২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বাংলা ভাইয়ের সহযোগীর হাতে শ্রেষ্ঠ সমবায়ীর পুরস্কার

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৯
  • বাগমারায় তোলপাড়

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী ॥ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জেএমবির (জামায়াতুল মোজাহেদীন বাংলাদেশ) সেকেন্ড ইন-কমান্ড সেই সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী একাধিক মামলার আসামির চড়া সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে সেরা সমবায়ীর পুরস্কার। এ নিয়ে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। রশিদ ছাপিয়ে বিপুল অর্থ চাঁদা আদায় করে বিশাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একাধিক মামলার আসামির হাতে তুলে দেয়া হয় সম্মাননা ক্রেস্ট। ক্রেস্টপ্রাপ্ত এ ব্যক্তির নাম আবদুল হালিম। এক সময় তাকে এলাকাবাসী ‘বোমা হালিম ওরফে সুদারু হালিম’ বলেই চিনত। জামায়াত-শিবির ও জঙ্গী সংগঠনের পথ মাড়িয়ে এই হালিম এখন আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় সুদভিত্তিক সমিতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। উপজেলার ভবানীগঞ্জের গোডাউন মোড়ে চড়া সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আত-তিজারা লিমিটেডের চেয়ারম্যান তিনি। রাজশাহীর পবা উপজেলাতেও তার একটি শাখা রয়েছে। গত শনিবার ৪৮তম জাতীয় সমবায় দিবস উপলক্ষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা সমবায় অধিদফতর এক অনুষ্ঠানে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আলীর হাত থেকে তিনি শ্রেষ্ঠ সমবায়ী হিসেবে ক্রেস্ট ও সনদপত্র গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় চলছে। তবে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আলী বলেন, সে আগে কি করত, কোন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল তা দেখার বিষয় নয়। তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সন্তোষজনক হওয়ায় তার প্রতিষ্ঠানকে সেরা সমবায়ীর পুরস্কার দেয়া হয়েছে। এদিকে উপজেলায় ‘সুদখোর’ হিসেবে পরিচিত আবদুল হালিমের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদানের পর থেকে উপজেলাব্যাপী স্থানীয় প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধারা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, কী করে আব্দুল হালিমের মতো ‘কুখ্যাত জামায়ত-শিবির ও জেএমবির ক্যাডারের হাতে এভাব পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।

২০০৪ সালে জেএমবির হামলার শিকার ভুক্তভোগীরা জানান, সেই সময় বাংলাভাই বাহিনী বাগমারাসহ আশপাশের এলাকায় নারকীয় তা-বলীলা শুরু করলে তৎকালীন শিবিরের ক্যাডার আব্দুল হালিম বাংলাবাহিনীতে যোগ দেয়। সে সময় শিবিরের রগকাটা ও বোমা ফাটানোর কৌশল কাজে লাগিয়ে একের পর এক তা-ব চালাতে থাকলে বাংলাভাই তাকে তার উপদেষ্টা হিসেবে গ্রহণ করে ‘বোমা হালিম’ উপাধিতে ভূষিত করে। এভাবেই বোমা হালিম একের পর বোমা ফাটিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। এই বোমা হালিমের নেতৃত্বেই দ্বীপপুরের হাসানপুরের ফজলুর রহমানকে কথিত চরমপন্থী আখ্যা দিয়ে বাংলাভাইয়ের হামিরকুৎসা চর্চার সেলে গাছে টাঙ্গিয়ে পিটিয়ে পুঙ্গ করে দেয়া হয়। পরে ফজলুর রহমান এখানে সেখানে সাহায্য সহযোগিতা করে বছরব্যাপী চিকিৎসা করে কিছুটা সুস্থ হয়ে ২০০৫ সালে ক্যাডার হালিম, বাংলা ভাই ও তাদের গডফাদার তৎকালীন ডাক ও টেলিফোন মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকসহ ৬৪ জনের নামে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘদিন এই মামলা চলার পর জেলা জজ আদালতে হালিমছাড়াও বাংলা ভাই, ব্যারিস্টার আমিনুলসহ ৩৬ ক্যাডারের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। পরে ওই মামলায় আসামিরা উচ্চ আদালতে জামিন লাভ করে। এরপর আব্দুল হালিম ভোল পাল্টিয়ে ভবানীগঞ্জ গোডাউন মোড়ে এসে আস্তানা গড়ে শুরু করেন উচ্চ সুদের ব্যবসা। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম আত-তিজারা লি.।

স্থানীয়রা জানান, আব্দুল হালিম উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নের একডালা গ্রামের বাসিন্দা। বাংলাভাইয়ের অভিযানে নেমে সে সময় ব্যাপক লুটপাট ও চাঁদাবাজি করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান। পরবর্তীতে ওই টাকা দিয়ে ভবানীগঞ্জ এসে সুদের ব্যবসা চালু করে। এভাবে হালিম হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। এখন নিজেকে আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি একটি হজ এজেন্সিও চালু করেছেন। এদিকে আব্দুল হালিমের সম্মাননা সনদ প্রাপ্তির বিষয়ে বাংলাভাই বাহিনীর নির্যাতনের শিকার ফজলুর রহমান ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাভাইয়ের নির্যাতনে আমি যে কষ্ট পেয়েছি আজ হালিমের মতো ঘৃনিত ব্যক্তির হাতে এমন ক্রেস্ট দেখে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেলাম। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিরুল ইসলাম সান্টুও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগকে গিলে খাওয়ার জন্য এখন এক হালিমই যথেষ্ট। তিনি উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে একজন ঘুষখোর ও দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে বলেন, ইউএনওকে ভুল বুঝিয়ে এবং হালিমের কাছে মোটা অংকের টাকা নিয়ে তাকে শ্রেষ্ঠ সমবায়ী সাজিয়েছেন। তিনি বলেন, তার (হালিমের) স্ত্রী জাহানারা বেগম উপজেলা কাঁঠালবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হয়ে কী করে উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগের পদ ধারণ করে থাকেন। তার কারণেই স্বামী সমবায় কর্মকর্তা একজন জেএমবি ক্যাডারকে ক্রেস্ট প্রদান করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।

বাগমারার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাহার আলী জানান, এটা জেনে শুনেই করা হয়েছে। হালিম মানে জামায়াত শিবির, হালিম মানেই জেএমবি। তারপরও তাকে ক্রেস্ট দেয়া হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সমবায়ী বানানো হচ্ছে। এসব ঘটনায় যারা জড়িত সবারই বিচার হওয়া উচিত।

এ সব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত অব্দুল হালিম বলেন, তিনি প্রথমে শিবির ও পরে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হলেও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান আত-তিজারা প্রতিষ্ঠার কারণে তাকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়। বাংলাভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পৃক্তা ছিল না তবুও তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল- এমন দাবি করলেও ২০০৪ সালের ২৩ মে রাজশাহীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক আজিজ হাসানের সঙ্গে বাংলাভাইয়ের বৈঠকে তার উপস্থিতির ছবি পাওয়া যায়। ওই ছবিতে দেখা যায় আব্দুল হালিম বাংলাভাইয়ের পাশে বসে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করছেন। সম্মাননা ক্রেস্ট প্রাপ্তির বিষয়ে তিনি বলেন, এটি উপজেলা প্রশাসনের বিষয়। তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে তাই ক্রেস্ট গ্রহণ করেছেন।

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা আলাউদ্দিন আলী জানান, হালিম যে এত বড় অপরাধী এটা জানা ছিল না। তবে তিনি যত বড়ই অপরাধী হোন না কেন তার প্রতিষ্ঠানটি ভাল কাজ করায় তাকে ওই পুরস্কার দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফ আহম্মেদ জানান, তিনি (আলাউদ্দিন) সমবায় কর্মকর্তা এ বিষয়ে আমাকে কোন কিছু জানাননি। আমার কোন পরামর্শও নেননি। তিনি কাকে প্রথম করেছেন না করেছেন তার দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ তার।

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৯

০৯/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

দেশের খবর



শীর্ষ সংবাদ: