২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বুলবুলের আঘাত ॥ দুর্বল হয়ে উপকূলে

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৯
বুলবুলের আঘাত ॥ দুর্বল হয়ে উপকূলে
  • ভোলায় ১০ জন আহত, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত
  • দুবলার চরে শুঁটকি পল্লী ল-ভ-
  • ১৮ লাখ লোক নিরাপদ আশ্রয়ে
  • সশস্ত্র বাহিনীও প্রস্তুত
  • ১৩ জেলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল
  • মংলা, পায়রা এবং চর ও দ্বীপসমূহে ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শক্তি ক্ষয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে দেশের উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, শনিবার রাত ৯টার দিকে বুলবুল পশ্চিমবঙ্গ ও খুলনা উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে। এর আগে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল পশ্চিবঙ্গের স্থলভাগে আঘাত হানে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

ভারতে গণমাধমের খবরে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে জানানো হয়, শক্তিশালী সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের কাছে উপকূল অতিক্রম করার পর তা সাগর থেকে স্থলভাগের দিকে উঠে আসে। এরপর তার আরও উত্তর-পূর্ব দিকে সরে গিয়ে সুন্দরবনের দিকে আছড়ে পড়ে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। সুন্দরবনে আছড়ে পড়ার আগেই ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি খোয়াতে থাকে। ফ্রেজারগঞ্জ, সাগরদ্বীপ, বকখালি হয়ে স্থলভাগে ঢোকার পর অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় থেকে শুধুমাত্র প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। তিন-চার ঘণ্টা ধরে তান্ডব চলে। তারপর বুলবুল বাংলাদেশের স্থলভাগের খেপুপাড়ার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। এরপর তা বাংলাদেশ হয়ে ত্রিপুরার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশের উপকূল এলাকায় প্রবেশের পর এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় প্রচ- বেগে ঝড় বইতে থাকে। এরকই উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভারি বর্ষণ শুরু হয়। ভোলার লাল মোহনে বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়াসহ ১০ জন আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর অগ্রবর্তী অংশের আঘাতে দুবলার চরের অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভারতের আবহাওয়া অফিস জানায়, স্থানীয় সময় শনিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফ্রেজারগঞ্জ ও সাগরদ্বীপ হয়ে কলকাতার স্থলভাগে আঘাত হানে। পশ্চিমবঙ্গের স্থলভাগে প্রবেশের সময় ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। এর ফলে ফ্রেজারগঞ্জ ও বকখালি অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ঝড়ের প্রভাবে কলকাতা ও ওড়িশায় দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে ভারি বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় কলকাতায় বহু গাছ উপড়ে গেছে, নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয় বেশকিছু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। উপড়ে পড়েছে বিদ্যুতের খুঁটি। নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া অফিস জানায় উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আরও উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ০৮ কিমি/ঘণ্টা বেগে অগ্রসর ও কিছুটা দুর্বল হয়ে ‘প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আকারে শনিবার রাত ৯টা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূল (সুন্দরবনের কাছ দিয়ে) অতিল্ডম শুরু করে। এটি আরও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর ও ল্ডমশঃ দুর্বল হয়ে মধ্যরাত নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা (সুন্দরবনের কাছ দিয়ে) উপকূল অতিল্ডম করে। তারা জানায় উপকূলে প্রবেশ করার সময় প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১শ’ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তে থাকে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ।

এ কারণে ঘূর্ণিঝড় চলাকালীন সময়ে মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহে ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত বহাল রাখা হয়। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেতের আওতায় থাকে। একই সময় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে ৯ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত বহাল রাখা হয়। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহও এর আওতায় বহাল রাখা হয়। তবে কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সঙ্কেতের মধ্যে রাখা হয়।

আবহাওয়া অফিস জানায়, ঘূর্ণিঝড় অতিল্ডমকালে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলাসমূহ এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহে ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৮০-১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। তারা জানায়, এই সময় উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নি¤œাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলে প্রবেশের পর থেকে এটি কিছুটা দুর্বল হতে থাকে। রাত ১১টার পর আবহাওয়া অধিদফতরের উপ-পরিচালক আয়েশা খানম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বুলবুল উপকূল অতিক্রম করছে। লোকালয়ে যত আসবে ততই দুর্বল হয়ে যাবে। সুন্দরবনের কারণেই দুর্বল হয়ে যাবে। উত্তর পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে বুলবুল অতি প্রবল ছিল যা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। বাতাসের বেগ কিছুটা কমেছে। এটা আরও উত্তর, উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশের দিকে আসবে। যত আসবে তত দুর্বল হবে। তিনি আরও বলেন, ‘মধ্যরাত পর্যন্ত উপকূল অতিক্রম সম্পন্ন করবে তারপর বাংলাদেশে আসবে। এটি সুন্দরবন দিয়ে উপকূল অতিক্রম করছে। সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হেনেছে। ওই সময় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিমি। তখন এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে ছিল।

নিজস্ব সংবাদদাতা ভোলা থেকে জানান ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে ভোলায় শনিবার রাত ৯টার দিকে লালমোহন ও চরফ্যাশনে প্রচ- ঘূর্ণিঝড়ে ১৫ ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে রাতেই বরিশাল রেফার্ড করা হয়। স্থানীয়রা জানান, রাত ৯টার পর লালমোহন উপজেলার লডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের পিয়ারি মোহন গ্রামে হঠাৎ করে ঘূর্ণিবাতাসে ৮টি ঘর বিধ্বস্ত হয়। এতে ঘরে চাপা পড়ে সাজেদা বেগম, তারেক, আরিফ, শরিফ, মোস্তাফিজসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়। এদের মধ্যে গুরুতরদের চরফ্যাশন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে তারেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক । লালমোহন থানার ওসি মীর খায়রুল কবির জানান, ঘূর্ণিঝড়ে লডহার্ডিঞ্জে কয়েকটি ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তারেক নামে (১৭) এক কিশোরের পেট টিনের সঙ্গে কেটে যাওয়ায় তাকে চরফ্যাশন হাসপাতাল থেকে বরিশাল রেফার করা হয়েছে। লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান রুমি জানান, ঘূর্ণিঝড়ে লালমোহনে লডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে ৮ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন চরফ্যাশন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া গজারিয়া বাজারের আশপাশে এলাকায় ৭০/৮০টি গাছ বিধ্বস্ত হয়।

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলাপাড়া থেকে জানান ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শনিবার রাত সাড়ে নয়টা থেকে ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া। এতে কলাপাড়ার উপকূলের মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ১২টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভার ১৫৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে কমপক্ষে ৮০ হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। বাঁধ ভাঙ্গা এলাকা লালুয়ার ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া নির্মাণাধীন ধুলাসার এলাকার বেড়িবাঁধের চাপলী বাজারের স্লুইজগেট নিয়ন্ত্রণ না থাকায় জোয়ারের পানি ঢুকে শনিবার রাতে অভ্যন্তরীণ খাল উপচে রবিশস্য ও সবজি এবং ধানক্ষেত ডুবে গেছে। একারণে জলোচ্ছ্বাস আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে বুলবুল বাংলাদেশের উপকূলে আসার আগেই এটি মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। উপকূল এলাকায় বসবাসরত প্রায় ১৮ লাখ লোককে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়। উপকূলীয় ১৩ জেলায় সব কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে দেয়া হয়েছে। খোলা হয়েছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কন্ট্রোলরুম।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই ঝড় মোকাবেলা করার জন্য, মানুষকে রক্ষা করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ঝড় পরবর্তী রিলিফ কার্যক্রম যাতে চালানো যায়, সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর ১৮ লাখ মানুষকে ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য বিভাগে ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঝড় পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীও। শনিবার আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সব সেনানিবাস, ঘাঁটি, জাহাজ ও হেলিকপ্টার। সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, সশস্ত্রবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। এলজিআরডি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও এক হাজার ৫শ’ মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রেখেছে। প্রচুর পরিমাণে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও খাবার স্যালাইন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপদ্রুত এলাকায় সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলার জন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ১৩টি উপকূলীয় জেলায় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ছুটি বাতিলের পাশাপাশি কর্মস্থল ত্যাগ না করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগ মাঠ পর্যায়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

এদিকে বুলবুলের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ রুটে নৌ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বন্দরের সকল জেটি বিকেলের আগেই জাহাজশূন্য করা হয়েছে। বহির্নোঙরে অবস্থানে থাকা ৩১টি জাহাজ কুতুবদিয়া সংলগ্ন গভীর সমুদ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর শনিবারের ছুটি বাতিল ঘোষণা করেছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ধরনের উড়োজাহাজ ওঠানামা শনিবার বিকেল ৪টা থেকে রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৪ ঘণ্টা বন্ধ ঘোষণা করেছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ।

মংলা ॥ শনিবার সকাল থেকে মংলা বন্দর ও শহরসহ সুন্দরবন উপকূল এলাকায় থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। তবে বাতাসের তীব্রতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বন্দরের অবস্থানরত ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের পণ্য খালাস-বোঝাই কাজ বন্ধ রয়েছে। ১০ নম্বর বিপদসঙ্কেত হওয়ায় পশুর নদী ও মংলা নদীতে সকল নৌযান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে বন্দরে নিজস্ব বিশেষ সতর্কতা ‘এলার্ট-৪’ এখনও বলবৎ আছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

খুলনা ॥ মাইকিং করে জনগণকে সচেতন করা ও নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়। মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শনিবার সকাল থেকে বিভিন্ন সাইক্লোন শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আবার কিছু লোক আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে চলে গেছে। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে বাড়ি ও ঘরের সম্পদ আগলে পড়ে আছেন। শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় খুলনা শহরসহ সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবিরাম বর্ষণ হচ্ছিল এবং থম থমে অবস্থা বিরাজ করছিল। বাতাসের গতিও সামান্য বেড়েছে।

পটুয়াখালী ॥ জেলায় বিভিন্ন উপজেলায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৭৪ হাজার দুর্গম এলাকার জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে লোক না আসায় আরও জোর দেয়া হচ্ছে। আশ্রয় কেন্দ্রে লোক নিয়ে আসতে পুলিশ, প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা একসঙ্গে কাজ করছেন। জেলা প্রশাসক বলেন, জেলায় মোট ৬০৩টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া সার্বিক বিষয় মনিটরিং করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে।

বরিশাল ॥ প্রবল শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। তাই বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শনিবার বিকেলের মধ্যে বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের দুই হাজার ১১৪টি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছে না তাদের জোর করে নেয়া হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানিয়েছেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী। অপরদিকে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোলরুম থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, শনিবার বিকেল পৌনে পাঁচটার মধ্যে জেলার ২৩২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়েছেন।

সাতক্ষীরা ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলে’র প্রভাবে সাতক্ষীরায় দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিসহ ঝড়ো হাওয়া বইছে। ইতোমধ্যে পুলিশ, বিজিবি, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে গঠিত টিম উপকূলবর্তী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে আনার কাজ শুরু করেছে। হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিক সার্বক্ষণিক খোলা রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বরগুনা ॥ ক্রমশ প্রবল হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ ধারণ করছে ভয়ানক রূপ। বুলবুলের প্রভাবে সকাল থেকেই বৃষ্টি থাকলেও প্রথম দিকে কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে না গেলেও বিকেল থেকে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ছুটছে প্রান্তিক উপকূলের মানুষ। এর মধ্যে অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই সাইক্লোন শেল্টারে যেতে অনীহা দেখা গেছে। এদিকে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সিপিপি, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার জন্য প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

নোয়াখালী ॥ ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র প্রভাবে নদী উত্তাল হয়ে যাওয়ায় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে শুক্রবার বিকেল থেকে সব ধরনের নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় শনিবার হাতিয়া উপজেলায় ও এর আগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র ও সাড়ে ছয় হাজার স্বেচ্ছাসেবক। শনিবার বিকেল ৩টা থেকে হাতিয়া উপজেলায় ভারিবর্র্ষণ শুরু হয়েছে এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হয়ে পড়েছে। লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে শুরু করেছেন।

ঝালকাঠি ॥ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন বয়সের মানুষ তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য জেলার ৭৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে। এদের মধ্যে ২৯টি সাইক্লোন শেল্টার এবং ৪৫টি অস্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকার পাকা স্কুলগুলো খোলা রাখা হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে তাদের জন্য মোমবাতি ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছে। খেয়া পাড়াপাড়ের নৌকাগুলো চলাচলের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে

চরফ্যাশন ॥ চরফ্যাশন ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গ্রামে গ্রামে প্রচার অভিযান শুরু করেছে। শনিবার সকাল থেকে উপজেলার বিছিন্ন দ্বীপ ঢালচর, কুকরি মুকরি, মজিবনগর, চরপাতিলা, চরনিজামসহ বিভি এলাকায় সিপিপি কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ নেমে পড়েছে স্ব-স্ব এলাকায়। এবং সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে অবস্থান নেয়া শুরু করেছে। উপজেলা নির্বাহী কমকর্তা রুহুল আমীন বলেন, আমরা বুলবুল মোকাবেলায় সরকারীভাবে প্রস্তুত রয়েছি।

হাতিয়া ॥ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য চলছে মাইকিং, উত্তোলন করা হয়েছে সিগন্যাল পতাকা, যাত্রী পাড়াপাড়সহ সকল নৌ-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরী বৈঠক, খোলা হয়েছে কন্ট্রোলরুম, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চিত্র এটি। শনিবার সকাল থেকে ৯ নং বিপদ সঙ্কেত দেয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। উপজেলা হাতিয়ায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে আবহাওয়া ক্রমন্বয়ে খারাপ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপ, ডালচরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ২ সহ¯্রাধিক জনগণ আশ্রয় নিয়েছেন।

কলাপাড়া ॥ প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শনিবার সন্ধ্যার পরে কলাপাড়ার উপকূলজুড়ে অস্বাভাবিক জোয়ারের প্লাবন শুরু হয়েছে। এই জোয়ারে লালুয়ার অন্তত সাত কিলোমিটার বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ এলাকার নয় গ্রামের মানুষের বাড়িঘরে জনপদে পানি প্রবেশ করেছে। যদিও এসব বাড়িঘরের অধিকাংশ মানুষ এখন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সন্ধ্যার পরে জোয়ার শুরু হয়েছে, বেড়িবাঁধ ভাঙ্গা থাকায় প্রবলবেগে পানি চারিপাড়া, চৌধুরীপাড়া, ছোট পাঁচ নং, বড় পাঁচ নং, বানাতিপাড়া, ধঞ্জুপাড়া, নয়াকাটা, মুন্সীপাড়া, ১১ নং হাওলা গ্রামে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। চেয়ারম্যান জানান, তার ইউনিয়নে বাঁধ ভাঙ্গা থাকায় চরম ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। ওই ইউনিয়নের ১০টি আশ্রয়কেন্দ্রে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। একইভাবে চম্পাপুরের দেবপুর এলাকায় বাঁধ ভাঙ্গা থাকায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জানান, চারিপাড়ার সাত কিলোমিটার বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ তারা মেরামত করতে পারছেন না। কারণ ওই এলাকায় পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করেছে।

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৯

১০/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: