২১ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

৭ নবেম্বর বিপ্লব ছিল না ॥ ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনে ট্রুথ কমিশন

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৯
  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নবেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে কি কি ঘটেছিল, কারা কোথায় কি ঘটিয়েছিল, পেছনের ষড়যন্ত্রকারী কারা, কারা কুশীলব, বিগত ৪৪ বছর অনেক সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়েছে, অনেক ওয়ার্কশপ-সমাবেশ হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে, অনেক কিছু বেরিয়ে এসেছে, অনেক কিছু রহস্যাবৃত। তবে দেশপ্রেমিক গবেষকগণ একটা জিনিসে একমত হয়েছেন- তখন অর্থাৎ ৭ নবেম্বর বিপ্লবটিপ্লব কিছুই হয়নি, ঐ সময়টা ছিল গভীর ষড়যন্ত্রের কাল এবং ঐ ষড়যন্ত্রে বাঙালী জাতির ইতিহাসের মহানায়ক বাঙালী জাতিরাষ্ট্রের পিতাকে হত্যা করা হয়, জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়, মুজিববাহিনী প্রধান শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যা করা হয়, হত্যা করা হয় দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সেনানায়ক জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম, কর্নেল হায়দার বীরউত্তম, কর্নেল হুদা বীরবিক্রমসহ অনেককে। হত্যা করা হয় দেশপ্রেমিক সমর নায়ক কর্নেল তাহের বীরউত্তমকে। সচেতনভাবেই এদের নামের আগে আমি দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি লাগালাম এজন্য যে, নিষ্ঠুর জেনারেল জিয়াউর রহমানও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ৪ জাতীয় নেতা -সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, এম মুনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান শেখ ফজলুল হক মনি, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল, লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল কিংবা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং নবপরিণীতা দুই পুত্রবধূ-মিসেস সুলতানা কামাল, মিসেস রোজী জামাল, মিসেস আরজু মনি, সমর নায়ক কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী কিংবা শিশু শেখ রাসেল, শিশু সুকান্ত বাবুদের বুকে যারা গুলি চালিয়েছিল শুনেছি তারাও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তাহলে যারা নিজেদের রাজনীতিক বা মুক্তিযোদ্ধা বলে পরিচয় দেন তাদের মধ্যে ‘দেশপ্রেমিক’ যেমন আছে তেমনি ‘দেশদ্রোহী’ও রয়েছে। আমরা যদি দুজন সমর নায়কের মধ্যে তুলনা করি, দেখা যাবে

দেশপ্রেমিক : খালেদ মোশাররফ,

দেশদ্রোহী : জিয়াউর রহমান।

কিন্তু চরম পরিহাসের ব্যাপার হলো জিয়াকে শহীদ? বলা হয় যা তিনি ডিজার্ভ করেন না। অথচ খালেদ মোশাররফ ডিজার্ভ করেন তবুও তার নামে নেয়া হয় না। খালেদ মোশাররফই প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং শহীদ।

১৫ আগস্ট, ৩ নবেম্বর এবং ৭ নবেম্বর হয়েছিল সবচেয়ে গভীর ষড়যন্ত্র। যার মাধ্যমে হত্যা করা হয় উল্লেখিত মহানায়ক, নায়ক এবং সমর নায়কদের। মূলত পাকিস্তান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান এজেন্ট ছিল:

রাজনৈতিক এজেন্ট : খন্দকার মুশতাক আহমেদ,

মিলিটারি এজেন্ট : জেনারেল জিয়াউর রহমান।

এদের টার্গেট ছিল মুক্তিযুদ্ধে আমাদের কাছে পরাজিত পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়া। তাই ঐ দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ISI এবং CIA এর মাধ্যমে ঐ দুই এজেন্টকে দিয়ে হত্যাকান্ড সংঘটিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে হত্যা করে সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদী পাকিস্তানের পদতলে সমর্পণ করা। তা তারা করতে পারেনি এটি যেমন সত্য তেমনি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পেরেছিল। যে কারণে আজকের অবস্থানে আসতে বাংলাদেশের ৪৪ বছর লেগেছে। একদিকে ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ, আরেকদিকে আমাদের এই ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ছোট্ট ভূখন্ডে ১৭/১৮ কোটি মানুষকে নিয়ে এগিয়ে যাবার কাজটি করতে হয়েছে। করতে হচ্ছে। তা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতিরাষ্ট্রের হাল ধরেছিলেন বলেই এবং পিতার মতোই সাহসে, সততায়, মেধায়, শিক্ষায়, দূরদর্শিতায় অদ্বিতীয় কেবল দেশে নয়, বহির্বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তার অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে বলেই।

