২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

সাতক্ষীরা ছফুরন নেছা মহিলা কলেজে অনিয়ম

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৯

স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা ॥ বঙ্গবন্ধুকে কটূক্তির দায়ে দীর্ঘদিন সাসপেন্ড থাকা রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার চার্জশীটভুক্ত এক আসামিরও পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে। ক্লাসে তিন শিক্ষার্থী থাকলেও বিজ্ঞান বিভাগে ৪ শিক্ষকের পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৮ শিক্ষকের মধ্যে জামায়াত ঘরনার চার শিক্ষকের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। গত মাসে পদোন্নতিপ্রাপ্তরা উচ্চতর স্কেলে বেতন পাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হলে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ পায়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও গুরুতর এসব অনিয়ম জায়েজ করা হয়েছে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এমনই অভিযোগ পদোন্নতি বঞ্চিত একাধিক শিক্ষকের। আর এই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছায় প্রতিষ্ঠিত ছফুরন নেছা মহিলা কলেজের পরিচালনা পরিষদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি সাতক্ষীরা সিটি কলেজে শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়ম ও অনৈতিক সুবিধা নিয়ে জামায়াত-শিবিরের কয়েক শিক্ষককে এমপিওভুক্তির খবর জনকণ্ঠসহ স্থানীয় দৈনিকে প্রকাশের পর ঝাউডাঙ্গা কলেজ, ভালুকা চাঁদপুর কলেজ, সাতক্ষীরা দিবা নৈশ কলেজ ও শহরের ছফুরন নেছা মহিলা কলেজে শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে একই ধরনের অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ৫ কলেজেরই সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য।

প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকার পরও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের পদোন্নতি ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামির পদোন্নতির সুপারিশ বিষয়ে কলেজ অধ্যক্ষ আশরাফুন্নাহার বুধবার দুপুরে বলেন, সুপারিশ পদোন্নতিতে কোন অনিয়ম হয়নি। যা করা হয়েছে কমিটির মাধ্যমে নিয়ম মাফিক হয়েছে।

ছফুরন নেছা মহিলা কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, বিগত ২০১০ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে সাতক্ষীরা শহরের ছফুরন নেছা মহিলা কলেজে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক মোঃ আসাদুল্লাহ আল গালিব ১৫ আগস্টের হত্যাকান্ডের পক্ষে এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কটূক্তি করে বক্তব্য দেন। কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ্য সভায় গালিব এ বক্তব্য দিলেও কেউ তার ওই বক্তব্যের জোরালো কোন আপত্তি বা প্রতিবাদ করেনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ মুনসুর আহমেদ বাদী হয়ে উক্ত গালিবের বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা সদর থানায় রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আসামি গালিবের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে সাতক্ষীরা দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই মামলার কারণে গালিব দীর্ঘদিন সাসপেন্ড ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ৭ এপ্রিল কলেজ গবর্নিং কমিটির সভাপতি মীর মোস্তাক আহমেদ রবির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় তার সাসপেন্ডের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। সর্বশেষ গত ৬ মার্চ ২০১৯-এর সভায় তার পদোন্নতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

এদিকে সাতক্ষীরা ছফুরন নেছা মহিলা কলেজের ৮ শিক্ষকের পদোন্নতি সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সেটি গোপন রেখে একই সভায় নতুন ৮ জনের পদোন্নতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বলে কলেজের শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন। পদোন্নতি বঞ্চিত একাধিক শিক্ষক জানান, যাদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে তাদের একজন জামায়াতের রোকন। এছাড়া আরও কমপক্ষে ৪ শিক্ষা জীবনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সূত্রটির দাবি, বিশেষ সুবিধা নিয়ে তাদের পদোন্নতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে গত ৬ মার্চ ২০১৯ তারিখে ছফুরন নেছা মহিলা কলেজের গবর্নিং কমিটির সভা দেখিয়ে উক্ত ৯ শিক্ষকের পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই সভায় সদর আসনের সাংসদ মীর মোস্তাক আহমেদ রবিকে সভাপতি দেখানো হলেও বাস্তবে ওই সময় এমপি রবি উক্ত কলেজের সভাপতিই ছিলেন না। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ১৮ সালে ১২ মার্চ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের আদেশক্রমে ভারপ্রাপ্ত কলেজ পরিদর্শক ড. মোঃ মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত জেলা শহরে অবস্থিত কলেজ হিসেবে ছফুরন নেছা কলেজের সভাপতির দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের ওপর অর্পন করা হয়। পরবর্তীতে গত ১৩ মার্চ তারিখে একই ব্যক্তি স্বাক্ষরিত আর একটি চিঠিতে সাতক্ষীরা সদর আসনের এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবিকে উক্ত কলেজের সভাপতি মনোনয়ন দেয়া হয়। সেই হিসেবে নতুন করে সভাপতি মনোনীত হওয়ার এক সপ্তাহ পূর্বে গত ৬ মার্চ তারিখে তার সভাপতিত্বে কোন বৈধ সভা অনুষ্ঠানের সুযোগ ছিল না বলে পদ বঞ্চিত শিক্ষকরা দাবি করেন। রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার চার্জশীটভুক্ত আসামি গালিব ছাড়াও যে ৮ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে, সেটি নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের অভিযোগ। পদোন্নতিপ্রাপ্তরা হলেন- সামছুন্নাহার, মোঃ শাহাদাত হোসেন, কৃষ্ণপদ মহলদার, মোঃ রেজাউল করিম, মোঃ লতিফ হাসান, ভোলানাথ সরকার, এআরএম সেলিম আকতার ও মল্লিক সাহিদ মোস্তফা।

এর পূর্বে ২০০৯ সালে ৪ সেপ্টেম্বর ছফুরন নেছা মহিলা কলেজের তৎকালীন সভাপতি সাবেক এমপি এমএ জব্বারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পদোন্নতি সংক্রান্ত তৎকালীন বিধি অনুযায়ী কৃষ্ণপদ মহলদার, কল্যাণ কুমার ঘোষ, পম্পাবতি মুখার্জী, প্রদীপ কুমার দাশ, মোঃ লতিফ হাসান, মল্লিক সাহিদ মোস্তফা, মোঃ রেজাউল করিম এবং সেলিনা সুলতানার পদোন্নতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ায় প্রদীপ কুমার দাশ, কল্যাণ কুমার ঘোষ ও সেলিনা সুলতানা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। উক্ত আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রথমে ৬ সপ্তাহ ও পরবর্তীতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। সেই আদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় গত ৬ মার্চ ২০১৯ তারিখের সভায় পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এদিকে গবর্নিং কমিটির উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রদীপ কুমার দাশ, কল্যাণ কুমার ঘোষ ও সেলিনা সুলতানা উপ-পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর, খুলনা অঞ্চলে সম্প্রতি একটি আবেদনে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান।

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৯

০৯/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

দেশের খবর



শীর্ষ সংবাদ: