মানুষ মানুষের জন্য
শোক সংবাদ
পুরাতন সংখ্যা
রবিবার, ২৫ মার্চ ২০১২, ১১ চৈত্র ১৪১৮
‘সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার’
অভিমত মুশফিক, শাকিব ও মাশরাফির
স্পোর্টস রিপোর্টার ॥ বিশ্ব ক্রিকেটে এখন একটিই নাম ঘুরছে, ‘বাংলাদেশ।’ সবার মুখে একটি দলকে নিয়েই প্রশংসা, সেটিও ‘বাংলাদেশ।’ যেখানে ক্রিকেট নিয়ে কথা উঠছে, সেখানেই একটি নাম সবার আগে উচ্চারণ হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ।’ বিশ্ব ক্রিকেটের গ্রেট সব ক্রিকেটার-ভারতের সুনীল গাভাস্কার, পাকিস্তানের জাভেদ মিয়াদাদ, শ্রীলঙ্কার অর্জুনা রানাতুঙ্গা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্রায়ান লারা থেকে শুরু করে আরও অনেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছেন। ১১ থেকে ২২ মার্চÑ এই ১২টি দিন বাংলাদেশ ক্রিকেটই বদলে গেল। বাংলাদেশ ক্রিকেটকে নিয়েই শুধু আলোচনা হলো। যা এখনও চলছেই। আর এই চলমান হাওয়ায় ভেসে যেতে রাজি নন দলের ক্রিকেটাররা। তাদের সবার মুখে কোন না কোনভাবে এখন একবাক্য ঝরছে, ‘এবার আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। ঐক্যবদ্ধ হয়ে আরও কঠিন পথ পাড়ি দেয়ার পালা। যে পথে হাজারো বাধা আসবে। কিন্তু কাঁটা বিছানো পথগুলোকে পাশ কাটিয়ে সবাই মিলে সেই পথে সহজভাবেই হাঁটতে হবে।’
একাদশ এশিয়া কাপের দলে ছিলেন ১৫ জন ক্রিকেটার। দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তারা এবং দেশকে এবার এমন সম্মান এনে দেন, যা কোনদিন ভোলার নয়। ফাইনালে আফসোস দেখা দিয়েছে। তবে সেই আফসোস কাটিয়ে এখন শান্তির পায়রাই উড়ছে। দল যে চাহিদার চেয়েও অনেক বেশি সবাইকে দিয়েছে সেটি নিয়েই এখন আলোচনা হচ্ছে, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে যে বসে থাকলে চলবে না, তা সবারই বোধগম্য হয়েছে। সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার। আর সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে সবাই অভিনন্দনই কুড়াচ্ছেন। সঙ্গে সবার দোয়াও দলের সঙ্গেই আছে। সবার এখন একটাই আকুতি দল যেন আর পিছু না হটে। যে সাহস কুড়িয়েছে তা দিয়ে যেন বিশ্বক্রিকেটের যে কোন দলকেই অনায়াসে হারিয়ে দেয় দল সেটিই প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা পূরণ করবে দল সেই আশার বাণী বাংলাদেশ অলরাউন্ডার এবং এবার এশিয়া কাপে ৪ ম্যাচে ৫৯.২৫ গড়ে ২৩৭ রান ও ৬ উইকেট নিয়ে ‘ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট’ হওয়া শাকিব আল হাসান দেখাচ্ছেন, ‘এশিয়া কাপে অনেক ভাল খেলেছি আমরা। যে সাফল্য পেয়েছি তা আমাদের সামনের পথ পাড়ি দিতে সহযোগিতা করবে। এখন দলের মানসিক ভীত অনেক মজবুত। আশা করছি আগামীতে আমরা আরও ভাল খেলতে পারব।’ বৃহস্পতিবার ফাইনাল ম্যাচটি হয়েছে। শেষ বলে বাংলাদেশের জিততে ৩ রানের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ১ রান নিতে পারায় আর জেতা হয়নি। এমন ম্যাচে আসলে শেষ মুহূর্তে উমর গুলের বলে একেধারে কয়েকটি বাউন্ডারি হাঁকিয়েই খেলায় উত্তেজনা এনে দেন বাংলাদেশ পেসার মাশরাফি বিন মর্তুজা। যিনি এবার ইনজুরি কাটিয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেই নিজের জৌলুস বজায় রেখেছেন। শুক্রবার দলের ক্রিকেটাররা হোটেল ছেড়ে দেয়। বাসায় যাওয়ার পথ ধরার আগে মাশরাফি দলের এমন অর্জনের পরের অবস্থার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আফসোস জড়িয়ে ধরেছে যেন। ২টি রানের জন্য আমরা এশিয়া কাপ জিততে পারলাম না। তবে এই হারের পর আফসোস অনেক বেশি আছে। তাই বলে এ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এখান থেকে অর্জিত সাফল্যকে পুঁজি করেই সামনের পথ পাড়ি দিতে হবে। যে ভুলগুলো হয়েছে তা শুধরে নিয়ে নতুন পথে চলতে হবে। পথ জয় করা কঠিন হবে। তবে যে বিশ্বাস, মানসিকতা এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে গড়া হয়েছে তা দিয়ে পথ সহজ করে তোলা যাবে। সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে এখন এগিয়ে গেলেই হবে।’ মুশফিকুর রহীমকে ভাগ্যবান অধিনায়ক বলা যায়। এমন সময়ে দলের সব ক্রিকেটাররা জ্বলে ওঠা শুরু করলেন যখন তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নও দেখেছে! অথচ শুরুতে দলটিকে নিয়ে এমন আশা কেউ করেনি। মুশফিকের দল সেই বিশ্বাস জন্মে দিয়েছে। ভারতের পর শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালে খেলেছে। এবং ফাইনালে পাকিস্তানেরও বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। ম্যাচে হার হয়েছে ঠিক। তবে আসল চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশই। তা স্বীকার করেছেন পাকিস্তান অধিনায়ক মিসবাহ উল হকও। এর আগে বাংলাদেশ এত বড় টুর্নামেন্টে কখনই ফাইনালে খেলতে পারেনি। এর আগে একবার শুধু ত্রিদেশীয় একটি টুর্নামেন্টে দল শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে খেলতে পেরেছে। সেটিও ছিল বাংলাদেশের মাটিতেই। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুইয়ে টুর্নামেন্টটিতে খেলে। জিম্বাবুইয়ের কাছে হারের পর লঙ্কানদের হারিয়েই ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত ফাইনালেও জয়ের আশা জাগিয়েও পারা যায়নি। হার-জিতের ব্যবধান তখন ছিল ২ উইকেটের। মোহাম্মদ আশরাফুলের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ১৫২ রান করতে ৪৮.১ ওভার খেলতে হয়েছিল শ্রীলঙ্কাকে। ১৫৩ রান করার আগেই ৮ উইকেট হারিয়েছিল! এবারও যখন পাকিস্তানের ২৩৬ রান অতিক্রম করতে জয়ের একেবারে কাছাকাছি চলে যায় টাইগাররা, ২ রানের হারই নিয়তিতে জমা হলো। কান্নায় ভিজে গেল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম। সেই কান্না কিছুক্ষণ পরই শক্তিতে পরিণত হলো। যখন মুশফিক ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী পর্বে বললেন, ‘এখন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা। এই অর্জন দিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। নতুন পথ শুরু হল।’ সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামের গ্যালারি আবার উত্তাল হলো। করতালি শুরু হয়ে গেল। যেন নতুন জীবন মিলল। মুশফিক হোটেল ছাড়ার আগেও একই কথা বলেছেন, ‘আমরা এশিয়া কাপে অসাধারণ খেলেছি। ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো দলকে হারিয়ে দিয়েছি। পাকিস্তানকেও হারানোর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত হয়নি। আফসোস স্বাভাবিকভাবেই তখন ছিল এবং চোখের জলও পড়েছে। ধরে রাখতে পারিনি। তবে এখন মনে অনেক বেশি বিশ্বাস জন্মেছে আমরা পারব। নতুন পথ শুরু হয়েছে। যে পথে এগিয়ে যেতে হবে। সবাইকে একত্রে থেকে নতুন পথ যতই কঠিন হোক, সহজ করে তুলতে হবে। আরও ভাল খেলা খেলতে হবে। আশা করি আমরা পারব।’
বাংলাদেশের প্রতিটি বড় অর্জনই নতুন পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছে। তবে এবার যে দল এত বড় সাফল্য দেখিয়েছে সেটি নতুন সূর্যদয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। এই পথ এখন পাড়ি দিতে হবে। যে পথে বাংলাদেশকে নিয়ে আরও বেশি আশা যুক্ত হয়েছে। যে আশা ক্রিকেটাররাও পূরণ করতে চান। আর তাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সবাই এক সুরে বলছেনও, ‘এবার আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পালা।’