০৩ নবেম্বর প্রথম প্রহর থেকে ৭ নবেম্বর ’৭৫ কি কি ঘটেছিল? এর জবাব দিতে হলে বলতে হয় কতগুলো দেশপ্রেমিক সমরনায়ককে হত্যা করা হয়েছিল যাদের নাম এরইমধ্যে উল্লেখ করেছি:

: ঐ সময়টা ছিল ইতিহাসের কালো অধ্যায়

: কোন বিপ্লব ছিল না

: সংহতিও ছিল না

: ছিল অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের কাল

: দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিক হত্যার কাল

: জাতির পিতা হত্যার কাল

: ইনডেমনিটি পাস করিয়ে জাতির পিতা হত্যার বিচার রুদ্ধ করার কাল

: মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের কাল

: নারী ও শিশু হত্যার মতো জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের কাল

এখন সময় ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটনের

এখন সময় কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনের

এখন সময় ট্রুথ কমিশন গঠনের

এখন সময় খুনীদের মরণোত্তর বিচারে আইন করার কাল

এখন সময় বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসার

আমার সাংবাদিকতা জীবনের দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি:

১৯৭৫ সালের ৬ নবেম্বর। ২ নবেম্বর দিবাগত রাত অর্থাৎ ৩ নবেম্বর প্রথম প্রহরে ৪ জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে গুলি করে, ব্যয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। বঙ্গভবন বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কি ঘটেছিল কিছুই পরিষ্কার ছিল না। কে কাকে মারছিল, কে কোথা থেকে এসে রাতারাতি ত্রাণকর্তা সাজছিল (যেমন এয়ার ভাইস মার্শাল তোয়াব) বাইরে কোন সংবাদ আসছিল না। শুধু আঁচ করা যাচ্ছিল-একটার পর একটা মিনি মিডি ক্যু, পাল্টা ক্যু চলছিল। ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর বিশ্বাসঘাতক খুনী খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হলেও সর্বময় ক্ষমতা ছিল খুনী ফারুক রশিদদের হাতে। গণমাধ্যম কোন তথ্য দিতে পারছিল না। তখনকার ইত্তেফাক ছিল অন্যরকম। সমাজে এর প্রভাব একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ে কম ছিল না। আমাদের অর্থাৎ ইত্তেফাকের রিপোর্টারদের এক্সেস ছিল আনলিমিটেড। আমরাও কোন সঠিক তথ্য উদ্ধার করতে পারছিলাম না। ৬ নবেম্বর স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) চলছিল ফুটবল খেলা। সম্ভবত ভারতের রাজপুতের সঙ্গে বাংলাদেশের। আমি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও হল জীবনের বন্ধু এবং ইত্তেফাক সহকর্মী জাহিদুজ্জামান ফারুক উদভ্রান্তের মতো কখনও জাতীয় প্রেসক্লাব, কখনও ইত্তেফাকে আসা-যাওয়া করছিলাম। ৬ তারিখ বিকেলে প্রেসক্লাব থেকে ইত্তেফাকে যাচ্ছিলাম হেঁটে হেঁটে স্টোডিয়ামের ভেতর দিয়ে। দেখলাম খেলা হচ্ছে। ভিআইপি দিয়ে ঢুকে বসে পড়লাম। স্টেডিয়ামে দর্শক একেবারেই কম। তখনও খেলা শুরু হয়নি। কয়েক যুবক গ্যালারিতে ঢুকে কি যেন একটা লিফলেট বিলি করে চলেছে। দেখলাম নিচে লেখা ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। অন্যজন আরেকটি লিফলেট দিল সেটি কার ছিল মনে নেই। দুটি লিফলেট আমি হারিয়ে ফেলেছি। বাইরে তখন অনেক রকম গুজব চলছিল। বুঝতে পারলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে আবার অফিসে গেলাম এবং সকাল সকাল বাসায় ফিরলাম। ৭ তারিখ সকালে শুনলাম কিছু সেনা সদস্য মিলিটারি জিয়াকে ট্যাঙ্কে এবং একাধিক ট্যাঙ্ক নিয়ে রাজপথে বেরিয়েছে। শোনা গেল জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তমকে হত্যা করা হয়েছে; সঙ্গে তার সহযোদ্ধা কর্নেল হায়দার বীরউত্তম, কর্নেল নাজমুল হুদা বীরবিক্রমকেও হত্যা করা হয়েছে।

কিন্তু কেন খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হলো?

কারা হত্যা করল?

খালেদ মোশাররফ ছিলেন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সেক্টর কমান্ডার। যুদ্ধ করতে করতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। বলে রাখা ভাল জেনারেল খালেদ মোশাররফ কোন ক্যু বা বিদ্রোহ করেননি। তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে বিশৃঙ্খলার হাত থেকে রক্ষা তথা চেন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার জন্য বঙ্গভবনে অভিযান চালিয়েছিলেন এবং তিনি যে ক্যু বা বিদ্রোহ করেননি তার প্রমাণ হলো কিছু সময়ের জন্য তার হাতে সর্বময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিল এবং তিনি ইচ্ছে করলে খুনী মোশতাককে সরিয়ে নিজে প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি বরং খন্দকার মোশতাককে হটিয়ে বিচারপতি মোঃ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন এবং খুনী ফারুক-রশীদদের বঙ্গভবন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ মনে পড়ছে, খালেদ মোশাররফ যদি খুনীদের মেরে ফেলতেন হয়ত তিনি বাঁচতেন। কিন্তু খালেদ মোশাররফ ছিলেন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা ও গণমানুষের মুক্তি তথা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। মানুষ হত্যার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তাই শান্তিপূর্ণভাবে বঙ্গভবন সন্ত্রাসী মুক্ত করেছিলেন। তবে তার মানবিকতার মূল্য দিতে হলো জীবন দিয়ে। অন্যদের মতো তিনিও খুনী মিলিটারি জিয়াকে চিনতে পারেননি। পরিষ্কার হয়েছিল তাকে উদ্ধারকারী কর্নেল তাহের বীরউত্তমকেও তিনি বাঁচতে দেননি। গোপন বিচারে ফাঁসি দিয়েছিলেন।

২ অক্টোবর ’৭৭ আরেকটি ঘটনা:

৪/৫ দিন হলো জাপান এয়ারলাইন্স- JAL-এর একটি যাত্রীবাহী বিমান হাইজ্যাক করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে (তখন তেজগাঁও-এ ছিল এয়ারপোর্ট) ল্যান্ড করে। জাপানের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড টেররিস্ট অর্গানাইজেশন জাপান রেড আর্মি তাদের ৬ টেররিস্ট বা জঙ্গীকে জাপানের কারাগার থেকে মুক্তির দাবিতে এবং মুক্তিপণ আদায়ে হাইজ্যাক করে। আমি এবং সহকর্মী আবেদ খান তেজগাঁও এয়ারপোর্টের ভিআইপি থেকে কাবার করছিলাম। পয়লা অক্টোবর হাইজ্যাকারদের দাবি মেনে সমঝোতা হয় এবং হোস্টেজদের মুক্তি দিতে শুরু করে। আমি রাত ২ টার দিকে টেলিফোনে আপডেট (সর্বশেষ) পাঠিয়ে ভিআইপি লাউঞ্জের সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পাশের সোফায় ছিলেন রয়টারের এক সাংবাদিক। তিনি মিসরীয়। রাত ৩/ সাড়ে ৩টার দিকে তার ধাক্কায় আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তিনি বলছিলেন Mr Rahman,get up get up, there is a cough...

কাঁচা ঘুম। আমি বিরক্ত হয়েছিলাম। তখন বাইরে প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমারও বিরক্তি শেষ হলো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম BAF এর ৬ অফিসারকে হ্যাঙ্গারের পাশে লাইন করে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করা হলো। তারা ঢলে পড়লেন। তখন কালিভোর-আধো আলো আধো অন্ধকার। ভিআইপি লাউঞ্জে আমি একা। সবাই চলে গেছেন। আমিও বেরিয়ে পড়লাম। কোন ট্রান্সপোর্ট পাচ্ছিলাম না। হাঁটতে থাকলাম রাস্তার পাশ দিয়ে। দেখলাম দৈনিক বাংলার মাইক্রোবাস পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি হাত তুললাম। আমাকে নিল না। তখন রাজপথে সৈনিকদের গাড়ি গুলি ছুড়তে ছুড়তে এদিক-ওদিক চলাচল করছে। অসহায়ের মতো ফুটপাথ দিয়ে ফার্মগেটের দিকে হাঁটছিলাম দোয়া পড়তে পড়তে। হঠাৎ লাল রঙের একটি ছোট টয়োটা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে আওয়াজ- শফিক get in. দেখলাম এনায়েত উল্লাহ খান মিন্টু। গাড়িতে জায়গা ছিল না। তারপরও মিন্টু ভাই আমাকে কোলে বসিয়ে নিলেন। তার কলাবাগানের বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে আমরা চা, ব্রেকফাস্ট করে আমার বাসা নারিন্দায় ফিরে এলাম। এখানে দেখা হলো আমার পাশের গ্রামের আবুল বাশারের সঙ্গে, এয়ার ফোর্সের সিপাই, চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। বলল:

ভাইয়া পালিয়ে এসেছি, ফিরে যাব নাকি পালাব?

বললাম, তুমি কি মনে করো? পালাবে নাকি ফিরে যাবে? কোন্টা ঠিক হবে? তোমার ডিপার্টমেন্টের ব্যাপার, তুমি নিজেই ভাল বুঝবে। সে চলে গেল। আমি তাকে কোন পরামর্শ দিতে পারিনি। পরে শুনেছি তাকেও গোপন ট্রায়াল করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। সে ক্যান্টনমেন্টে ফিরে গিয়েছিল। সেবার এমনিভাবে সহস্রাধিক সৈনিককে বিচারের নামে প্রহসন করে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। আবুল বাশারও তাদের একজন। তার সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। সেদিন আমি যদি তাকে পালিয়ে যাবার সঠিক পরামর্শ দিতে পারতাম হয়ত তার জীবনটা বেঁচে যেত। আজও সেই অপরাধবোধ আমার মধ্যে কাজ করছে।

সেই ২ অক্টোবর ’৭৭ এর ক্যু-তে আমার এলাকার উইং কমান্ডারস মাসুদসহ অর্ধশতাধিক এয়ারফোর্সের অফিসারকে হত্যা করা হয়। তারপর গোপন ট্রায়াল করে হত্যা। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধু (নাম বললাম না) তখন কুমিল্লায় ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ৮ সিপাইর মৃত্যুদন্ডে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। বন্ধু ম্যাজিস্ট্রেট বলছিলেন ফাঁসির পূর্বে সিপাইরা দুই হাত তুলে বলছিলেন ‘আল্লাহ আপনি এর বিচার করুন। আমরা এর সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, একটা গুলিও ফোটাইনি, আমাদের কাছে অস্ত্রও ছিল না। কিছু লোক এসে আমাদের বেরিয়ে আসতে বলেছিলেন। আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। এর বাইরে কিছু জানি না’। তার কথার সঙ্গে আমার আবুল বাশারের কথা মনে পড়ছিল। সেও বলেছিল আমি ক্যুর সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমি কেবল কমান্ড মেনে বাইরে এসেছিলাম।

গত ৬ নবেম্বর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম ও কর্নেল হুদা বীরবিক্রমের কন্যা মেহজাবিন ও নাহিদ হুদা প্রেসক্লাবের এক সেমিনারে বলেছিলেন- হত্যা করার পর তাদের পিতার সঠিকভাবে জানাজা বা দাফন পর্যন্ত করা হয়নি। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের কফিনে জাতীয় পতাকা দেয়া হয়নি। অথচ রাজাকারদের গাড়িতে (শাহ আজিজ, আলিম, মান্নান এবং পরবর্তীতে নিজামী, মুজাহিদদের গাড়িতে) জাতীয় পতাকা দেয়া হয়েছিল।

মনে মনে বলছিলাম মিলিটারি জিয়া গৎ এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে, জাতির পিতার কফিনেও জাতীয় পতাকা দেয়নি, ঠিকমতো জানাজা এবং দাফন করেনি, ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে এবং রিলিফের থান দিয়ে মুড়িয়ে দাফন করা হয়েছিল। আর হোতা ছিলেন মিলিটারি জিয়া গৎ।

যে কারণে আজকে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের দাবি-

ট্রুথ কমিশন তথা উচ্চ পর্যায়ের জুডিসিয়াল বা পার্লামেন্টারি তদন্ত কমিশন করে নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনের। চক্রান্তকারীদের মরণোত্তর বিচার করার আইন প্রণয়নের।

ঢাকা- ৮ নবেম্বর ২০১৯

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় সংসদ সদস্য

সদস্য মুজিববর্ষ জাতীয় কমিটি

balisshafiq@gmail.com

প্রকাশিত : ৯ নভেম্বর ২০১৯

০৯/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: