১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৯
  • লবণ নিয়ে ইন্ধনদাতাদেরও রেহাই নেই

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ফেসবুকের মাধ্যমেই সারাদেশে পেঁয়াজের পর খাবার লবণ নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে। যারা ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে, ইতোমধ্যেই তাদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। যারা ফেসবুকে লবণ নিয়ে গুজব ছড়াতে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন তাদেরও শনাক্ত করার কাজ চলছে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে সারাদেশে সাঁড়াশি অভিযান চলছে। এমনকি গুজবের পর লবণ মজুদ বা বিক্রি না করার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। পুলিশের তরফ থেকে তাদের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এমন গুজবে কান না দেয়ার জন্য সতর্ক বাণী দেয়া হয়েছে। কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করতেই এমন গুজব ছড়ানো হয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ইতোপূর্বে পেঁয়াজ নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়। সেই গুজব কাজেও লাগায় গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতরা। তারা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেয়। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। যেকোন সময় তাদের গ্রেফতারের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করতেই একের পর এক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজবকেই সরকার হটানোর একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকারবিরোধীরা।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, অতীতের গুজবের ধারাবাহিকতায় পেঁয়াজের পর সোমবার দেশে খাবার লবণের সঙ্কট দেখা দিয়েছে বলে ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়। এমন গুজবের জেরে দেশের কোন কোন জায়গায় প্রতি কেজি লবণ এক শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে, দ্বিতীয় দফায় গুজব ছড়ানো হয়। এখানেই শেষ নয়, লবণের দাম পেঁয়াজের দামের মতো বেড়ে যাবে বলে গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়। এমন গুজবের পর দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রায় সকলেই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। এই দিকভ্রান্ত হওয়ার পেছনে কাজ করে পেঁয়াজের বিষয়টি। পেঁয়াজ সম্পর্কে গুজব ছড়ানোর পর সত্যি সত্যিই পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ মহাবিপাকে পড়েছে। তারা লবণের দাম পেঁয়াজের দামের মতো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন। আর এমন আশঙ্কা থেকেই যে যার মতো, যেমন পারেন খুচরা বা পাইকারি দোকান থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ কিনছেন। এতে করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কটের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর এমন সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা লবণ বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন।

ফলে দেশের অনেক জায়গায় লবণের কৃত্রিম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। যা পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতরা সৃষ্টি করেছেন। আর পেঁয়াজের মতো লবণ পচনশীল নয়, এজন্য দোকানিরা দেদারসে লবণ মজুদ করেছেন। অনেক দোকানি দোকান থেকে লবণ সরিয়ে ফেলেছেন। গোপন জায়গায় মজুদ করছেন। সারাদেশে বড় বড় লবণ ব্যবসায়ীর বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। আর লবণের মাঝারি বা ছোট ছোট পাইকারি ব্যবসায়ীর ওপর নজরদারি চলছে। নজরদারি থেকে বাদ যাচ্ছে না খুচরা ব্যবসায়ীরাও। যেকোন সময় তাদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা আছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে, দেশে বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টনের বেশি ভোজ্য লবণ মজুত আছে। দেশে লবণের কোন সঙ্কট নেই। তারপরও একটি স্বার্থান্বেষী মহল লবণের সঙ্কট আছে বলে গুজব ছড়াচ্ছে। মূলত অধিক মুনাফা লাভের আশায় লবণের দাম অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে ওই গোষ্ঠী। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

ডিএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধান উপ-কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া জনকণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি পেঁয়াজ নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে। সেটির রেশ কাটতে না কাটতেই আবার লবণ নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। দুইটি বিষয়ই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। কারা কিভাবে কোথা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে, সে সম্পর্কে তদন্ত চলছে। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনারও চেষ্টা অব্যাহত আছে। এমনকি যারা এমন গুজবে লিঙ্ক দিয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

এই কর্মকর্তা বলছেন, মূলত কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করতেই দেশে লবণের সঙ্কট আছে বলে গুজব ছড়ানো হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত জানা গেছে। পরিকল্পিতভাবে সরকারবিরোধী গোষ্ঠীগুলো গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর স্বাভাবিক কারণেই সব মানুষ পাইকারি বা খুচরা দোকান থেকে ইচ্ছেমতো লবণ কিনবে। এটিই স্বাভাবিক। এতে করে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয়। এমন সঙ্কট সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করে। এটি সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়াও বিচিত্র নয়। ধারণা করা হচ্ছে, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করতেই সরকারবিরোধীরা এমন গুজব ছড়াচ্ছে। যারাই এর সঙ্গে জড়িত তাদের প্রত্যেককেই গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। কেউ ছাড় পাবে না।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে গুজবকেই বেছে নিয়েছে সরকারবিরোধীরা। তারই ধারাবাহিকতায় তারা গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের বাস চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আব্দুল করিম রাজীব নিহত হওয়ার পর সারাদেশে ব্যাপকভাবে গুজব ছড়ায়। গুজবে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ধানম-ি কার্যালয়ে চার ছাত্রকে হত্যা করে লাশ পার্টি অফিসে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এমন গুজব বিশ্বাসযোগ্য করতে একজন নারী মডেলকে দিয়ে ফেসবুকে লাইভ করানো হয়েছিল। এমন গুজবের পর সারাদেশের শিক্ষার্থীরা দেশ অচল করে দিয়েছিল। মূলত স্বাধীনতা ও সরকারবিরোধীরা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই ওই সময় এমন গুজব ছড়িয়েছিল বলে পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

