২৭ জানুয়ারী ২০২০, ১৪ মাঘ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

রাখাইনে গণহত্যা নিয়ে সুচির মিথ্যাচার

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯
রাখাইনে গণহত্যা নিয়ে সুচির মিথ্যাচার
  • গণহত্যার অভিযোগ ‘তথ্যবিভ্রাট’, সেনা অভিযান মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়

মোয়াজ্জেমুল হক/তানিয়া হক ভূঁইয়া/এইচএম এরশাদ ॥ হেগে গণহত্যার অভিযোগ মাথায় নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর এনএলডি নেত্রী আউং সান সুচি (৭৪) সেদেশের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যার কোন ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, রাখাইনে সেনা অভিযানে নয় বরং সশস্ত্র সংঘাতের শিকার হয়ে কিছু লোকজন বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনে যা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সে ঘটনাকে গণহত্যা বলা যায় কিনা প্রশ্ন রাখেন। তিনি বলেন, সংঘাত হয়েছে এবং হচ্ছে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে। সংখ্যালঘু মুসলমানরা এ সংঘাতের অংশ নয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও সনদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে আদালতকে সহায়তা দেবে মিয়ানমার। খবর গার্ডিয়ান, রয়টার্স, এএফপি, সিএনএন ও আলজাজিরার।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সেনা অভিযান চালানো হয়েছে তাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে দাবি করেছেন সুচি। রাখাইনে সেনা অভিযানে যা ঘটেছে, গণহত্যার সংজ্ঞার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ কিনা, সেই প্রশ্ন তুলে মিয়ানমারের নেত্রী বলেছেন, জাতিসংঘের আদালতে গাম্বিয়ার করা মামলা ‘ভুল দিক’ নির্দেশ করছে। বুধবার নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইজেসি) গাম্বিয়ার দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানির দ্বিতীয় দিনে এসব কথা বলেন তিনি। ১৭ বিচারকের বেঞ্চের সামনে আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দিতে উঠে সুচি রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। রাখাইন রাজ্যের বাস্তব পরিস্থিতির চিত্র ‘অসম্পূর্ণ ও তথ্যবিভ্রাট’ বলে অভিহিত করেছেন। সেনা অভিযানের পেছনে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহিংসতাকে দায়ী করেন। ওই ঘটনায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী শুধু প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে মাত্র। সহিংস ঘটনাটি হচ্ছে সীমান্ত এলাকায় অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী কর্মকা-। আদালতে রাখাইনের মানচিত্রের ছবি তুলে ধরে সুচি ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন অভিযানকে তিনি বারবার ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ উল্লেখ করে বলেন, স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী সে সময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এর বেশি কিছু নয়। ওই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল শুধু সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবেলা করা। কোন জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় এর লক্ষ্য ছিল না। তবে ওই অভিযানের ফলে রাখাইনের বহু মানুষ যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং তারা যে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে সে কথা স্বীকার করে সুচি বলেন, যদি কোন সেনাসদস্য নিয়ম ভেঙ্গে থাকে, তাহলে সামরিক আদালতে তার বিচার হতে পারে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় আন্তর্জাতিক আদালতে এনে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

রাখাইন বা অন্য কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোন ঘটনা মিয়ানমার প্রশ্রয় দেবে না দাবি করে দেশটির নেত্রী বলেন, তার সরকার রাখাইনের সব পক্ষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিকর। রাখাইনের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বিষয়েও মিয়ানমার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কোন হস্তক্ষেপ হলে তা মিয়ানমারে শান্তি ও বাস্তুচ্যুতদের ফেরার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। রোহিঙ্গাদের ‘ভোগান্তি’র বিষয়টি স্বীকার করে সুচি তার বক্তব্যে আরও বলেন, ওই সময় রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ছিল ‘জটিল’। যে কারণে অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। তবে গাম্বিয়ার গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, গাম্বিয়া রাখাইনের বাস্তব পরিস্থিতির ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ চিত্র তুলে ধরেছে। সেনা অভিযানের ক্ষেত্রে ‘গণহত্যার উদ্দেশ্য’ একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে না। যেখানে রাষ্ট্র এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষভাবে তদন্ত চালাচ্ছে, দোষী সেনা কর্মকর্তাদের বিচার ও শাস্তি দিচ্ছে, তা কী করে গণহত্যার উদ্দেশ্যে হতে পারে? যদিও এখন পর্যন্ত শুধু দোষী সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, এ ব্যাপারে পরবর্তীতে দোষী বেসামরিক নাগরিকদেরও বিচার করা হবে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে আরসা বাংলাদেশের সীমান্তের নিকটবর্তী থানায় হামলা চালিয়েছিল তখন শুরু হয়েছিল সহিংসতার একটি প্রাথমিক পর্ব। এর ফলে ৯ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও শতাধিক বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার পাশাপাশি ৬৮ অস্ত্র ও কয়েক হাজার রাউন্ড গোলাবারুদ চুরি হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরসা ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মংডু শহর দখলের লক্ষ্যে হামলা করে চালায়। যার প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালায়। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ‘গণহত্যার উদ্দেশ্য’ একমাত্র অনুমান হতে পারে না উল্লেখ করে সুচি বলেন, যদি দেশের অভ্যন্তরে গণহত্যার উদ্দেশ্যে এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটে তবে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে জড়িত সেনা সদস্য, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এর বাইরে আমি এ বিষয়েও নিশ্চিত করছি যে, আমাদের সবার নজর সেনা সদস্যদের দিকে। একইসঙ্গে অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধেও উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আদালতে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করেই সুচি বলেন, রাখাইনে সেনা অভিযানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ হয়ত উড়িয়ে দেয়া যায় না, তবে তার পেছনে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল- এমন ধরে নেয়াটাও মিয়ানমারের জটিল বাস্তবতায় ‘ঠিক হবে না’। এ বিষয়ে মিয়ানমার এতদিন যা বলে আসছে, সেই একই কথা আইসিজের বিচারক প্যানেলের সামনে নতুন করে বলেন সুচি। সুচি তার বক্তব্যের শুরুতে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদগুলোর বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে আদালত সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন। এদিকে আদালতে রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকারের কারণে এরই মাঝে বিশ্বব্যাপী সুচির সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে ৬ রোহিঙ্গা

নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের মামলায় সাক্ষ্য দিতে বাংলাদেশ থেকে ৬ রোহিঙ্গাকে নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন মহিলা ও ২ জন পুরুষ রয়েছেন। পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হকের নেতৃত্বে যে ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দল আন্তর্জাতিক এ আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে গেছেন এ ৬ রোহিঙ্গা তাদের অন্তর্ভুক্ত। কুতুপালং রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের রোহিঙ্গা কমিটির চেয়ারম্যান মোঃ নুর জানিয়েছেন, উখিয়ার লম্বাশিয়া শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা মোঃ ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে এ ছয় রোহিঙ্গা গণহত্যার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার কথা রয়েছে।

মিয়ানমার প্রতিনিধি দলে ১ রোহিঙ্গা

অপরদিকে আন্তর্জাতিক এ আদালতে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলে আকতার চৌধুরী নামে এক রোহিঙ্গা নেতা রয়েছেন। এ আকতার চৌধুরী এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে গোপনে পালিয়ে মিয়ানমারে চলে যায়। অভিযোগ রয়েছে, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে তার একটি সমঝোতা হয়েছে। এ আকতার চৌধুরী উখিয়া টেকনাফের কোন ক্যাম্পে ছিলেন না। তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থিত কোনার পাড়ায়। সেখান থেকে মিয়ানমার উত্তরাঞ্চল মংডু টাউনশীপে তিনি চলে যান সে দেশের সরকারী সহযোগিতায়। এ আকতার চৌধুরীকে নিয়ে মিয়ানমার প্রচার চালিয়েছে তিনি স্বেচ্ছায় চলে গেছেন। রোহিঙ্গাদের ওপর কোন প্রকার হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়নি বলে সাক্ষ্য দিতে আউং সান সুচি তাকে আইসিজিতে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন।

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিস্থিতি

রোহিঙ্গাদের গণহত্যার অভিযোগ এনে গাম্বিয়ার পক্ষে দায়েরকৃত মামলায় আন্তর্জাতিক আদালত আইসিজিতে শুনানির কার্যক্রমের দ্বিতীয় দিনে মিয়ানমার নেত্রী আউং সান সুচির মিথ্যাচারে ক্ষুব্ধ ৩২ আশ্রয় শিবিরে অবস্থানরত লাখ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। তাদের অনেকেই বলেছেন, সুচি যতই চালাকি করুক, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার ঘটনায় তিনি পার পাবেন না। রোহিঙ্গা নেতারা বলেছেন, ৭৩ বছর বয়সী আউং সান সুচি মিয়ানমারের সামরিক শাসনের অবসান ঘটাতে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে প্রায় ২২ বছরের ভেতর বেশিরভাগ সময় গৃহবন্দী ছিলেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় মিয়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বছরের পর বছর তিনি গৃহবন্দীর জীবন কাটিয়েছেন। এ কারণে মিয়ানমারের বাসিন্দা রোহিঙ্গারা অন্ধ বিশ^াসে সুচির দলকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে একচেটিয়াভাবে ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন সুচির দল এনএলডি। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় তিনি নীরব ভূমিকা পালন করেন। গণহত্যার শিকার অনেককে গণকবর দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের গণহত্যার অপরাধে আসামি হয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে হাজির হতে সুচি বাধ্য হয়েছেন।

প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

১২/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: