মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
শুক্রবার, ২৯ জুন ২০১২, ১৫ আষাঢ় ১৪১৯
স্বপ্নভঙ্গ পর্তুগালের, রেকর্ড শিরোপা থেকে এক জয় দূরে দেল বস্ক বাহিনী
স্পেন ০ (৪)- ০ (২) পর্তুগাল
টাইব্রেকার ভাগ্যে ফাইনালে স্পেন
জাহিদুল আলম জয় ॥ অপলক দাঁড়িয়ে রইলেন ঠায়। চোখেমুখে রাজ্যের হতাশা। হয়ত ভাবছিলেন, কেন যে আগেই শট নিলাম না! বুধবার রাতে ইউক্রেনের দোনেস্কের দোনবাস এ্যারানায় এমন আফসোসেই পুড়তে হয়েছে বিশ্বখ্যাত পর্তুগীজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। কারণ স্পেনের বিরুদ্ধে চলমান ইউরোর প্রথম সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় তাঁর দল পর্তুগাল। ফলশ্রুতিতে টানা তিনটি বড় আসরের ফাইনাল মঞ্চে পৌঁছে যায় বর্তমান বিশ্ব ও ইউরো শিরোপাধারী স্পেন। এর আগে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। টাইব্রেকারে হারের পর সাবেক ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার রোনাল্ডো যেন নিথর হয়ে যান। কষ্টটা আরও বেড়ে যায় নিজে শট নেয়ার আগেই দলের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ায়। সতীর্থদের ব্যর্থতায় তাই ম্যাচে তুলনামূলক ভাল খেলেও সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয় ২০০৪ আসরের রানার্সআপদের। আগামী ১ জুলাই স্পেন ফাইনাল খেলবে গত রাতে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে জার্মানি ও ইতালির মধ্যকার বিজয়ী দলের বিরুদ্ধে।
১২০ মিনিটে ফলাফল নিষ্পত্তি না হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন জিততে চলেছে স্পেনই। গোলপোস্টে ইকার ক্যাসিয়াসের মতো বিশ্বস্ত প্রহরী থাকার কারণেই এমন আত্মবিশ্বাসী ভাবনা! অবশেষে সবার ধারণাটাই সত্যি হয়েছে। টাইব্রেকারের প্রথম শট নিয়েছিলেন স্পেনের জাভি এ্যালানসো। কোয়ার্টার ফাইনালে জোড়া গোল করা এ্যালানসো শট নেয়ার আগে আগে রোনাল্ডো তার গোলরক্ষক রুই প্যাট্রিসিয়োর কানে কানে কী যেন বললেন। এরপরই বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে এ্যালানসোর শট রুখে দেন পর্তুগীজ গোলরক্ষক। টিভি দর্শকরা দেখলেন, রোনাল্ডোর মন্ত্র কি কাজেই না দিল! কিন্তু পর্তুগাল এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট করে জোয়াও মওতিনহো গোল করতে ব্যর্থ হলে। তাঁর শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অসাধারণ দক্ষতায় প্রতিহত করেন স্পেন গোলরক্ষক ক্যাসিয়াস। এরপর স্পেন ও পর্তুগাল দু’দলই তাদের পরের দুটি শট থেকে গোল করে। ২-২ গোলে সমতা থাকাবস্থায় নিজেদের চতুর্থ শটে গোল করেন স্পেনের সার্জিও রামোস। স্পেন এগিয়ে যায় ৩-২ গোলে। এরপর পর্তুগালের ব্রুনো আলভেস দলের হয়ে চতুর্থ শট নিতে আসেন। তার জোরালো শট বারপোস্টের ভেতরের দিকে লেগে ফিরে আসে। এমতাবস্থায় স্পেনের হয়ে পঞ্চম শটটি নেন বদলি ফুটবলার চেস ফেব্রিগাস। গোল হলেই ফাইনাল, এমন প্রেক্ষাপটে ফেব্রিগাসের শট বাঁ দিকের পোস্টে লেগে জালে প্রবেশ করতেই বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে ফেটে পড়েন স্প্যানিশ ফুটবলাররা। আর হতাশায় নুয়ে পড়েন পর্তুগীজ ফুটবলাররা। ইনিয়েস্তা, পিকে, রামোসদের উল্লাস যেন বুকে কাঁটা হয়ে বিঁধছিল রোনাল্ডোর। কারণ ম্যাচের খলনায়ক বলতে গেলে তাকেই বলতে হবে! পুরো ম্যাচে দুর্দান্ত খেললেও গোল করতে ব্যর্থ হন। ৯০ মিনিটে গোলরক্ষককে একা পেয়েও অবিশ্বাস্যভাবে বাইরে মারেন। টাইব্রেকারে শুরুর দিকে শট না নেয়ায় সুযোগই হয়নি। সব মিলিয়ে আফসোস আর হতাশার রাতই গেছে রিয়াল মাদ্রিদ তারকার।
ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেনকে চেপে ধরে পর্তুগাল। দ্বিতীয় মিনিটেই দু’টি কর্নার আদায় করে নেয় পাওলো বেন্টোর শিষ্যরা। নবম মিনিটে ম্যাচের প্রথম সুযোগ পায় স্পেন। নেগ্রেদোর কাছ থেকে বল পান আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। কয়েকজনকে কাটিয়ে তিনি বল দেন আরবেলয়াকে। কিন্তু এই ডিফেন্ডারের জোরালো শট বারপোস্ট ছুঁয়ে যায়। এক মিনিট পর ইনিয়েস্তার শটও পোস্টের ওপর দিয়ে যায়। ১৩ মিনিটে নিজেদের প্রথম আক্রমণেই গোল পেতে যাচ্ছিল পর্তুগাল। মাঝ মাঠ থেকে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ঢুকে পড়েন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। তার বিপজ্জনক ক্রসে ন্যানির মাথা ছোঁয়ার আগেই বল লুফে নেন ক্যাসিয়াস। ১৬ মিনিটে দুরন্ত রোনাল্ডোকে ফাউল করলে বক্সের বাইরে ফ্রিকিক পায় পর্তুগাল। ২৯ মিনিটে স্পেনের একটি সম্মিলিত আক্রমণের বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে মারেন ইনিয়েস্তা। ৩১ মিনিটে প্রায় গোল পেয়েই যাচ্ছিল ইউরোপের ব্রাজিলরা। স্প্যানিশ ডিফেন্ডারের ভুলে বল পান মওতিনহো। তার কাছ থেকে পেরেইরা হয়ে বল পান রোনাল্ডো। সুদর্শন এই তারকার বাঁ পায়ের বুলেট শট সাইডপোস্ট কাঁপিয়ে বাইরে যায়। প্রথমার্ধে আর তেমন জোরালো আক্রমণ না হলেও প্রাধান্য বজায় রেখে খেলে পর্তুগাল। বিরতির পর ২০ মিনিট দু’দলই ম্যাড়মেড়ে ফুটবল খেলতে থাকে। এ সময় খেলায় যেন কোন প্রাণই ছিল না! এই ফাঁকে ৫৪ মিনিটে আলভেরো নেগ্রেদোর বদলে ফেব্রিগাস এবং ৬০ মিনিটে ডেভিড সিলভার বলে জেসাস নাভাসকে মাঠে নামান স্পেন কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক। ৬৮ মিনিটে বিরতির পর প্রথম আক্রমণে যায় স্পেন। জাভির শট সরাসরি গোলরক্ষকের হাতে যায়। একই মিনিটে পাল্টাআক্রমণ থেকে হুগো আলমেইদার শট বারের ওপর দিয়ে গেলে গোলবঞ্চিত হয় পর্তুগাল। ৭৩ মিনিটে আরেকবার রোনাল্ডোর শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তার ফ্রিকিক বারপোস্ট কাঁপিয়ে যায়। ৮৪ মিনিটে আরেকটি ফ্রিকিক থেকেও গোল করতে ব্যর্থ হন পর্তুগাল অধিনায়ক। নির্ধারিত সময়ের অন্তিম মুহূর্তে (৯০ মিনিট) ম্যাচের সবচেয়ে সেরা সুযোগ নষ্ট করেন রোনাল্ডো। জাবি আলোনসোর দুর্বল ফ্রিকিকের বল ধরে কাউন্টার আক্রমণে আসে পর্তুগাল। মেইরেলেসের ঠেলে দেয়া বল স্পেনের ডিবক্সের মধ্যে পেয়ে যান রোনাল্ডো। সামনে শুধু ক্যাসিয়াস। কিন্তু রোনাল্ডোর নেয়া শট অবিশ্বাস্যভাবে ক্রসবারের ওপর দিয়ে গেলে নিশ্চিত গোলবঞ্চিত হয় পর্তুগাল। এরপর কোন গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় বাড়তি ৩০ মিনিটে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে যেমন দাপট ছিল পর্তুগালের, তেমনি অতিরিক্ত সময়ে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করে খেলে স্পেন। এ সময়ে বেশ কয়েকটি সহজ গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেন ইনিয়েস্তা, পেদ্রোরা। ১০৪ মিনিটে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে দলকে বাঁচান পর্তুগাল গোলরক্ষক রুই প্যাট্রিসিয়ো। পেদ্রোর কাছ থেকে গোলমুখে বল পেয়ে যান ইনিয়েস্তা। কিন্তু তার ভলি আটকে দেন পর্তুগাল গোলরক্ষক। দুই মিনিট পর রামোসের শট পোস্ট কাঁপিয়ে যায়। ১১১ মিনিটে আবারও পর্তুগালকে বাঁচান গোলরক্ষক। ১১৪ মিনিটে ফাঁকায় বল পেয়েছিলেন পেদ্রো রদ্রিগুয়েজ। কিন্তু শট নিতে বিলম্ব করায় তা ক্লিয়ার করেন পর্তুগীজ ডিফেন্ডার। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ শেষ হয় গোলশূন্যভাবে। টানা তিনটি বড় আসরে ফাইনালে পৌঁছতে পেরে ভীষণ খুশি স্প্যানিশ শিবির। এখন তাদের লক্ষ্য ঐতিহাসিক ‘ট্রেবল’ জয়। ইউরো-বিশ্বকাপ-ইউরো জয়ের গৌরবময় রেকর্ড গড়তে আর মাত্র এক জয় দূরে স্পেন। দলের কোচ ভিসেন্তে দেল বস্ক বলেন, এটা ছিল কঠিন একটা ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত জিততে পেরে আমরা খুশি। বিশেষ করে অতিরিক্ত সময়ে দল দুর্দান্ত খেলেছে। তাঁর শটেই স্পেনের আরেকটি ফাইনাল নিশ্চিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই খুশি চেস ফেব্রিগাস। তিনি বলেন, আমি খুব খুশি আরেকবার ফাইনালে পাড়ি জমানোয়। ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত আমরা। টাইব্রেকারে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও পর্তুগালের পারফরমেন্সের ভূয়সী প্রশংসা করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। রোনাল্ডো, ন্যানিদের পারফরমেন্সে তারা গর্বিত বলেও সংবাদ চাউর হচ্ছে। স্বয়ং রোনাল্ডো, ন্যানি বলেছেন, তাঁদের পারফরমেন্সে তাঁরা গর্বিত। পর্তুগালের কোচ পাওলো বেন্টো যেমন বলেছেন, আমরা মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছি।