১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

আইলা ফণী বুলবুলের তান্ডবে ওরা দিশেহারা

প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৯
আইলা ফণী বুলবুলের  তান্ডবে ওরা দিশেহারা
  • জলবায়ু ঝুঁকিতে উপকূলের ৩ লাখ মানুষ

মিজানুর রহমান, সুন্দরবনের গাবুরা থেকে ফিরে ॥ আইলা, ফণী আর বুলবুলের তান্ডবে ওরা বিধ্বস্ত। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া ৮০ বছরের অমেলা বিবির বসত এখন বাঁধের নিচে। লাঠি ভর দিয়ে হাঁটতে হয় ষাটোর্ধ সফুরা বিবির। যক্ষ্মায় আক্রান্ত চাঁদনিমুখা গ্রামের ওয়াজেদ খার স্ত্রী হালিমা খাতুন বুলবুলের আঘাতে ধসেপড়া দুটি ঘর কিভাবে দাঁড় করাবে এই চিন্তায় এখন বাড়ি ছেড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে-ওখানে। আইলা ফণীর তা-বের পর সর্বশেষ বুলবুলের তা-বে বিধ্বস্ত হয়েছে ওদের বসতঘর। প্রতিটি ঝড়েই ছুটতে হয় বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ওদের বসতি এখন নদীর অনেক নিচে। পলিতে নদী ভরাটের কারণে ওদের বসতঘরগুলোর অবস্থান নদীর উচ্চতা থেকে ১০ থেকে ১২ ফুট নিচে। এ কারণে বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে জলোচ্ছ্বাসে ওরা হয় পানিবন্দী। হয় গৃহহীন। বাঁধভাঙ্গা পানিতে ওদের সহায় সম্বল ভেসে গেলে পুনর্বাসনের তালিকায় নাম ওঠাতে ওদের অপেক্ষার প্রহর হয় দীর্ঘ। সরকারী কর্মকর্তা, এনজিওকর্মী এবং সংবাদকর্মীদের দেখলেও ওরা ছুটে আসে ত্রাণের তালিকায় নাম লেখানোর জন্য। ওদের অসহায় আকুতি থাকলেও ভাগ্য ওদের পিছু ছাড়ে না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আইলা, সিডর, ফণী বুলবুলের মতো বিধ্বংসী ঝড় ওদের তাড়িয়ে ফেরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে।

সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগর উপজেলার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ৮ ইউনিয়নের প্রায় ৩ লাখ মানুষ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোর তলদেশে পলিজমে স্থলভূমি থেকে নদীর উচ্চতা বেড়েছে। আর একারণে নদীর অবস্থান থেকে জনপদের অবস্থান এখন ১২ থেকে ১৫ ফুট নিচে দাঁড়িয়েছে। নদী ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই তলিয়ে যাবে সাতক্ষীরা খুলনা আর বাগের হাটের বিশাল অংশ। মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে এই উপকূলীয় জনপদ।

এই জনপদের একটি দ্বীপ গাবুরা। সুন্দরবন আর নদী বেষ্টিত এই জনপদে ১৫ গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। নৌকা ছাড়া এই জনপদে ঢোকার কোন বিকল্প পথ নেই। গভীর সমুদ্র থেকে উঠেআসা ঝড় এলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এই জনপদে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও এখানে দীর্ঘ হয়। বেড়িবাঁধ বেষ্টিত এই জনপদের প্রায় ৪২ হাজার মানুষের বসতি নদী থেকে অনেক নিচে বাঁধের মধ্যে। বাঁধের যে কোন অংশ ভেঙ্গে গেলে পুরো ইউনিয়নের ১৪ গ্রাম চলে যায় পানির নিচে। আইলার তান্ডবে এখানে ৪০ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই ইউনিয়নের গাবুরা, ডমুরিয়া, নাপিতখালি, জেলেখালি, পার্শ্বেমারি, চাঁদনিমুখা এলাকার প্রায় ৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ১০ পয়েন্ট এখন ঝুঁকিতে। ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ১১ গ্রামের প্রায় ৩৬ হাজার মানুষ। ভেঙ্গে থাকা বেড়িবাঁধগুলোর আতঙ্কে থাকতে হয় বাঁধের মধ্যে বসবাসরত হাজার হাজার মানুষের। ঝুঁকিতে উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। বুলবুলের আঘাতে এখানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এখানে দুর্গাবাটি এলাকার বাঁধের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঝুঁকির মধ্যে কৈখালী, মুন্সিগঞ্জ, আটুলিয়াসহ ৮ নদী সংলগ্ন ইউনিয়ন জনপদ জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। নদীর পানি বাঁধ সমান। সামান্য বাতাসে বাঁধ উপচে পানি ঢোকে জনপদে। আর একারনে বাঁধের মধ্যে বসবাসরত প্রায় ৩ লাখ মানুষের জীবন রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে।

জলবায়ু ঝুঁকিতে সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় জনপদ শ্যামনগর উপজেলার ৮ ইউনিয়নের প্রায় ৩ লাখ মানুষ এমনটি স্বীকার করে শ্যামনগর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউল হক দোলন জনকণ্ঠকে বলেন, এই জনপদের মানুষগুলোর রাত কাটে বাঁধভাঙ্গা আতঙ্কে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটেছে। গরমের তীব্রতা, খরা, আর শীতের তীব্রতায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে। লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ায় উপকূলজুড়ে রয়েছে খাবার পানির তীব্র সঙ্কট। এখানে নলকূপের পানি লবণাক্ত। জমিতে লবণাক্ততায় সাধারণ ফসল হয় না। এক কলস মিষ্টি পানির জন্য গৃহবধূদের ছুটতে হয় একগ্রাম থেকে অন্যগ্রামে।

ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কথা স্বীকার করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বুধবার জনকণ্ঠকে বলেন, বুলবুলের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। জিও ব্যাগ আর মাটির কাজ দিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো মেরামত করতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

প্রকাশিত : ১৪ নভেম্বর ২০১৯

১৪/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: