১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

শেষ হলো ভাল লাগার প্রতিচ্ছবিময় আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব

প্রকাশিত : ১৭ নভেম্বর ২০১৯
শেষ হলো ভাল লাগার প্রতিচ্ছবিময় আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসব

মনোয়ার হোসেন ॥ শিকড়ের সুরে সুরে কেটে গেল তিনটি রাত। যান ও জনজটের শহর ঢাকায় বয়ে গেল প্রশান্তির পরশ। লোকজ গানের পথরেখায় নাগরিক জীবন খুঁজে ফিরেছে মাটির ঘ্রাণ। নিজ দেশের মাঠ-ঘাটে ছড়িয়ে থেকে পল্লী গানের সঙ্গে শোনা হয়েছে ভিন দেশের বিচিত্র আঙ্গিকের লোকসঙ্গীত। প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে তিনদিনে আঠারো ঘণ্টার সেই সুরভ্রমণ শেষ হলো শনিবার। তিনদিনে শহরের লক্ষাধিক শ্রোতা উপভোগ করেছেন দেশ-বিদেশের শিল্পীতে সজ্জিত এই লোকসঙ্গীতাসর। মালেক কাওয়ালের কাওয়ালি গানের মাধ্যমে সূচনা হওয়া আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসরের সমাপনী আসর মাতিয়েছে পাকিস্তানের সুফি ঘরানার ব্যান্ডদল জুনুুন। উপমহাদেশের বিখ্যাত লোকগানের দলটির পরিবেশনা ছিল এদিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তাদের গানের ্আলোড়িত হয়েছে শহরের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা সুরপিপাসুরা। সুন্দরের প্রতিচ্ছবিময় ফোক ফেস্টের তৃতীয় দিনে শ্রোতার হৃদয় রাঙিয়েছে রাশিয়ার নিও ফোক ঘরানার ব্যান্ডদল সাত্তুমা। চড়া কণ্ঠের আশ্রয়ে লালনের গানে ভাল লাগার অনুভব ছড়িয়েছেন দেশের শিল্পী চন্দনা মজুমদার। ছয় দেশের শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে সজ্জিত উৎসবের যকনিকা টেনেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও রাশিয়ার শিল্পীরা।

বাকি দুদিন ছাপিয়ে বিপুলসংখ্যক সঙ্গীতানুরাগীর আগমনে উৎসবের তৃতীয় দিনে জনারণ্যে পরিণত হয় আর্মি স্টেডিয়াম।

সমাপনী রাতের উৎসবের সূচনা হয় আধ্যাত্মবাদের বার্তাবহ কাওয়ালি গানের আশ্রয়ে। প্রথম পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন বাংলা লোকগানের জনপ্রিয় শিল্পী আব্দুল মালেক কাওয়ালি। তার গানের কথায় উচ্চারিত হয় ¯্রষ্টার গুণগান। মহীন কাওয়ালের এই শিষ্যর প্রথম গানের শিরোনাম ছিল ‘ইশকে নবী দিল মে’। এরপর শিল্পী একে একে গেয়ে শোনান ‘গাওসুলে আজম মাইজভা-ারি’, ‘ইশকে আজম রাসুলে আজম’ ‘খাজাজি ম্যায় হু’ ও ‘বাবা মওলানা মওলানা মওলানা’।

দ্বিতীয় পরিবেশনায় শ্রোতারা শুনেছে রাশিয়ার লোকসঙ্গীত। মিষ্টি সুরের হৃদয়গ্রাহী কয়েকটি পরিবেশনা উপস্থাপন দেশটির কারেলিয়া অঞ্চলের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় ব্যান্ডদল সাত্তুমা। রাশিয়ার মেঠোপথের গন্ধমাখা গানের সঙ্গে দলটির পরিবেশিত যন্ত্রসঙ্গীতও ছিল দারুণ উপভোগ্য। ভাষার দূরত্বকে ছাপিয়ে সাত্তুমার মেলোডিনির্ভর গানগুলো স্পর্শ করেছে শ্রোতার অন্তর। শ্রোতার ভাল লাগার সেই সুবাদে ঝড়ে পড়েছে কয়েক দফা করতালি। দলটি গেয়ে শোনায় ‘লাউলাজাপইকা’ শিরোনামের গান। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া কিনোফিল্মি এ্যালবামের এই গানের ইংরেজী অর্থ ‘দ্য সিঙ্গার বয়’। এছাড়াও তারা শোনান ‘মাতসানেইদোন সুরু’ শীর্ষক গান। ‘কুদেলমা’ এ্যালবামের এই গানের ইংরেজী অর্থ ‘সোরো অব দ্য ফরেস্ট মেইড’। এই দলের কণ্ঠসঙ্গীতে ছিলেন দিমিত্রি দেমিন। বাঁশিতে সুর ছড়িয়েছেন ভøাডিসলে দেমনি। বেহালা বাজিয়েছেন পারসুয়েভ। ড্রামে শব্দধ্বনি তুলেছেন জারফ্রেমভ। পারিবারিক এই ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু ২০০৩ সালে। নিওফোক ঘরানার গান নিয়েহাজির হওয়া সাত্তুমা ট্যুও করেছে ইউরোপের নানাপ্রান্তে। মঞ্চে নানা ধরনের ইন্সট্রুমেন্ট বাজিয়ে এক অদ্ভুত মূর্ছনায় দর্শককে আবিষ্ট করে রাখেন সাত্তুমার সদস্যরা। রাশিয়া, আমেরিকা, ফিনল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, এস্তোনিয়া এবং জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দলটি।

রাশিয়ার লোকগানের সুর শেষে সঙ্গীতানুরাগীরা শুনেছে দেশের লোকসঙ্গীত। সমাপনী রাতে তৃতীয় পরিবেশনাটি উপস্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর পাড়ে জন্ম নেয়া লালনসঙ্গীত শিল্পীচন্দনা মজুমদার। লালনের গানের শুনিয়েছেন রাধারমণ, হাসন রাজা, শাহ্ আবদুল করিমসহ বাংলার বিভিন্ন গীতিকবির গান। গেয়ে শোনান ‘জগত মুক্তিতে ভোলালেন সাঁই’ ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’, ‘লোহারে কে বানাইলো কাঞ্চা সোনা’ ও ‘সে কি চেনে মানুষ রতন’। দোতালা, ঢোল, বাঁশিসতহ বাংলার লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সহযোগে চন্দনার গানের সুরে কণ্ঠ মেলান শ্রোতারা।

সব শেষে মঞ্চে আসে সমাপনী রাতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পাকিস্তানী সুফি ধারার ব্যান্ডদল জুনুন। নিজেদের জনপ্রিয় গানের আশ্রয়ে উপমহাদেশের সঙ্গীত প্রেমীদের কাছে উন্মাদনা সৃষ্টিকারী দলটি উ”চ্ছ্বাসে ভাসিয়েছে ঢাকার গানপ্রেমীদের। মন উচাটন করা সেসব গানের সুরে নেচে-গেয়ে ভাললাগার প্রকাশ ঘটিয়েছেন শ্রোতারা। দেড় ঘণ্টার পরিবেশনায় দলটির গাওয়া কয়েকটি গানের শিরোনাম ছিল ‘দামাদাম মাস্ত কালেন্দার’, ‘চ্যান এক পলক নেহি অর কোয়ি হাল নেহি সাইওনি’, ‘ইয়ার মেরে দিল নেহি লাগতা’ ও ‘মিট্টি মে মিল যায়েঙ্গে’ ও ‘ইয়ার এহি দোস্তি হে’। দলটির সদস্যরা হলেন সালমান আহমাদ, নুসরাত হোসাইন, আলী আজমত ও ব্রেইন ও’কন্নেল। পাকিস্তানী এই ব্যান্ডটি সুফি ঘরানার গান দিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শ্রোতাদের মোহবিষ্ট করে রেখেছে। ১৯৯৭ সালে নিজেদের চতুর্থ এ্যালবাম ‘আজাদি’ দিয়ে সারা উপমহাদেশে ঝড় তোলে জুনুন। এ্যালবামের প্রথম গান ‘সাইওনি’ পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশÑ এই তিন দেশের শ্রোতাদের কাছে পেয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। বিশ্বব্যাপী জুনুনের ত্রিশ মিলিয়নেরও বেশি এ্যালবাম বিক্রি হয়েছে।

মেরিল নিবেদিত সান ফাউন্ডেশন আয়োজিত ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের পঞ্চম আসরটি উৎসর্গ করা হয় বাংলা গানের ছয় বরেণ্য শিল্পীকে। তারা হলেন সুবীর নন্দী, বারী সিদ্দিকী, শাহনাজ রহমতল্লাহ, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আইয়ুব বাচ্চু ও ফকির আবদুর রব শাহ।

প্রকাশিত : ১৭ নভেম্বর ২০১৯

১৭/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: