১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

উল্লাপাড়ায় ট্রেনের বগিতে আগু৻ পুরোটাই নাশকতা

প্রকাশিত : ১৭ নভেম্বর ২০১৯
  • দুই কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য মিলেছে

শংকর কুমার দে ॥ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ট্রেনের বগিতে আগুন দেয়ার ঘটনায় নাশকতার আলামত পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। ট্রেনের ইঞ্জিনের পরিবর্তে বগিতে আগুন কেন ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, এই ট্রেন লাইনে অতীতেও আগুন দেয়া হয়েছে। উল্লাপাড়ায় ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনায় রেলওয়ের সন্দেহভাজন দুই কর্মচারীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগে ট্রেন দুর্ঘটনায় চালকের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার একদিন পরই উল্লাপড়ায় টেনের বগিতে আগুন ধরল কেন ? ইঞ্জিনের ত্রুটিজনিত কারণে আগুন ধরতে পারে, আগুন লাগতে পারে। ইঞ্জিনের তেল থেকে কিন্তু বগিতে আগুন লাগল কিভাবে তাও আবার বগির ভেতর থেকে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ট্রেনে আগুনের বিষয়টি নাশকতার আলামত হিসেবে মনে করা হচ্ছে। অতীতেও এই লাইনে ট্রেন জ্বালিয়ে দিয়ে নাশকতা চালানো হয়েছিল। তখন ওই নাশকতা চালায় সন্ত্রাসীরা। সেসব সন্ত্রাসী ছিল রাজনৈতিক মদদপুষ্ট। বার বার একই লাইনে ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনা নাশকতার আলামত স্পষ্ট হচ্ছে রেলের। সন্দেহভাজন দুই কর্মচারীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। যে স্থানে এ ঘটনা ঘটেছে সেখানে মিটারগেজের লাইন একটাই, তাও আবার লাইন ছিল ক্লিয়ার। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশে ট্রেনের বগিতে আগুন দেয়া হতে পারে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা থেকে রংপুরগামী রংপুর এক্সপ্রেস উল্লাপাড়া স্টেশনে এসে ৯ বগি ও ইঞ্জিন নিয়ে লাইনচ্যুত হয়। তখন ইঞ্জিনসহ বগিতে আগুন ধরে আহত হয় ৫ জন। পরে ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি টিম আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে, আহতদের উদ্ধার করে। উল্লাপাড়ায় রংপুর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে আগুন লেগে ইঞ্জিনসহ তিনটি বগি পুড়ে যায়। এতে রেলকর্মীসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। ট্রেনের ইঞ্জিনটি রেলপথের পাশে উল্টে পড়ে আগুন ধরে যায়। পরে ওই আগুন লাইনচ্যুত আরও দুই বগিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ট্রেনের যাত্রীরা দ্রুত জানালার কাঁচ ভেঙ্গে অথবা দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসায় কয়েকজন আহত হন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, উল্লাপাড়ায় ট্রেনের বগিতে আগুন লাগার ঘটনা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার বিষয়টি এক রকম নয়। মঙ্গলবার ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগে ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহতের ঘটনায় চালকের গাফিলতি পেয়েছে তদন্ত কমিটি। রেলওয়ের মহাপরিচালকের ডিজি কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মন্দবাগ স্টেশনে ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত বিভাগীয় পর্যায়ের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মোঃ শামছুজ্জামানের কাছে এ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তূর্ণা নিশীথার চালকদের ব্রেক কষতে সমস্যা হওয়ার কোন কারণ দেখিনি। তারা যথেষ্ট সময় ও জায়গা পেয়েছিলেন। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তূর্ণা নিশীথার চালকরা চাইলেই ফুলব্রেকিং সিস্টেম ব্যবহার করতে পারতেন। তদন্ত কমিটির সদস্যরা এ ঘটনার সংশ্লিষ্ট ১৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষাতকার নেন। এ ছাড়া বেশ কয়েক প্রত্যক্ষদর্শী ও যাত্রীর সাক্ষ্যও নেয়া হয়েছে।

তদন্ত কমিটি বলেছেÑ দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের স্পিড কত ছিল, সিগন্যালিং অবস্থা কেমন ছিল, চালকরা কী অবস্থায় ছিলেন এসব বিষয়। স্টেশন মাস্টারদের ব্যবহৃত কোড পরীক্ষা করা হয়েছে বলেও জানান কমিটির আহ্বায়ক। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে একটি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেটি হলো-মন্দবাগে ট্রেন দুর্ঘটনায় চালকের অবহেলা ছিল। তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া সাক্ষাতকারে তূর্ণা নিশীথার চালক তাছের উদ্দিন ও সহকারী চালক অপু দে প্রথমে একে অপরের প্রতি দোষারোপ করলেও পরে ইটের স্তূপের জন্য সিগন্যাল দেখতে না পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তদন্ত কমিটির কাছে এর কোনটাকেই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যথেষ্ট মনে হয়নি। তারা জানিয়েছেন, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে সব জায়গায় নির্মাণ কাজের মালপত্র আছে। সর্বোচ্চ সিকিউরিটি বজায় রেখে এসব মাল রাখা হয়েছে। তাই ইটের স্তূপের কারণে সিগন্যাল দেখতে না পাওয়ার ঘটনা নয়। সিগন্যাল না দেখার মতো কোন ঘটনা থাকলে ইমার্জেন্সি ভেঁপু বাজানোর সিস্টেম আছে, যা বাজাবেন তূর্ণা নিশীথার চালকরাই। কিন্তু তারা এমন কিছুই করেননি। তদন্ত কমিটির কাছে দুর্ঘটনা এড়াতে চালকের অবহেলা ছিল বলে প্রতীয়মান হওয়ার কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটি বলছে, কোন লোকোমাস্টার (চালক) যখন ব্রেক করেন তখন ৪৪০ গজ গিয়ে ট্রেনটা আপনাআপনি থেমে যায়। তদন্ত কমিটি পরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছে, দুর্ঘটনাকবলিত তূর্ণা নিশীথার চালকরা এ ক্ষেত্রে বেশি জায়গা পাওয়া সত্ত্বেও ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগে ট্রেন দুর্ঘটনার একদিন পর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ট্রেনের বগিতে আগুন দেয়ার ঘটনায় সন্দেহের সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত শুরু করে। তদন্তে ট্রেনের বগিতে আগুন লাগার ঘটনায় অনেক প্রশ্ন সামনে আসে যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, এটা নাশকতা। রাজনৈতিক উদ্দেশে এই নাশকতার ঘটনা ঘটানো হতে পারে। কারা এই নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে সেজন্য রেলের দুই কর্মচারীকে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি দায়ী ও দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

প্রকাশিত : ১৭ নভেম্বর ২০১৯

১৭/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: