুলোর মতে, ভারতের ভেতরেই বিগত আট বছরে তিন হাজারের বেশি ওয়েবসাইটে এমন বা এর চায়েও তীব্র হামলা হয়েছে।
ওয়েব সাইটে হ্যাকিং করা, মেইল ঠিকানা হ্যাকিং করা, ইন্টারনেটের অপব্যবহার করা, ভাইরাস ও স্প্যাম ছড়ানো এসব সাধারণ সাইবার ক্রাইমকে অনেক ক্ষেত্রেই নিরীহ ধরনের মনে করা হলেও এসব ক্ষেত্রেও অপরাধের সীমানা অর্থ-সংক্রান্ত বা জাতীয় নিরাপত্তা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ইংরেজীতে হ্যাকিং লিখে গুগলে অনুসন্ধান করলে এই বিষয়ে মজার মজার সব তথ্য পাওয়া যায়। হ্যাকিংয়ের বিপদ ও বেঁচে থাকার উপায়গুলো ছাড়াও এতে হ্যাকিং করার কৌশল। এমনকি হ্যাকিং বিষয়ে বইয়ের আকাল নেই। কেউ কেউ মনে করেন যে হ্যাকিং করার জন্য কেবল অসৎ উদ্দেশ্য থাকলেই হয় না_ভাল প্রোগ্রামারও হতে হয়। ইন্টারনেটে হাতে কলমে এসব কাজ করার উপায় বর্ণিত হয়ে থাকে।
এইসব তথ্য ও উপায় সহজলভ্য হওয়ার ফলে আজকের দুনিয়ায় বিশ্বের সব ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বা দেশই হ্যাকিং কবলিত। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে সাইবার নিরাপত্তা এখন প্রতিটি মানুষের জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এই অপরাধের কোন ভৌগোলিক সীমানা নেই সেহেতু বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ করা যায় না বা সীমান্ত পাহারা দিয়ে এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। বরং মেধাজাত অপরাধকে মেধা দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়।
১৯৬৪ সালে কম্পিউটার এবং ১৯৯৬ সালে অনলাইন ইন্টারনেট আসার পর বাংলাদেশে এর প্রসার খুব একটা হয়নি। মাত্র লাখ দশেক গ্রাহক নিয়েই আমরা অন্তত ১০ বছর অতিক্রম করেছি। তবে মোবাইলে ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর থেকে এই সংখ্যা অন্তত ষাট লাখের কাছাকাচি পৌঁছেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগান এই সংখ্যাকে আরও অনকে দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। বরং বলা যেতে পারে আগামীতে কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হবে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন গ্রাহক সংখ্যা না থাকায় বা দেশে হ্যাকারদের আধিপত্য তেমনভাবে বিস্তৃত না হওয়ায়, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত কম বিপদের মাঝেই অবস্থান করছে। এদেশে অনলাইন বা মোবাইল লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপক হওয়া সত্ত্বেও এই খাতে আর্থিক অপরাধের পরিমাণ তেমন নয়। তবে ইন্টারনেটের অধিবাসী হিসেবে ভাইরাস স্প্যাম ও মেইল-ওয়েব হ্যাকিং এখানে ঘটেছে। সাধারণ মানুষের অনেককেই এজন্য ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মোবাইলে মিস কল দেয়া বা উত্ত্যক্ত করা, ইন্টারনেটে পর্নো ছবি বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা নিয়মিতই ঘটে।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে নিরাপত্তা। আমাদের জীবনের প্রায় সব তথ্যই ডিজিটাল হওয়ার ফলে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় তথ্যের নিরাপত্তা বিধান করা দিনে দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। এসব প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় রেখে চারদলীয় জোট সরকার আইসিটি এ্যাক্ট ২০০৬ তৈরি করে। আইনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ডিজিটাল সিগনেচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। কিন্তু সেই সরকার বা তার পরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইনটির অধীনে ডিজিটাল সিগনেচার কর্তৃপক্ষ স্থাপন করতে পারেনি। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনটি সংশোধন করা হয় এবং ডিজিটাল সিগনেচার কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইনটির হয়ত আরও আপডেট দরকার। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে আইনটির কোন প্রয়োগ নেই। দেশে তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কোন আইনেরই কার্যত কোন প্রয়োগ নেই। মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত অনেকগুলো আইন শুধু প্রয়োগের অভাবে অকার্যকর রয়েছে।
এজন্য বিশেষ আদালত, বিশেষ তদন্ত দল ও কার্যকর টাস্কফোর্স থাকা উচিত। তবে সরকারী ওয়েবসাইট হ্যাক করার মতো অপরাধীর পেছনে কেবল আইনী কার্যক্রম যথেষ্ট নয়_বরং এজন্য অন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
আমরা যতটা জানি, যে ওয়েবসাইটগুলো হ্যাক করা হয়েছে সেগুলো ইউএনডিপির সহায়তাপ্রাপ্ত একসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পের মাধ্যমে করা হয়েছে। ওখানে ইউএনডিপির টাকায় বিশেষায়িত পরামর্শকরা রয়েছেন। তারা উচ্চ হারে বেতন পেয়ে থাকেন। জ্ঞান-বুদ্ধিতে তাদের তুলনা থাকার কথা নয়। সেইসব পরামর্শকরা রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ কাজকে কি অবহেলা করে তৈরি করেছিলেন_যার জন্য হ্যাকাররা খুব সহজেই হামলা করতে সক্ষম হয়। সংশ্লিষ্ট এক বিশেষজ্ঞের মতে, হ্যাকিংয়ের কাজটি তেমন উচ্চমার্গের ছিল না। বরং ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এমনকি তার মতে হ্যাকিং হওয়ার পরও ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি।
আমরা জানি, এর আগে র্যাবের ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়েছিল। র্যাব সেই হ্যাকারদের পাকড়াও করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দুদিন পরই হ্যাকাররা জামিনে বের হয় এবং আমাদের জানামতে হ্যাকিংয়ের জন্য কোন শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। আমাদের নিজের দেশের হ্যাকাররা ধরা পড়ার পর যদি তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়া যায় তবে ভারতের হ্যাকারদের ধরা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার কথা ভাবাই যায় না। আমাদের দেশের হ্যাকাররাও কম বিপজ্জনক নয়। আমার বিজয় সফটওয়্যারের পাইরেটেড সংস্করণ ইন্টারনেটে প্রদান করার ক্ষেত্রে এই হ্যাকাররা চরম পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছে। এই হ্যাকার ও পাইরেটদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে ইউএনডিপির নামও যুক্ত আছে। অভ্র নামক একটি পাইরেটেড বাংলা সফটওয়্যারকে নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ইউএনডিপির অবদান সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন সেলের ওয়েবসাইট হ্যাক হলে তার দায় থেকেও ইউএনডিপিকে ছাড় দেয়া যায় না।
এটি অবশ্য শুনতে ভাল লেগেছে যে র্যাবের হাতে হ্যাকারদের ধরা পড়ার মতোই এবারও সরকারের পক্ষ থেকে ওয়েবসাইটগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু খারাপ খবর হচ্ছে যে, হ্যাকার কবলিত হওয়ার পর পুনরুদ্ধারের চেয়ে হ্যাকারের হাত থেকে বেঁচে থাকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা বলে সেই সরকারের ওয়েবসাইট যদি নিরাপদ না থাকে তবে সরকারের ইমেজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর আগে আমরা সরকারের বিভিন্ন ওয়েব ঠিকানায় পর্নো তথ্যাদিসহ বিরক্তিকর উপাত্তসমূহ দেখেছি। সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বহীনতার উৎকট প্রকাশ ঘটেছে এইসব ঘটনায়। এজন্যই আমরা কামনা করব সরকারের যেসব ব্যক্তি এসব কাজের সঙ্গে জড়িত তারা যেন দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করেন। আমি বিশেষ করে উপদেষ্টাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব_তার যেন তাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখেন এবং তাদের অনুরোধ করব, তারা যেন মুক্ত সফটওয়্যারের নামে এমন কোন সফটওয়্যার দিয়ে ওয়েবসাইট তৈরি না করেন যাতে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা যায় না।
এটি অবশ্যই আনন্দের যে, গত ২৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের এক্সেস টু ইনফরমেশন সেল সাইবার নিরাপত্তা বিষয়টি নিয়ে একটি সভা করেছে এবং সভায় দুটি কমিটি করে বিষয়টির প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ৩ মার্চ ২০১০ সকালে ঢাকা শেরাটন হোটেলে অনুষ্ঠিত বিসিএস ডিজিটাল এক্সপো ২০১০-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কামনা করি, বিষয়টি এমন হবে যে, আমাদের ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধ বা হ্যাকিং নিয়ে কোন সঙ্কটের মুখোমুখি পড়তে হবে না।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রণেতা ই-মেইল: mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net
ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০১০