এরপর কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্র মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে ভিসির বাসভবন ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েও সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এছাড়া বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভ্যাট আন্দোলন, ২০১৩-১৪ সালের নৈরাজ্য, ২০১৫ সালের টানা সন্ত্রাসী কর্মকা-, বোমাবাজি ও অগ্নি সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানোর ক্ষেত্রেও গুজবকেই হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল সরকার ও স্বাধীনতা বিরোধীরা। সর্বশেষ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করতে মানুষের কাটা মাথা লাগবে। এমন গুজব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়ানো হয়। বিশেষ করে শিশুর মাথা লাগবে। শিশুদের মাথা সংগ্রহ করার জন্য সরকার ছেলে ধরা নামিয়ে দিয়েছে বলেও গুজব ছড়ানো হয়। এমন গুজবের জেরে গত বছর বাড্ডায় নিজের ছেলের ভর্তির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে রেণু বেগম নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পুরোটাই পরিকল্পিত হত্যাকা-। দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

সূত্রটি বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কে দেশে-বিদেশে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতেই একের পর এক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজবকেই সরকার ও স্বাধীনতা বিরোধীরা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ খাবার লবণের সঙ্কট নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, শুধু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে হালনাগাদ গুজব ছড়ানোর দায়ে শতাধিক গ্রেফতার হয়েছে। যাদের মধ্যে ৬১ জনই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। এর মধ্যে ৩৬ জনই ছাত্র শিবিরের সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত। গুজব ছড়ানোর জন্য জামায়াত রীতিমত অর্থায়ন করে যাচ্ছে বলেও অনেকের জবানবন্দীতে বেরিয়ে এসেছে।

গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো এতটাই ভয়ঙ্কর যে, তারা সেনাবাহিনী সম্পর্কেও গুজব ছড়াতে পিছু পা হয় না বলে জানিয়েছে। সহজ-সরল মানুষের মধ্যে সরকার, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতেই এমন পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে জানা গেছে, দেশ-বিদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে সরকারবিরোধী গুজব ছড়ানো হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত ১১২টি এ্যাকাউন্ট শনাক্ত হয়েছে। এ্যাকাউন্টগুলোর অধিকাংশই পরিচালিত হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, লিবিয়া, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরব থেকে। এসব দেশে বসবাসরত বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের অন্তত ৬০ জন ব্যক্তি এ্যাকাউন্টগুলোর মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটির নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের ১৪ জন ব্যক্তি। গুজব ছড়ানোর ঘটনায় তথ্য প্রযুক্তি আইনে ইতোপূর্বে দায়ের হওয়া পাঁচটি মামলার তদন্ত অব্যাহত আছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ওই ৬০ জনকে। আসামিরা যেসব দেশে বসবাস করছেন, ওইসব দেশের দূতাবাসগুলোতে তাদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করতে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে তাদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুকে ভুয়া এ্যাকাউন্ট খুলে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ইতোপূর্বে যারা গ্রেফতার হয়েছে, তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তারা ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ছাত্র শিবিরের আইটি এক্সপার্টরাই ভুয়া ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে এমন গুজব ছড়াচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলছেন, গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। যেসব এ্যাকাউন্ট থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, ওইসব এ্যাকাউন্টের মালিকদের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মোঃ সোহেল রানা জানান, উন্নয়নে যারা ঈর্ষান্বিত, তারাই পরিকল্পিতভাবে এমন গুজব ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এমন গুরুতর অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তারই ধারাবাহিকতায় লবণ নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়েছে। লবণ নিয়ে গুজব ছড়ানোর সঙ্গে যারা জড়িত এবং এমন গুজবের পর যারা লবণ বিক্রি না করে বেআইনীভাবে মজুদ করছেন, তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে যেকোন সময় তাদের গ্রেফতার করতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

প্রকাশিত : ২০ নভেম্বর ২০১৯

২০/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: