১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

জয় বাংলা মানে বাংলা ভাষার জয়

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • রায়হান আহমেদ তপাদার

মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়। মানুষ মাত্রই মাতৃভাষাকে ভালবাসে। আর তাই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাঙালীকে বুকের তাজা রক্ত দিতে হয়েছে। যে ভাষায় মনের সুখ-দুঃখ প্রকাশিত হয়, আবেগ-অনুরাগ ব্যক্ত হয়, দ্রোহে-সংগ্রামে মানুষ যে ভাষার স্লোগান মুখে রাজপথের মিছিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে ভাষা মানুষ ভাল না বেসে পারে না। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষাও। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে যাদের মাতৃভাষা, একই সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা নয়। মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে যারা পায় নিঃসন্দেহে সে জাতি ভাগ্যবান জাতি, সেই বিচারে বাঙালী সৌভাগ্যবান। কেননা বাঙালীর ‘মাতৃভাষা’ আর রাষ্ট্রভাষা’ দুটোই বাংলা। আমাদের ভাষা বেঁচে থাকে আমাদের লেখায়, কথায় ও পড়ায়। আর আমরা বেঁচে থাকি আমাদের ভাষায়। আমরা বড় সৌভাগ্যবান আমাদের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। ‘বিনা স্বদেশী ভাষা মেটে কি আশা?’ আমার দুঃখিনী বর্ণমালা অনেক বন্ধুর পথ বেয়ে আজ উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। ১৯৪৮-এর এক সকালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ছাত্ররা প্রতিবাদ করে। সেই থেকে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। আর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে আরেকজন মহানায়কের নামও যুক্ত হলো। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, আমাদের বঙ্গবন্ধু। তাকে আমরা জাতির জনক হিসেবে জানি; কিন্তু অনেকেই হয়ত জানেন না তিনি ভাষাসৈনিক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমি বাঙালী, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া; এই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তরুণ ছাত্র শেখ মুজিব ছিলেন ভাষা আন্দোলনের একজন কর্মী ও সংগঠক। তার ভাষার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গঠিত তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দিয়ে। আবার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মকাণ্ডে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বাংলা ভাষার দাবির সপক্ষে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচীতে যুক্ত থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজও করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরপরই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম ও সার্থক গণআন্দোলন হলো ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই চার বছরের ভাষা আন্দোলনে রক্তক্ষয়ী পরিণতির মধ্য দিয়ে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার মানুষের ভাষার অধিকার স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনে আরও অনেকের সঙ্গে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ২৮ বছরের তরুণ, উদ্দীপ্ত ছাত্রনেতা। এই সময় তিনি কেবল ভাষার অধিকার নয় পূর্ববাংলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা আন্দোলন ও জনমত তৈরিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ছুটে বেরিয়েছেন। তিনি কোন একক আন্দোলন নিয়ে থাকেননি, সকল ন্যায়সঙ্গত ও পূর্ববাংলার মানুষের অধিকারসংশ্লিষ্ট সব ধরনের আন্দোলনে সক্রিয় এবং নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখেন। যার ধারাবাহিকতায় এই তরুণ ছাত্রনেতার বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই পরবর্তীকালে (১৯৭১ সালে) রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সূর্য উদিত হয়। দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর ব্যাপারে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর দেয়া বক্তৃতা, সাক্ষাতকার এবং রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনায় তিনি সর্বস্তরে বাংলা চালুর এই পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমিতে শহীদ দিবস (ভাষা শহীদ দিবস) উপলক্ষে আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনী বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর ব্যাপারে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরেন। স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এটি কোন ছুটির দিন ছিল না। তবুও সেদিন বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শুনতে প্রখ্যাত লেখক, কবি, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমৃত্যু বাংলা ভাষার একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান প্রণীত হয়। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বাংলা ভাষায় প্রণীত সংবিধান। যে সংবিধানে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে যে ঐতিহাসিক ভূমিকা তিনি পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমান অফিসের কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনে সরকারী প্রজ্ঞাপন জারি করেন। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জারিকৃত এক আদেশে বলা হয়, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা।’

অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, লক্ষ্য করছি যে, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও অধিকাংশ অফিস, আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজী ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। বাংলা ভাষা আজ দেশের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নবেম্বর UNESCO একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে। আজ পৃথিবীর সব রাষ্ট্র শুধু দিবসটি পালন করছে তা নয়, বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মাতৃভাষার জন্য বাঙালীর ঐতিহাসিক আত্মত্যাগকে। বঙ্গবন্ধুর সাহসী নেতৃত্বে মাতৃভাষার জন্য সেদিন যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, সে চেতনায় ধাবিত হয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস যতকাল লেখা হবে, পড়া হবে, বলা হবে ততকাল বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে বার বার ফিরে ফিরে আসবেন। মহান একুশের ৬৮তম বার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা নিরন্তর। বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর অন্যতম সংগ্রামী রাজনৈতিক নেতা। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ শুধু স্বাধীনতাই অর্জন করেনি বাংলা ভাষাও সম্মানিত হয়েছিল। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু বাংলা ভাষার প্রতি তিনি যে মমত্ব ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন তা আমাদের জন্য অনুসরণীয়। বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধিতে প্রত্যেকটি বাঙালী সাধ্যমতো আত্মনিয়োগ করুক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের শুভ মুহূর্তে এটাই আমাদের অঙ্গীকার হোক। পৃথিবীর দেশবরেণ্য নেতারা স্বদেশের ভাষাপ্রীতি দেখে বিস্মিত হয়েছেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিনন্দিত করেছেন।

এর বহু আগেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালে চীনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ তিন বছর পরও বাংলাদেশের বাঙালী কর্মচারীরা ইংরেজী ভাষায় নথি লিখবেন, সেটা অসহনীয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার বাস্তবায়ন চাইতেন। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে এম আর মাহবুব রচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। বাংলা, বাঙালী আর বাংলাদেশ- এই তিন ছিল বঙ্গবন্ধুর চির আরাধ্য। তিনি তার পুরোটা জীবন কাজকর্মে, চিন্তাভাবনায় এর প্রমাণ রেখে গেছেন। বিশ্বের বুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে নোবেল পেয়ে বাংলা ভাষাকে প্রথমবারের মতো মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন আর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে এক গৌরবের আসনে বসিয়ে দেন। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান যে কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বিস্তারিতভাবে এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। যারা বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তারা গ্রন্থটি পড়তে পারেন। বঙ্গবন্ধুর স্লোগান ছিল জয় বাংলা। তিনি তার প্রতিটি বক্তব্যে জয় বাংলা বলতেন। স্বাধীনতাকামী প্রতিটি মানুষের সেøাগান ছিল জয় বাংলা। এই জয় বাংলা মানে হলো বাংলাদেশের জয় হোক, জয় বাংলা মানে হলো বাংলা ভাষার জয় হোক, বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জয় হোক।

লেখক : সাহিত্যসেবী

[email protected]

প্রকাশিত : ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৫/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: